,

বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ফখরুল কেমন হবেন?

স্বদেশ রায়

নির্বাচনের মাঠ দেখে এখন দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে। এক. আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। দুই. বগুড়ার আসন থেকে ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়লাভ করছেন। তিনি ঠাকুরগাঁও এ জয়ী হতে পারছেন না। সেখানে রমেশ চন্দ্র সেনের অবস্থা অনেক ভালো।

তাই স্বাভাবিকই নতুন বছরে আওয়ামী লীগ যেমন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টও বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। তবে নির্বাচনের মাঠ দেখে এটাও বোঝা যাচ্ছে, ঐক্যফ্রন্টের বিএনপি ও জামায়াত ছাড়া অন্য কোনও দলের কোনও প্রার্থী নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সম্ভবত বের হয়ে আসতে পারবেন না। এ পর্যন্ত গণফোরামের প্রার্থীদের সম্পর্কে যা খোঁজ খবর পেয়েছি তাতে তাদের কেউ জয়লাভ করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

যেমন-ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের এক তরুণকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তাদের এলাকার গণফোরামের প্রার্থীর নাম জানে কিনা? সে সুব্রত চৌধুরির নাম জানে না। তাকে কোনওদিন দেখেওনি। মোস্তফা মহসিন মন্টুকেও তার নির্বাচনী এলাকার নব্বইভাগ লোক চেনে না। রেজা কিবরিয়াকে তার এলাকার অনেকে ঘৃণা করছে পিতৃহন্তাদের সঙ্গে হাত মেলানোর জন্যে। অন্যদিকে মাহমুদুর রহমান মান্না এলাকা ছেড়ে চলে এসেছেন। তিনি এলাকায় বিএনপির লোকজনের কাছেই পাত্তা পাচ্ছেন না। আ স ম রবও কোনও লোকজন পাননি ওইভাবে এলাকাতে। কাদের সিদ্দিকীর যারা প্রার্থী তাদের কারও পাস করার কোনও প্রশ্ন ওঠে না। সে ধরনের প্রার্থীও কেউ নন। তাই যতই ঐক্যফ্রন্ট বলা হোক না কেন, বাস্তবে বিএনপি জামায়াতই আগামী পার্লামেন্টে বিরোধী দল হিসেবে বসতে যাচ্ছে।

অনেকে মনে করছে শেষ অবধি বিএনপি নির্বাচনে থাকবে না। কারণ, তারেক রহমানের একটি প্লান আছে, নির্বাচনের দিনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাস্তায় লোক নামিয়ে দেশে অস্থিরতা তৈরি করা। তারেক রহমানের যে সমস্ত ভিডিও বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সেখানে তার কথাবার্তা শুনলে তাকে শতভাগ সুস্থ মনে হয় না। বরং তাকে অনেকখানি অসুস্থ মনে হয়। এ অবস্থায় তিনি অনেক ধরনের অসুস্থ ও অবাস্তব চিন্তা করবেন।

তবে রাজনীতির মাঠে থেকে ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, নির্বাচনের দিন সরে আসার অর্থ হবে আরেকবার আত্মহত্যা করা। কারণ, এ পর্যন্ত কোনও ঈদের পরে বিএনপির ডাকে কোনও লোক রাস্তায় নামেনি। ঢাকা অবরোধ করতে গিয়ে পাঁচ বছর আগে বেগম জিয়া নিজেই অবরুদ্ধ হয়েছিলেন। তার পরে দেশ আরও পাঁচ বছর পার করে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে মধ্যআয়ের দেশ হয়েছে। একটি মধ্য আয়ের দেশে রাজপথে লোক নামানো অনেক কষ্টের।

কারণ এখন আর কাজ ছাড়া, ইনকাম ছাড়া কোনও মানুষ নেই। তাই কারও কোনও সময় নেই রাজপথের তামাশায়। তাছাড়া কেন নামবে রাজপথে? খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে? কী লাভ তাকে মুক্ত করে? কারণ, এখন তো এটা বাস্তব সত্য শেখ হাসিনা ছাড়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশের নেতৃত্ব আর কারও কাছে দিলে দেশ পিছিয়ে যাবে।

আর বেগম জিয়ার মত একজন অশিক্ষিত ভদ্র মহিলার পক্ষে এই উন্নত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবার কোনও সুযোগ নেই। এছাড়া রাজপথে লোক নামতে হবে তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনতে! কেন ফেরাতে যাবে লোকে তাকে? আবার একটি হাওয়া ভবন খুলে ১০ শতাংশ কমিশন চালু করার জন্যে? আবার একুশে অগাস্ট তৈরি করে দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্যে? মানুষ এগুলো চায় না। মানুষ এখন অনেক সচেতন। এমনকি বিএনপির ভদ্রলোকেরাও চায় না যে তারেক রহমান আবার নেতৃত্বে আসুক। তাছাড়া তারেক রহমান সম্পর্কে লন্ডনে বসবাসরত ভদ্র বিএনপি সমর্থকদের বক্তব্য, লন্ডনে সে যাদের সঙ্গে মেশে তাতেই বোঝা যায় তারেক কোনদিন হাওয়া ভবন কালচার থেকে বের হতে পারবে না।

এমতাবস্থায় বাস্তবতা বুঝে ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বজনরাও মনে করেন, এখন বিএনপির মূল নেতা হওয়া উচিত ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তিনি খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের থেকে অনেক বেশি যোগ্য। ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বজনরা শিক্ষিত। তাদের ধারণা অমূলক নয়। কারণ, বহু দল ঘুরে আসা মওদুদ আহমেদ কোনও মতেই বিএনপির মূল নেতা হতে পারেন না। তার থেকে ফখরুল ইসলাম আলমগীর অনেক ভালো। তাছাড়া তিনি এখন বেগম জিয়ার জন্যে যতই কান্নাকাটি করুন না কেন, বিএনপির মূল নেতা বা বিরোধী দলীয় নেতা হলে তিনি বাস্তবতা বুঝবেন বলে অনেকে মনে করেন। আর নির্বাচন হয়ে গেলে ড. কামাল আর বেশি দিন তাদের নেতা থাকবেন না। ড. কামালকে তখন তারেক রহমান আবার নতুন কোনও ফিস দিবেন না। তাতে করে তিনিও বিনা ফিসে আর সময় দিতে আসবেন না। তাই সব মিলে আগামীতে বিরোধী দলের মূল নেতা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই হচ্ছেন।

সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারবেন, তিনি একটি উন্নত ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতা। তাই দেশকে পিছনে টানতে গেলে আর যাই হোক, তিনি মানুষের সমর্থন পাবেন না। যে কারণে তিনি নিশ্চয়ই একজন পজিটিভ নেতা হবেন। সারাক্ষণ বেগম জিয়ার মুক্তি বা তারেক রহমানকে ফিরিয়ে আনা এই সব ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থেকে তিনি তার দলকে ধ্বংসের দিকে টেনে নেবেন না। তিনি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেননি তার ভিডিও বার্তায়। তিনি একটি যুদ্ধের কথা বলেছেন। তারপরেও তিনি বলেছেন, তার বয়স সত্তর। এই সত্তর বছর বয়সে এসে তিনি তরুণ প্রজম্মের জন্য ভাবছেন। তিনি নিশ্চয়ই তরুণ প্রজম্মকে তারেক রহমান বানাতে চাইবেন না। তারা কেউ মাশরাফি হোক, কেউ বুয়েটে অতি বুদ্ধিমান রোবট তৈরি করুক- এটাই চাইবেন। তাছাড়া ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বজনরা যখন উপলব্ধি করেছেন তাদের পরিবারের মানুষটিরই মূল নেতা হওয়া উচিত তখন নিশ্চয়ই ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল তৈরির পথেই হাঁটবেন।

তিনি বা তার অনুসারীরা যেভাবে দলকে নির্বাচনের পথে নিয়ে এসেছেন, তাতে বোঝা যায়- তারেক রহমান বা বেগম জিয়ার ওই পেট্রোল বোমা ও গ্রেনেড হামলার রাজনীতিতে ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর থাকবেন না। অন্যদিকে তারেক রহমানের কারণে বিএনপির অনেক নেতা নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। তারাও বলেছেন ৩০ ডিসেম্বরের পরে তারা কথা বলবেন। তারা আর যাই হোক তারেক রহমানের পক্ষে কথা বলবেন না।

তাই স্বাভাবিকভাবে একটি বিষয় নির্বাচনের এই চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, এই নির্বাচনের ভেতর দিয়ে যেমন সমৃদ্ধির বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টি সামনে আসছে। স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ পাচ্ছেন। তেমনি ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপি সংসদে গেলেও সে বিএনপি অনেকখানি তারেক রহমান ও খালেদা মুক্ত বিএনপি হবে। হয়তো একেবারে ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন হবে না। তবে বিএনপির খালেদা ও তারেক মুক্ত হবার যাত্রাটি শুরু হবে।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}