,

মান্নার অসততা


জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না আওয়ামী লীগের এক মনোনয়ন প্রত্যাশীকে নিজেদের দলে লোক বলে দাবি করেছেন। এমনকি তার প্রকাশিত ৩৫ জনের প্রার্থী তালিকায় ওই নেতার নাম উল্লেখ করেছেন। মান্নার নাগরিক ঐক্যের প্রকাশিত ওই তালিকার পর সেই আওয়ামী লীগ নেতা এর প্রতিবাদ করেছেন। এবং প্রতিবাদটা এমন পর্যায়ে যে এতে তার মানহানি হয়েছে বলে দাবি করেছেন।

মাহমুদুর রহমান মান্নার বিরুদ্ধে উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল বশর মজুমদার। এই আওয়ামী লীগ নেতা আবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে চান। কেবল এবারই নয়, এর আগেও খায়রুল বশর মজুমদার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন।

দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে পারেননি, ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক জাসদের শিরিন আখতারের জন্যে সেবার আসনটি ছাড়তে হয় তাকে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনেও বশর মজুমদার ওই আসনের প্রার্থী। আগের মত এবারও শিরিন আখতার আছেন প্রতিদ্বন্দ্বী মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে। এর বাইরে আছেন আরও অনেক নেতা। ১৪ দলের শরিক হিসেবে তার মনোনয়ন এখনও অনিশ্চিত হলেও নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী তালিকায় তার নাম প্রকাশকে অপমান ও মানহানির বিষয় হিসেবেই দেখছেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। তিনদিনের মধ্যে এজন্যে মান্নাকে দুঃখপ্রকাশ না করলে এজন্যে মানহানির মামলাও করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। এই মানহানির একটা মূল্যমানও উল্লেখ করেছেন মজুমদার, অঙ্কে এর পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা।

নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ কায়সারের বক্তব্যে জানা গেছে, ‘আমি যদ্দূর জানি এই ভদ্রলোক আমাদের অফিসে এসে মান্না ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। উনি নিজেই এসে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এখানে যখন এসেছেন, তখন ত এসব বলেননি। এখন তার আচরণে, কথায় আমি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রতবোধ করছি’।

মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে দেখা করে কথা বলার কারণেই নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী তালিকায় নাম উঠে গেল আওয়ামী লীগ নেতার? এটা অনতিতরুণ প্রেমপ্রত্যাশীদের মানসিক অবস্থার মত ব্যাপার হয়ে যায়, ‘মেয়েটি মুচকি হেসেছে, তাই প্রেম হয়ে গেছে’! রাজনীতি কি এমন কিছু? এতখানি হালকা এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া! হাস্যকর!

তাছাড়া মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য উল্লেখের মত রাজনৈতিক দলই এখনও হতে পারেনি যেখানে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড় থাকবে। নাগরিক ঐক্য সম্প্রতি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে এই দলের নিবন্ধনও নেই নির্বাচন কমিশনে। এই দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেমন- এনিয়েও শঙ্কা রয়েছে। দলের প্রধান নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না একাধিকবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেও একবারও জিততে পারেন নি।

জাসদ, বাসদ, জনতা মুক্তি পার্টি, আওয়ামী লীগ, নাগরিক ঐক্য অনেক দল করেছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যন্ত হয়েছেন। এমপি হতে চেয়েছেন একাধিকবার, প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন, জনতা মুক্তি পার্টি থেকে জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছে তার।

আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়েও এমপি হতে চেয়ে পারেন নি। ঢাকার মেয়র হতে চেয়েও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমর্থন পাননি। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে ‘মাইনাস-টু’ ফর্মুলার সমর্থনকারী হিসেবে আওয়ামী লীগে থেকে সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে বাদ দেওয়ার সমূহ অপচেষ্টাও করে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ব্যর্থ হলেও রাজনীতিতে টিকে যান তিনি মূলত রাজনীতিবিদ হয়েও সুশীল সমাজের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে।

মাহমুদুর রহমান মান্না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ছিলেন, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেছেন, পুঁজিবাদের বিপক্ষে ছিলেন, আবার একটা সময়ে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বলেছেন, সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গেছেন, পুঁজিবাদের পক্ষেও গেছেন, শেখ হাসিনার পক্ষে বলেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বলছেন, জিয়াউর রহমানের বিপক্ষে বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিপক্ষে বলেছেন, এবার আবার খালেদা জিয়ার পক্ষেও বলছেন। একটা মানুষের রাজনৈতিক জীবন যে এতখানি পরস্পরবিরোধী হতে পারে মাহমুদুর রহমান মান্না তার প্রকৃত উদাহরণ।

যে মান্না একটা সময়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, সেই মান্নাই অদ্য বিএনপিতে না থেকেও বিএনপির অন্যতম সিপাহসালার। বিএনপির চাইতে বড় বিএনপি তিনি। সদ্যগঠিত সরকার বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে খোদ বিএনপির দায়িত্বশীলদের চাইতে তিনিই বেশি মুখর।

ডাকসুর (ঢাকা ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) সাবেক ভিপি, চাকসুর (চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি সেন্ট্রাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন) সাবেক জিএস মাহমুদুর রহমান মান্নার রাজনৈতিক জীবন শেষপর্যন্ত সফল হয়নি মূলত তার ডিগবাজি প্রবণ রাজনীতির কারণে। নীতিবিচ্যুত এই রাজনীতির কারণে তিনি রাজনৈতিক ফসিল হয়ে পড়েছেন, যেখানে ফসলের সম্ভাবনা ক্ষীণ।

নাগরিক ঐক্য আওয়ামী লীগ নেতাকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে দাবি করে যে তালিকা করল তাতে করে এই দলটির গণভিত্তি যে চূড়ান্ত রকমের শোচনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মাত্র ৩৫ জনের নাম প্রকাশ করেও মাহমুদুর রহমান মান্না এই সীমিত সংখ্যক মানুষকেও নিজেদের বলে প্রমাণ করতে পারছেন না।

নাগরিক ঐক্যের প্রার্থীর তালিকায় নাম উঠেছে বলে খায়রুল বশর মজুমদার বলছেন এতে তার ‘রাজনৈতিক, সামাজিক সুনাম ও খ্যাতি ক্ষুণ্ণ হয়েছে’।

মাহমুদুর রহমান মান্না কি বুঝতে পারছেন তার তালিকায় নাম উঠাতে অনেকের খ্যাতি ক্ষুণ্ণ হয়, সামাজিক সুনাম বিনষ্ট হয়!

এছাড়া, কাউকে না জানিয়ে কিংবা অনুমতি না নিয়ে এভাবে নিজেদের দলের প্রার্থী হিসেবে নাম প্রকাশ করা অশোভন, এবং এটা রাজনৈতিক অসততা। মাহমুদুর রহমান মান্না কাজটা ঠিক করেননি!

সূত্র : চ্যানেলআই অনলাইন

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}