,

প্রসঙ্গ : বাকশাল

অমি রহমান পিয়াল :

  • বাকশাল নিয়ে কিছু কথা বলবো ঠিক করছি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আশি ভাগ শিক্ষিতমুর্খের ধারণা এটা একটা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা। তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এই বাকশাল জুজু নিয়ে আসেন তাদের বক্তৃতায় বয়ানে। এমনকি বর্তমান শাসন ব্যবস্থাকেও অনেকে তুলনা করেন সেই আদলে। আপসোসের ব্যাপার হচ্ছে খোদ আওয়ামী লীগের প্রচুর নেতাকর্মী বাকশাল বলতে আসলে কী বোঝায় তা জানেন না। তারা তাদের প্রতিপক্ষের খোঁচা নিরবে সহ্য করেন এবং মনে মনে রুষ্ট হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। যেন কী এক পাপের বোঝা চাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

এই বিভ্রান্তির নেপথ্যে কিছু মুখরোচক উপাদানও আছে। যেমন তাজউদ্দিন আহমেদের একটি উক্তির কথা শোনা যায়, তিনি নাকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বলেছিলেন বাকশালই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিংবা বঙ্গবন্ধু এই বাকশাল অবলম্বন করার সময় তিনি বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার মৃত্য ডেকে এনেছেন। কথাটা যদি সত্যিও হয়, তাহলে বলতে হবে তাজউদ্দিন ভুল বলেননি। তবে তার এই উক্তি যে ছলে প্রয়োগ করা হয়, সেভাবেও মোটে কথাটা তিনি বলেননি। আরও আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানীর বিখ্যাত উক্তি। তিনি নাকি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু আপনি ভুল করছেন। আমি আর আপনার সঙ্গে নেই’। ঠিক কেন ওসমানীর এই প্রলাপ সেটা আমি আসলেই ধরতে পারিনি।

যাহোক ফিরে আসি বাকশালে। বঙ্গবন্ধু এটাকে বলেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। যার বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। সেটা ছিলো বাঙালির রাজনৈতিক মুক্তি। আর বাকশাল কর্মসূচি দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। এ অর্থনৈতিক শৃঙ্খলটা বাঁধা ছিলো বিভিন্ন পরাশক্তি আর দাতা দেশের কাছে। স্বাধীনতার পর তিনটি বছর তিনি সবার দরজায় গেছেন। হাত পেতেছেন। কিন্তু সবার একটাই শর্ত। আমার দালালি করো।

আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, চীন সবার একই শর্ত। বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ, দাতা দেশগুলোর ঋণের সঙ্গে কী শর্ত জুড়ে ছিলো তা আগেই আমি ভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটার উপর প্রকৃতির কেন এত রোষ ছিল সেটাও এক জিজ্ঞাসা। হয় খরা, নয় বন্যা। দুটোরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া দুর্ভিক্ষ। এটাও ভোলা চলবে না, গোটা বিশ্বজুড়ে তখন চলছিল এক ভয়াবহ আর্থিক মন্দা।

তার উপর দেশে চলছিল অন্য এক অরাজকতা। জনগণের মুক্তি, সর্বহারার মুক্তির জন্য চীনপন্থী কমিউনিস্টরা চালাচ্ছিল তাদের ধারার বৈপ্লবিক কর্মসূচি। সেটার মধ্যে প্রধান ছিলো পাটের গুদামে আগুন দেওয়া। ব্যাংক লুট করা। প্রান্তিক অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে অস্ত্র লুট করা। স্বাধীনতার পর তিন বছরে তখনকার অর্থমানে দুইশ’ কোটি টাকার পাট পোড়ানো হয়েছে। এই পাট ছিল বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী পণ্য, যা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতো এই দেশ। ছিল জাসদ। তারা স্লোগান দিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। এটা ঠিক কোন বৈজ্ঞানিকদের সমাজতন্ত্র সেটা তারা ঠিকমতো বোঝাতে না পারলেও, তাদেরও কাজ ছিলো সর্বহারা পার্টির মতোই। ব্যাংক লুট করো, গুদামে আগুন দাও, দেশ অচল করো। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শূন্যের নিচে চলে গেলে দেশে সর্বহারার বিপ্লব হবে, তারা সব পয়সাওয়ালাদের মেরে-কেটে এই বিপ্লব ঘটাবে। আর তাদের শাসন করবে বিপ্লবী নেতারা। কী অদ্ভুত উপলব্ধিবোধ!

বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন এভাবে চলতে পারে না। ন্যামের সদস্য কিউবার কাছে পাট বিক্রি করেছেন। সেটা যুক্তরাষ্ট্র বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছে কারণ তাদের চোখে কিউবা কমিউনিস্ট দেশ, অতএব দুই জাহাজ বোঝাই চাল ও খাদ্যশস্য তারা ফিরিয়ে নিয়ে সাগরে ঢেলে দিল। বঙ্গবন্ধু বুঝলেন স্বনির্ভর হওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি সমাজতন্ত্রওয়ালাদেরও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।

দ্বিতীয় বিপ্লব হলো সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র যার মূল উপাদান গণতন্ত্রের মোড়কে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ সমবায় পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন হবে, কৃষকরা মিলিতভাবে জমি চাষ করে ফসল ফলাবেন। তাদের নায্য দাম দিয়ে সেই ফসল দেশজুড়ে বিপণন করা হবে।

বাকশাল কমিটিতে বঙ্গবন্ধুর ব্যাখ্যা
বাকশাল কি স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা? মোটেই না। এটা ছিলো বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে জিতেছিল আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচিত সাংসদরাই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদে বসেছেন, নতুন সংবিধান দিয়েছেন। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সিট আওয়ামী লীগই পেয়েছে। তখন বিরোধী দল বলতে ছিলো ন্যাপ ভাসানী, ন্যাপ মোজাফফর, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জাসদ। ভাসানী নির্বাচনে বিশ্বাস করতেন না। করলে জামানত হারাতেন নি:সন্দেহে। সত্তরে তিনি যেমন ভোটের আগে ভাত চেয়েছেন। স্বাধীনতার পর করলেন শুধু অনশন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের জন্য অনশন। মুসলিম বাংলা গঠনের জন্য অনশন। আওয়ামী দু:শাসনের বিরুদ্ধে তার অনশন ছিলো অহরহ। আর জাসদ কী করতো তাতো বলাই হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধ শেষে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো বলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পিডিপি ছিল নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল।

তো স্বনির্ভরতার দ্বিতীয় বিপ্লবে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন জাতীয় ঐক্যের। ভাসানী ন্যাপ এবং জাসদ প্রত্যাখ্যান করলো তার ডাক। ভাসানী যদিও তার শিষ্য মুজিবকে ডেকে আশীর্বাদ করলেন। তবে দলীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে থাকলেন। জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দিল মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবির সম্মিলিত রূপ ছিল বাকশাল, যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’। এখানে ‘আওয়ামী’ শব্দটা ‘জনতা’ অর্থে ব্যবহৃত। চার বিরোধী দলের দুটো শাসনতন্ত্রে। আর দুটো বিরুদ্ধ অবস্থানে। স্বৈরাচারী হলো কিভাবে?

বাকশালের মূল ‘এসেন্স’ ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। ছোট ছোট সেলে গোটা দেশকে ভাগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তার এই পরিকল্পনায়। মানুষের শরীর যেমন বিভিন্ন কোষে তৈরি তেমনি বাকশালও। প্রতিটি সেলের মূল ক্ষমতায় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনতা। প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাদের সহযোগী সেনাসদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দেশের প্রতিটি জেলার জন্য একজন করে গভর্নর নির্বাচিত করা হলো। এই গভর্নরদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো বাকশাল কর্মসূচি পরিচালনার জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট সেই গভর্নররাই শপথ নেওয়ার কথা ছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাকশাল শুরু হতে পারেনি। বাংলাদেশে কখনও বাকশাল কায়েম করা যায়নি। এটি পরিকল্পনা হিসেবেই ছিল। বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাকশালকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হয়।

কী ছিলো বাকশাল, এনিয়ে যাদের আগ্রহ তারা তা শুনতে পারেন খোদ বঙ্গবন্ধুর মুখেই। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক আবীর আহাদ।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু, আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূলনীতি বা লক্ষ্য কী?

আমার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ধ্যান ও ধারণার উৎস বা মূলনীতিমালা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতিমালার সমন্বিত কার্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শোষণহীন সমাজ তথা আমার দেশের দীনদুখী শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবী মেহনতি মানবগোষ্ঠির মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের সমষ্ঠিগত প্রকৃত ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন প্রতিষ্ঠাকরণই আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারার একমাত্র লক্ষ্য।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কী একযোগে বা পাশাপাশি চলতে পারে?

যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে তাকে সংখ্যালঘু ধনিক শোষকদের গণতন্ত্র বলাই শ্রেয়। এর সাথে সমাজতন্ত্রের বিরোধ দেখা দেয় বৈকি। তবে গণতন্ত্র চিনতে ও বুঝতে আমরা ভুল করি। কারণও অবশ্য আছে। আর তা হলো শোষক সমাজ গণতন্ত্র পূর্ণভাবে বিকাশলাভ করুক তা চায় না। এবং গণতন্ত্রকে কিভাবে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করা যায়– এখানে চলে তারই উদ্যোগ আয়োজন। এভাবেই প্রকৃত গণতন্ত্রকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ অজ্ঞ জনগণই শুধু নয়– তথাকথিত শিক্ষিত সচেতন মানুষও প্রচলিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে অক্ষম। এরা ভাবে যে ভোটাভুটিই হলো গণতন্ত্র। একটু তলিয়ে দেখে না প্রাপ্তবয়স্ক মোট জনসংখ্যার কত পার্সেন্ট ভোট দিলো, কোন শ্রেণির লোকেরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলো, কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেল, ক্ষমতাসীনরা কোন পদ্ধতিতে তাদের শাসন করছে, সাধারণ জনগণ কতোটুকু কী পাচ্ছে। সুতরাং আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি– প্রচলিত গণতন্ত্রের বদৌলতে সমাজের মাত্র ৫% লোকের বা প্রভাবশালী ধনিকশ্রেণির স্বৈরাচারী শাসন ও বল্গাহীন শোষণকার্য পরিচালনার পথই প্রশস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত গণতন্ত্রের মারপ্যাচে সমাজের নিম্নতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শাসন ও প্রভাব প্রতিপত্তি, সর্বপ্রকার দুর্নীতি শোষণ অবিচার অত্যাচার ও প্রতারণায় সমাজের সর্ববৃহত্তম অজ্ঞ দুর্বল মেহনতী কৃষক–শ্রমিক সাধারণ মানব গোষ্ঠীর (শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ) মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রকৃত গণতন্ত্র বলতে আমি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝি, যে ব্যবস্থায় জনগণের বৃহ্ত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বৃহত্তর কল্যাণের নিমিত্তে তাদের জন্য, তাদের দ্বারা এবং তাদের স্বশ্রেণিভুক্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে তাদেরই প্রকৃত শাসন ও আর্থসামাজিক মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রচলিত গণতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। কারণ প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে চলে অর্থ সম্পদের অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা। এক্ষেত্রে দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে এ জাতীয় অর্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কোনও প্রকারেই সম্ভব না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিই এদেরকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের কার্যকরী নিশ্চয়তা দিতে পারে–তাদের আর্থ সামাজিক মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্রের আরেক নাম সমাজতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত। এজন্যেই আমি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের ভেতর কোনও বিরোধ নেই।

প্রশ্ন: অনেকে বলেন ‘বাকশাল’ হলো একদলীয় বা আপনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি অপকৌশল– এ সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার মতামত দিন।

সাম্রাজ্যবাদের অবশেষ পুঁজিবাদী সমাজসভ্যতা ও শোষক পরজীবীদের দৃষ্টিতে ‘বাকশাল’ তো একদলীয় শাসনব্যবস্থা হবেই। কারণ বাকশাল কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে আমি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি বহুজাতিক পুঁজিবাদী শোষক, তাদের সংস্থা সমূহের লগ্নিকারবার এবং তাদের এদেশিয় সেবাদাস, এজেন্ট, উঠতি ধনিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া শোষণ ও অবৈধ প্রভাবপ্রতিপত্তি–দুর্নীতি–প্রতারণার সকল বিষদাঁত ভেঙ্গে দেবার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য তাদের আঁতে ঘাঁ লেগেছে, বাকশাল ও আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীশক্তি শাসকরা এদেশে গোপনে অর্থ জোগান দিয়ে তাদের সেবাদাস ও এজেন্টদের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রমকে বানচাল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমার সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। কল–কারখানা, অফিস–আদালত, শিল্প–প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন থানায় তাদের ভাড়াটে চরদের দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, গণহত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের ষড়যন্ত্রের খবরা–খবর আমার কানে আসছে।

প্রচলিত গণতান্ত্রিক বৈষম্য, শোষণ–দুর্নীতিভিত্তিক সমাজকে, দেউলিয়া আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, জরাজীর্ণ প্রশাসন ও অবিচারমূলক বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে একটি শোষণহীন, দুর্নীতিহীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সমাজ বিপ্লবের পথ রচনা করেছি। এই সমাজ বিপ্লবে যারা বিশ্বাসী নন, তারাই বাকশাল ব্যবস্থাকে একদলীয় স্বৈরশাসন ব্যবস্থা বলে অপপ্রচার করছেন। কিন্তু আমি এ সকল বিরুদ্ধবাদীদের বলি, এতোকাল তোমরা মুষ্ঠিমেয় লোক, আমার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ দুখী মেহনতী মানুষকে শাসন ও শোষণ করে আসছো। তোমাদের বল্গাহীন স্বাধীনতা ও সীমাহীন দুর্নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতার হোলিখেলায় আমার দুখীমানুষের সব আশা–আকাঙ্খা–স্বপ্ন–সাধ ধুলায় মিশে গেছে। দুখী মানুষের ক্ষুধার জ্বালা ব্যথা বেদনা, হতাশা–ক্রন্দন তোমাদের পাষাণ হৃদয়কে একটুও গলাতে পারেনি। বাংলার যে স্বাধীনতা তোমরা ভোগ করছো, এই স্বাধীনতা, এই দেশ, এই মাটি ওই আমার দুখী মেহনতী মানুষের সীমাহীন ত্যাগ–তিতিক্ষা, আন্দোলন সংগ্রাম এবং জীবন মৃত্যুর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তোমাদের অবদান কতটুকু আছে, নিজেদের বুকে একবার হাত দিয়ে চিন্তা করে দেখো। বরং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছো। বিদেশি শাসক–শোষকদের সহায়তা করেছ। নিজের ঘরে থেকে ভাইয়ের ঘর পুড়িয়েছ, মানুষকে হত্যা করেছো। মা–বোনদের লাঞ্ছিত করেছো, আরো কি না করেছ! এসবই করেছো ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের ঘৃণ্য লক্ষ্যে।

আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন–শোষণ করছে। বাকশাল করে আমি ওই ৯৫ ভাগ মানুষের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করেছি। এতকাল মাত্র ৫ ভাগ শাসন করেছে, এখন থেকে করবে ৯৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ মানুষের সুখ–দু:খের সাথে ৫ ভাগকে মিশতে হবে। আমি মেশাবোই। এজন্য বাকশাল করেছি। এই ৯৫ ভাগ মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছি তাদের পেশার নামে, তাদের বৃহত্তর কল্যাণে, তাদের একক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালে। মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালির সর্বশ্রেণি সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনও সুযোগ নেই। কারণ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনও পেশা বা শ্রেণি অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারি করতে পারবে না। যে কেউ যিনি জনগণের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতিতে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তিনি এই জাতীয় দলে ভিড়তে পারবেন।

যারা বাকশালকে একদলীয় ব্যবস্থা বলেন, তাদের স্মরণ করতে বলি, ইসলামে ক’টি দল ছিল? ইসলামী ব্যবস্থায় একটি মাত্র দলের অস্তিত্ব ছিল, আর তা হলো খেলাফত তথা খেলাফতে রাশেদীন। মার্কসবাদও একটি মাত্র দলের অনুমোদন দিয়েছে। চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রে কতটি করে দল আছে? এইসব ইসলামী রাষ্ট্রসমূহকে বাদ দাও, ওখানে মহানবীর ইসলাম নেই। বস্তুত প্রকৃত গণতন্ত্র বা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক সংস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। একটি জাতীয় কল্যাণের অভিন্ন আদর্শে, ব্যাপক মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে একটি মাত্র রাজনৈতিক সংস্থার পতাকাতলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বহুদলীয় তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় কোনওভাবেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেখানে বহুদলে জনগণ বহুধা বিভক্ত হতে বাধ্য। আর বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত, পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বসংঘাত, হিংসা–বিদ্বেষ ও হানাহানির রাজনীতি দিয়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কোনোভাবেই অর্জিত হতে পারে না। ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু, বাকশালের মূল লক্ষ্য বা এর কর্মসূচি সম্পর্কে কিছু বলুন।

বাকশালের মূল লক্ষ্য তো আগেই বিশ্লেষণ করেছি। তবে এক কথায় আমি যা বুঝি তা হলো একটি শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শোষিতের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠাকরণ। বাকশাল কর্মসূচিকে আমি প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছি।

এক. রাজনৈতিক, দুই. আর্থসামাজিক, তিন. প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা

এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক পেশাভিত্তিক লোকদের জাতীয় দল বাকশালে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রেখেছি। এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় দলের একাধিক প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনগণ তাদের মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন। প্রেসিডেন্ট জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। জাতীয় দলের সদস্য যে কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট পদাধিকার বলে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান হবেন। প্রেসিডেন্ট জাতীয় সংসদের আস্থাভাজন একজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মন্ত্রীদের নিয়োগ করবেন। সংসদ সদস্যদের দুই–তৃতীয়াংশের অনাস্থায় প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করতে পারবেন। মন্ত্রিসভা প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন। স্থানীয় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষভাবে বজায় থাকবে।

দুই. আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক বহুমুখি গ্রাম–সমবায় প্রকল্প। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থব্যবস্থায় উন্নয়ন বা স্বনির্ভর–স্বাধীন গ্রামীণ ব্যবস্থা, বিশেষ করে ভূমিসংস্কারের প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন তথা কৃষকদের হাতে জমি হস্তান্তর, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সাম্যভিত্তিক বণ্টনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। ভারি শিল্পকারখানা, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, বৈদেশিক বাণিজ্য, ব্যাংক, বীমা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি জাতীয়করণ করে জনগণের যৌথ শেয়ার মূলধনে নতুন নতুন কৃষিজাত শিল্প ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানা ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা। সীমিত ব্যক্তিমালিকানাকে উৎসাহদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থাসমূহ যাতে জনসাধারণ ও তাদের শ্রমিকদের শোষণ করতে না পারে তার ব্যবস্থা থাকবে।

তিন. প্রশাসনিক কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কর্পোরেশন ও বিভাগগুলোর পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন তথা মাথাভারী প্রশাসনের উচ্ছেদ সাধন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জেলা গভর্নর ও থানা প্রশাসনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, মহকুমা ও বিভাগীয় প্রশাসনকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও থানাগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ সদস্যদের ভোটে থানা পরিষদ গঠিত হবে। তবে থানা পরিষদের প্রশাসক/চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্নর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। থানা প্রশাসক/চেয়ারম্যানরা ও জেলা গভর্নররা জনগণ, স্ব স্ব পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের কাছে দায়ী থাকবেন। গ্রাম সমবায় পরিষদ থানা পরিষদের কাছে, থানা পরিষদ জেলা পরিষদের কাছে দায়ী থাকবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ– এরপরই থাকবে জাতীয় সরকার। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিপুলভাবে বিকেন্দ্রিকরণ করে প্রশাসনকে জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র, স্টিলফ্রেম গতানুগতিক বা টাইপড চরিত্রকে ভেঙ্গে গুঁড়ো করে দেবার ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকারী কর্মচারিরা এখন থেকে জনগণের সেবক।

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে রাজধানীতে বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগকে আটটি আঞ্চলিক বিভাগে বিকেন্দ্রিকরণের ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে সুপ্রিমকোর্টের অধিবেশন বছরে অন্তত একবার করে প্রতিটি আঞ্চলিক বিভাগে (হাইকোর্ট) বসবে। জেলা আদালতসমূহ বহাল থাকবে। প্রতিটি থানাতে থাকবে একাধিক বিশেষ ট্রাইবুনাল। প্রত্যেকটি আদালতে যেকোনও মামলা ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মিমাংসা করতে হবে। গ্রামে থাকবে একাধিক সালিশ বোর্ড। সালিশ বোর্ড গঠিত হবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে। সালিশ বোর্ড চেয়ারম্যান থাকবেন সরকার নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটরা। এভাবে সুষ্ঠু, ন্যায় ও দ্রুততর গণমুখী বিচারকার্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রিকরণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু, অনেকে বলেন,আপনি নাকি কোনও একটি পরাশক্তির চাপের মুখে বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাকশাল কর্মসূচি দিয়েছেন এবং এ ব্যবস্থা নাকি সাময়িককালের জন্য করেছেন– এ বিষয়ে আপনি অনুগ্রহ করে কিছু বলবেন কী?

কারও প্রেশার বা প্রভাবের নিকট আত্মসমর্পন বা মাথা নত করার অভ্যাস বা মানসিকতা আমার নেই। একথা যারা বলেন, তারাও তা ভালো করেই জানেন। তবে অপপ্রচার করে বেড়াবার বিরুদ্ধে কোনও আইন নেই, তাই উনারা এ কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। করুন অপপ্রচার। আমি স্বজ্ঞানে বিচার বিশ্লেষণ করে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, আমার দীনদুখী মেহনতী মানুষের আশা–আকাঙ্খা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আমি বাকশাল কর্মসূচি দিয়েছি। আমি যা বলি, তাই করে ছাড়ি। যেখানে একবার হাত দেই সেখান থেকে হাত উঠাই না। বলেছিলাম এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, মুক্ত করেছি। বলেছি শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলা গড়বো, তাই করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। কোনও কিন্তুটিন্তু নাই, কোনো আপস নাই।

প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু, বাকশাল বিরোধীমহল অর্থাৎ ঐ ৫% সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও তাদের হাতেই রয়েছে বিপুল সম্পদ। তাদের সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শক্তির যোগসাজশ। তাদের পেইড এজেন্টরাই রয়েছে প্রশাসনিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্রে। তাদের কায়েমী স্বার্থের উপর আপনি আঘাত হানতে যাচ্ছেন, এই অবস্থায় তারা চোখ মেলে, মুখ গুজে বসে থাকবে বলে আপনি মনে করেন? তারা তাদের অবস্থান নিরাপদ ও সংহত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না?

আমি জানি তারা বসে নাই। ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিদিনই ষড়যন্ত্রের উড়ো খবর আমার কাছে আসে। সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহীরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গোপন পথে অঢেল অর্থ এ কাজে লাগাবার জন্য বাংলাদেশে আসছে। সুকৌশলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চলছে। অপপ্রচার চলছে। আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। জনগণ সমর্থন দিচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র করে, বাঁধার সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করা যাবে না। আমার কাজ আমি করে যাবোই।

হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। অ্যাকসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। জনগণ যদি বোঝে আমার আইডিয়া ভালো, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবে। আমার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। আমার একটা বড় সান্তনা আছে, যুদ্ধের সময় আমি জনগণের সাথে থাকতে পারিনি। জনগণ আমারই আদেশ ও নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজকের এই শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র বা অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লবে আমি যদি নাও থাকি, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বাঙালিরা যেকোনও মূল্যে আমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।

পুনশ্চ: আজকে বাকশালকে গালি দিয়ে একদল সর্বহারার বিপ্লবের কথা বলে, চীনের আদলে কিউবার আদলে, আরেকদল বলে ইসলামী বিপ্লবের কথা, ইরানের আদলে। জানতে ইচ্ছা সেগুলো একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বলে এই বিপ্লবীরা মানেন কিনা? জানেন কিনা? সেখানে গণতন্ত্র নেই স্বীকার করেন কিনা? বাকশাল ছিল একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যার অর্থনৈতিক অংশটুকু ছিলো সমাজতান্ত্রিক। এটাই ইমপ্রোভাইজেশন, এটাই বিপ্লব। আপসোস, তাদের জন্য যারা নেতা খুঁজতে বিদেশি উদাহরণ দেন, যাদের দেশের উন্নয়নের জন্য বিদেশি রাজনৈতিক থিসিসের মুখোপেক্ষি থাকতে হয়। তাজউদ্দিন কেন ভুল বলেননি সেটা উপরের সাক্ষাৎকারেই আছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন তার এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ সহজভাবে নেবে না কোনো পরাশক্তি। এমনকি ভারতও না। তাকে মেরে ফেলে হবে সেটাও তিনি জানতেন! সেই মৃত্যু দেশের ভালো চেয়ে হয়েছিল নাকি দেশকে ডোবাতে তা বিবেচনার ভার আপনাদের প্রজ্ঞার ওপরেই ছেড়ে দিলাম।

সম্পূরক

২৬ মার্চ ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধুর শেষ জনসভায় দেওয়া বক্তৃতায় বাকশালের রূপরেখা ব্যাখ্যা করেছিলেন তার পিডিএফ

বাকশাল কমিটিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পিডিএফ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}