,

‘হাসিনা, আ ডটার’স টেল’, চেনা বৃত্তের বাইরের শেখ হাসিনা

এ এক নতুন ইস্তেহার। কিংবা এ এক দীর্ঘনি:শ্বাস। কোনও এক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমার ক্রমশ উপলব্ধি হলো এতদিন আমি যাকে সরকার প্রধান হিসেবে জেনে এসেছি তিনি তার বাইরে প্রথমে কন্যা তারপর স্ত্রী তারপর মা এবং সবশেষে জননেত্রী।

আজ আমার মনের যাবতীয় সংস্থা এবং সংস্কার ভেঙেচুরে নতুন বোধ পেল, যা আমার চেতনার প্রতিপক্ষ ছিল এতকাল। আমার সামনে এসে উপস্থিত হল কতগুলো সম্পর্ক, যে সম্পর্কগুলো বিধূর বসন্তদিনেও শীতের কুহেলিকার সন্তাপ ছড়ায়। এক প্রয়াণ আরেকজনকে তৈরি করে বিপ্লবী রূপে। মৃত্যুর পাহারা যাকে অভ্যর্থনা জানায় প্রতিপ্রস্তাব রূপে। তিনি আর কেউ নন, তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমাদের শেখ হাসিনা। ‘হাসিনা, আ ডটার্স টেল’, শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা দুই বোনের অন্তরালবর্তী হাহাকার, দৃশ্যের অতিরিক্ত ইতিহাস। এই ছবি তাদের আচ্ছন্ন স্মৃতি থেকে উদ্ধার করা আবেগের একখণ্ড আলোর অপেরা।

তিনি তো সরকার প্রধান। তিনি কি মোরগ পোলাও রাঁধতে জানেন? জানেন কি চুল বাঁধতে? তিনি নিশ্চয়ই শীতের বিকেলে নাতিপুতি নিয়ে বাগানে খেলেন না? কিংবা টুঙ্গিপাড়ার রাস্তায় ভ্যানে চড়ে বেড়ান না? তিনি নিশ্চয়ই খুব রাগী? কান্নার তো প্রশ্নই আসেনা? আর কী কী তিনি নন? সত্যি এ এক নতুন উন্মোচন। দীর্ঘ, আরও দীর্ঘ সেই ইতিহাস। রান্নার ঘর থেকে ধানমণ্ডি ৩২ ঘুরে সেখান থেকে টুঙ্গিপাড়া সেখান থেকে ব্রাসেলস তারপর দিল্লী হয়ে মাতৃভূমে, সময়ের প্রয়োজনে দেশ থেকে দেশান্তরে। সে এক মন্বন্তরের ইতিহাস। গণভবন হয়ে ৩২ নম্বরের বাড়িতে ছুটে বেরিয়েছে সেইসব ইতিহাস। দিল্লীর ইতিহাস এক নতুন নির্মাণ হাজির করে যেখানে মিস্টার তালুকদার, মিসেস তালুকদার ও মিস তালুকদার হয়ে থাকতে হয় শেখ পরিবারের এই দুই কন্যা ও প্রয়াত ওয়াজেদ মিয়াকে। তাদেরকে যেতে হয় আকালের সন্ধানে। ‘হাসিনা, আ ডটার্স টেল’ উপন্যাসে (উপন্যাসই তো!) প্রেক্ষাপটের বদল ঘটতে থাকে।

আমরা বুঝতে পারলাম জীবন বিপ্লব আর স্বপ্ন মিলে এক নতুন অভিযান রচনা করে। সব অতিক্রম করে তিনি ছুটে চলেন সামনের দিকে। তিনি কেবল কিংবদন্তী নায়ক নন তিনি অশ্বমেধের ঘোড়া। সেই যে দীর্ঘনিঃশ্বাস সেই পদযাত্রায় চলমান চিত্রমালা, হাসিনা। তরুণ প্রজন্ম যখন প্রতিষ্ঠানের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন তারা শেখ হাসিনার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছিল আত্মার অহংকার। আগেই বলেছিলাম এক প্রয়াণ আরেকজনকে তৈরি করে বিপ্লবী রূপে, শেখ হাসিনা সেই বিপ্লবেরই নাম। বাবার প্রয়াণে তিনি নতুন দেশের সন্ধান করেছেন, করেছেন বাবার অসাধ্য সাধন।

শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে হাসু আপা শেখ হাসিনা হয়ে উঠতেন কিনা জানিনা, তবে শোক যে তাকে ইতিহাসের গভীরতর পরিণামে পৌঁছে দিয়েছে এটা স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছেন আর তাকে অবয়ব দিয়েছেন আমাদের হাসু আপা। আপনি চাইলে দ্বান্দ্বিকভাবে মিলিয়ে দেখতে পারেন- জয় পুতুলের মা কি সাংঘাতিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একজন ‘ট্রু পিপল আর্টিস্ট’ হয়ে উঠলেন। অন্তত আমার সাধারণ মন তাই বলে।

আমি তাকে খুঁজবো কোথায়? আমি তাকে চোখে দেখিনি, ইতিহাসের বইতে পড়েছি। তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু।  আমি বঙ্গবন্ধু বলতে রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ভাষণ বুঝি- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম… বুঝি। কিংবা বুঝি এক কিংবদন্তী নায়কের নাম। কিন্তু আজ যাকে দেখলাম তিনি কে? এই ছবিতে তিনি হাজির হলেন রাজাধিরাজের মত।  তিনি হাসিনা আর রেহানার বাবা তিনি বেগম মুজিবের স্বামী। আজ আমার অবলোকন বঙ্গবন্ধু নিয়ে নতুন মন্তব্য হাজির করে। এই সামান্য শহরে অসামান্য এক প্রেমিককে দেখি যিনি অ্যারেস্ট হবার আগে নিজের স্ত্রীকে চুমু খেয়েছিলেন। যিনি জয় পুতুলের মাকে ভাত মাখিয়ে খাইয়ে দিতেন। যিনি জানতেন অপরিচিত কোনও এক আততায়ীর গুলিতে নন, হৃত হবেন আপন মানুষের কাছেই। তা যেনেও আগুনকে আলিঙ্গন করেছিলেন ভালবাসা দিয়ে। ‘হাসিনা, আ ডটার্স টেল’ ছবিতে বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যা শেখ হাসিনা একত্রে হাজির হলেন। সেই সিঁড়ি যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্যে জুটেছিল, বিষাদের সুর সেই সিঁড়ি দিয়েই হাসু আপা তার সম্ভাবনার প্যরাডাইমে আরোহণ করছেন যেখানে থাকার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর।

আমি শেখ হাসিনাকেও সামনাসামনি কখনো দেখিনি, কিন্তু আজ বাবা মেয়ে একত্রে হাজির হলেন সিনেমার সীমারেখায়। আমার মনে হচ্ছিল বঙ্গবন্ধু মরেন নাই। আমি জানলাম ‘মা আমার সাধ না মিটিল আশা না ফুরিল’ তার প্রিয় গান। যে গান আমাকে দিয়ে গেল আড়ালের বাসভূমিতে। সকলই ফুরায়, ভালবাসা ফুরায় না। পৃথিবী ভালবাসতে জানে। তিনি কেবলমাত্র ভালবাসার ঠিকানায় পাড়ি দিয়েছেন মাত্র। তার দুই কন্যা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে হেঁটে বেড়াচ্ছে, যেখানে আমি কিছুসময় আগে বঙ্গবন্ধুকে হেঁটে বেড়াতে দেখেছি। বিদেশি সাংবাদিকের সাথে কথা বলতে দেখেছি। আর ক্ষণকাল বাদে মহাকাল এসে উপস্থিত, সব ওলটপালট। বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত খবর পুরো পৃথিবীর খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে।

সেই শবযাত্রায় আমি ছিলাম না বটে, কিন্তু ইতিহাস আমাকে সেই কাহিনী চিত্র শোনায়। তারপর দুই বোনের এক উদ্বাস্তু জীবনের শুরু, শুরু এক অনিশ্চিতের জীবনের। সেই বর্ণনা আমার কাছে আশ্চর্য শোনায় ৯ এপ্রিল, একই দিনে শেখ মুজিব এবং তার কন্যাদ্বয়ের আজমির শরীফ ভ্রমণ কেবল সালটা আলাদা। আমার মনে হয় ইতিহাস আর কিংবদন্তির কী নিদারুণ সংঘর্ষ। যেমন করে ‘সুবর্ণরেখায়’ সীতা আর বিনুর সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটে।  দুই বোন জরুরি অবস্থায় একা একা তৈরি হচ্ছিলেন আরেকটি লড়াইয়ের জন্য। একজন নেতা তিনি যে সমাজ থেকে উঠে আসেন সেই সমাজের সাধারণ মানুষের সম্পর্কে বোধ না থাকলে এবং তাদের সংগ্রামের অংশীদার না হতে পারলে বোধহয় নেতা হওয়া সম্ভবপর নয়।

এই ছবিতে শেখ হাসিনা সমসাময়িক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একজন নেতা হয়ে ওঠেন আমাদের চোখের সামনে। তার মৌনতা তাকে আরেকটি প্রতিবাদের প্রেক্ষাপট উপহার দেয়।  তিনি স্মৃতিভ্রষ্ট স্বজাতিকে সক্রিয় স্মরণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে তীব্রভাবে নির্দেশিত হন মনের অজান্তেই। সিনেমার পর্দায় অবতীর্ণ হন এক উপমারহিত চরিত্রে। ৭০ ঘণ্টার ফুটেজ পর্দায় অবতীর্ণ হয় ৭০ মিনিটে।

আমার চাপা উত্তেজনা শোকসভায় পর্যবসিত হয়। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমার ১৩ বছরের কন্যা শেখ হাসিনাকে দেখতে চায়, তার কারুকার্যময় মননে তিনি জননেত্রী নন তিনি, এক ছিন্নমূলের প্রস্তাব। আর আমার স্বল্পকালীন শিক্ষকতা এক নতুন রূপকথার জন্ম দেয়। আমার কাছে হাসিনা, আ ডটার্স টেল আমার নিজের সাথে নিজের এক সংঘর্ষ। শেখ হাসিনা, তিনি ছিন্নমূলের অন্তর্যামী গ্রাহক। তিনি হতে পারেন একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী কিন্তু আমার কাছে তিনি একজন মানুষ যিনি উদ্বাস্তু জীবনের রোজনামচাকে বর্ণনা করেছেন সমকালীনতার মোড়কে। যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে, সেই ঝড় আরেকটি ঝড়ের ভাষণে নিয়ে যায় আমাদের।

আমরা বুঝতে পারি আমার সকল শিল্প অভিজ্ঞতা কূপমণ্ডুকতায় পর্যবসিত হয়। আমাদের কিছুই দেবার নেই কেবল ভালবাসা, ভালবাসা আর ভালবাসা, যেমন বলতেন বঙ্গবন্ধু। হাসু আপার একটা  কথা আমার মনে প্রশ্নের জন্ম দেয় যেখানে তিনি বলেন, ‘আমি কিন্তু আমার কোনও স্মৃতি রাখতে চাইনা। আমার মনে হয় এগুলো অবান্তর, এর প্রয়োজন নাই। একদম রুঢ় বাস্তবতা।’ তিনি কেন এমন বললেন?

পিপলু আর খান তার পুরো টিম দীর্ঘ ৫ বছর এই ছবি  নির্মাণ করেছেন এক দুর্মর আবেগ নিয়ে। তাকে এবং তার পুরো টিমকে ধন্যবাদ।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}