,

শিক্ষক শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় ভারাক্রান্ত শিক্ষাঙ্গন

আকাশবার্তা ডেস্ক :

জীবন অমূল্য সম্পদ। একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নানা আয়োজন করে মানুষ। নির্বিঘ্নে জীবন অতিবাহিত করার জন্য মনুষ্য সমাজে চলে নানা আয়োজন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঘাত-প্রতিঘাত থাকলেও সুখ-স্বাচ্ছন্দে বেঁচে থাকার স্বপ্ন প্রতিটি মানুষের। তবে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সাধের জীবন বিসর্জন দেয়ার ঘটনাও পৃথিবীতে বিরল নয়। হতাশার গহীন বালুচড়ে আছড়ে পরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়ে মুক্তির সন্ধান করেছেন অনেকেই। আর এভাবেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে জীবন থেকে পালিয়ে স্বস্তি খুঁজতে চেয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১৮ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ফলে এ বছর দীর্ঘ হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মিছিল। এসব ঘটনা শিক্ষা খাতকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গণমাধ্যম বলছে, এসব আত্মহত্যার পিছনে রয়েছে পারিবারিক কলহ, প্রেম, একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে হতাশা, কাক্সিক্ষত চাকরি না পাওয়াসহ নানাবিধ কারণ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, এ বছর শুধু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়েই কমপক্ষে ৯ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।

আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া এসব শিক্ষার্থী হলেন, ফিন্যান্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী তরুণ হোসেন, সংগীত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের মুশফিক মাহবুব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র জাকির হোসেন, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফাহমিদা রেজা সিলভির আত্মহত্যার ঘটনা বেশ আলোচিত। এই ৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনার পিছনে রয়েছে পারিবারিক কলহ, শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা ও প্রেম। আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরা হলেন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হুজাইফা রশিদ, সদ্য সাবেক শিক্ষার্থী মেহের নিগার দানি, সান্ধ্য কোর্সের শিক্ষার্থী তানভীর রহমান ও মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী আফিয়া সারিকা।

আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া শিক্ষার্থীরা কেউ হলের ছাদ থেকে লাফিয়ে, কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া চলতি বছরে ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের ৪ শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। প্রেমে ব্যর্থ, পারিবারিক অশান্তি, অসুস্থতাসহ নানা কারণে আত্মহননের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। আত্মহত্যার শিকার শিক্ষার্থীরা হলেন, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী মুমতাহেনা আফরোজ ও তার সহপাঠী রোকনুজ্জামান। মুমতাহেনা গলায় ফাঁস দেয়ার মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে রোকনুজ্জামান। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। এছাড়া আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সাইমুজ্জামান খান সাইম ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান।

এ বছরই মর্মান্তিক এক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী অর্ঘ বিশ্বাস।এদিকে চাকরি না পেয়ে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর রাতে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সৈকত ম-ল। তিনি ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজির ছাত্র ছিলেন। শুধু শিক্ষার্থী নন, চলতি বছরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। অন্তত দুজন শিক্ষক আত্মহত্যা করেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। এদের মধ্যে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইফতেখার মাহমুদ। ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিতে না পারায় কাক্সিক্ষত চাকরি না হওয়ায় তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এছাড়া পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক দেবাশীস ম-লও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তার আত্মহত্যার পিছনেও রয়েছে কাক্সিক্ষত চাকরি না পাওয়ার হতাশা। ভিকারুননিসার ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যা বছরজুড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাকে অনেকাংশে ম্লান করে দিয়েছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা। জানা যায়, ২ ডিসেম্বর স্কুলের পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পান। মোবাইলে নকল করেছে এমন অভিযোগে পরদিন অরিত্রীকে তার মা-বাবাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে স্কুলে গেলে ভাইস প্রিন্সিপাল তাদের অপমান করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। মেয়ের টিসি নিয়ে যেতে বলেন। পরে প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে তিনিও একই রকম আচরণ করেন। এ সময় অরিত্রী দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে বাসায় গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। এদিকে অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ সেরা এই প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষকে অপসারণ করা হয়েছে। একই সাথে ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের নামও পরিবর্তনের প্রস্তাবও এসেছে।

এসব আত্মহত্যার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের পরিচালক ও এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মেহজাবিন হক বলেন, সবাই সচেতন হলে আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলো কমানো সম্ভব। কারো যদি আত্মহত্যা করার মতো অবস্থা হয়, তার বন্ধুদের উচিত তার গায়ে হাত রাখা এবং তাকে বুঝানো। তাকে বুঝানো উচিত যে পৃথিবীতে তোমার বেঁচে থাকা কত দরকার। আত্মহত্যা কোনো সমস্যার সমাধান নয় বলেও মনে করেন তিনি। ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে আত্মহত্যার অনেক ঘটনা ঘটছে বলে মনে করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ও আল-ফিকহ্ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাছির উদ্দিন।

এর আগে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আত্মহত্যার মূল কারণ ধর্মীয় জ্ঞান ও মূল্যবোধের অবক্ষয়। যখন কেউ হতাশ ও নিজেকে খুব অসহায় মনে করেন তখন আত্মহত্যার কুচিন্তা মনে আসে। তখন মনে করতে হবে এখন কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের দুরভিসন্ধি এসেছে। তাই এসব মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। আত্মহত্যার কথা মনে এলে এ থেকে নিজকে রক্ষার জন্য নামাজের মাধ্যমে বিনীতভাবে আল্লাহর সাহায্য ও দয়া কামনা করা উচিত।’

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}