,

প্রতিকী ছবি।

অধরা ১১ শীর্ষ সন্ত্রাসী

আকাশবার্তা ডেস্ক :

সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ১১ জন এখনো অধরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মুখে দাড়ি মাথায় টুপি পরে মাঝে মধ্যে দেশে এলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে পড়েনি। তবে পুলিশ সবসময়ই বলে আসছে পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ গত বুধবার রাতে আরব আমিরাতের দুবাইয়ে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল)-এর হাতে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম মালিবাগের দুই পুলিশ কর্মকর্তা খুনের আসামি জিসান আহমেদ গ্রেপ্তার হয়েছে। পুরস্কার ঘোষিত তালিকায় তার নাম ছিলো ২০তম। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের বিরুদ্ধে ডিবি পুলিশের ইন্সপেক্টর নুরুল আলম শিকদার এবং এসআই আলমগীর হোসেন হত্যামামলার বিচারকাজ দীর্ঘ ১৬ বছরেও শেষ হয়নি।

২০০৩ সালের ১৫ মে রাতে রাজধানীর মালিবাগের সানরাইজ আবাসিক হোটেলে পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানসহ তার সহযোগীদের অতর্কিত গুলিতে নিহত হন। ওই ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের বিরুদ্ধে ডিবির তৎকালীন ইন্সপেক্টর জিএম এনামুল হক মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে ২০০৪ সালে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ওই চার্জশিটে ৭৫ জনকে সাক্ষী করা হয়।

পরে ২০০৭ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত। চার্জগঠনের পরদীর্ঘ ১২ বছরে মাত্র ১২ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে বলে আদালত সুত্র জানিয়েছে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মাকছুদা পারভীনের আদালতে বিচারাধীন।

মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের মধ্যে আলোচিত নাম ছিলো কালা জাহাঙ্গীর। তার বিরুদ্ধে ১২টি হত্যামামলা ছিল। এর মধ্যে প্রায় অধিকাংশ মামলায় খালাস পেয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে ১৯৯৪ সালে পুলিশ প্রশাসনকে প্রতারিত করার জন্য তার মৃত্যুর খবর প্রচার করা হয়। কালা জাহাঙ্গীর সন্দেহে মোট ৬৫ ব্যক্তিকে আটকের পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত কালা জাহাঙ্গীরের সন্ধান পুলিশ এখনো পায়নি।

গত ২০০১ সালে অভিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৬ জন ওয়ার্ড কমিশনারকে একের পর এক গুলি করে খুন করা হয়। এরপর একই বছরের ২৬ ডিসেম্বর আলোচিত ২৩ জন সন্ত্রাসীর নাম তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করে। আর এদের গ্রেপ্তার করতে ১৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তার দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো ১১ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। তারা বিভিন্ন সময়ে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকেই বিদেশে গ্রেপ্তারের পর আবার মুক্তিও পেয়ে যাচ্ছে।

অবশ্য পুুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে এর আগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। তার মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী পিচ্চি হান্নান পুলিশের ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে। আর শীর্ষ সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন তেজগাঁও এলাকায় চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণপিটুনীতে মারা গেছে। এছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী কামাল পাশাকে তার বাবা মোহাম্মদপুর থানায় সোপর্দ করে। র‌্যাব ও পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে।

শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমানকে কেরানীগঞ্জ এলাকায় র্যাব অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে। আর শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা ও পুরস্কার ঘোষণার আগে পিচ্চি হেলাল কারাগারে আটক ছিল। এছাড়া, শীর্ষ সন্ত্রাসী ফ্রিডম রাসু, লিয়াকত, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ, মশিউর রহমান, ফ্রিডম সোহেল ও কিলার আব্বাসও গ্রেপ্তার হয়েছে। সর্বশেষ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হলো শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান।

সূত্র জানায়, সরকারের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী কালা জাহাঙ্গীরের তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তার বিরুদ্ধে ৬ জন ওয়ার্ড কমিশনারসহ ১২টি হত্যামামলা ছিল। এসব মামলার মধ্যে গত ২০০৯ সালেই ৮টিতে খালাস পেয়েছিল। আর অন্য মামলাগুলোর অধিকাংশই খালাস পেয়েছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী তানভীর ইসলাম ওরফে জয়ের বিরুদ্ধে ১টি হত্যামামলা ছিল। সে ওই মামলা থেকে রেহাই পেলেও তার কোনো সন্ধান নেই। শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিছ আহমদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৯টি মামলা ছিল।

এর মধ্যে ৯টিতে খালাস পেয়েছে। আবার তালিকার অন্যতম হচ্ছে ইমাম হোসেন ওরফে ইমাম। তার বিরুদ্ধে ৩টি মামলার সবগুলোতেই মুক্তি পেয়েছে। ইমামের তালিকার পরই প্রকাশ কুমার বিশ্বাসের নাম ছিল। আর তার ভাই বিকাশ কুমারের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১০টি মামলা ছিল। ওই সব মামলা থেকেই মুক্তি পেয়েছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বিকাশকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের আলোচিত নাম সাবেক এসি আক্রাম হোসেন। পুলিশ বরযাত্রী সেজে গ্রেপ্তার করেছিল।

গত ২০০৮ সালে সে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পুলিশ তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করেছে। আর পুরস্কার ঘোষিত তালিকায় আব্দুর জব্বার ওরফে মুন্নার নাম ছিল ১৩ নম্বর তালিকায়। মোল্লা মাসুদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ ১০টি মামলা ছিল। এর অধিকাংশ মামলা থেকেই রেহাই পেয়েছে। আবার ত্রিমতি সুব্রত বাইনের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা ছিল। পুরান ঢাকার শামীম ওরফে আগা শামীমের নাম ১১ নম্বর তালিকায়। আর ২২ নম্বর তালিকায় জাফর আহমেদ ওরফে মানিকের নাম। তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা ছিল। আর সাগরের বিরুদ্ধে ৭টি মামলা ছিল।

এর মধ্যে ৫টি থেকে মুক্তি পেয়েছে আর ৩টি মামলা বিচারাধীন বলে জানা গেছে। এই পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ফাইলবন্দি অবস্থায় ছিলো। তবে এসব সন্ত্রাসীদের নামে দেশের বিভিন্ন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তাদের কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। এসব সন্ত্রাসী দেশের বাইরে অবস্থান করলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক মুরুব্বীদের ছত্রছায়ায় তাদের নেটওয়ার্ক সচল রেখেছে। আর ওই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সচল রাখার কারণেই পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান দুবাইয়ে আটক হয়েছেন।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি ক্যাসিনো ব্যবসার ভাগ নিয়ে খালেদসহ জড়িতদের সঙ্গে জিসানের বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর খালেদ গ্রেপ্তারের পর তার সেলফোন থেকেই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের সামনে জিসানকে দিয়ে কথা বলতে বাধ্য করে। আর ওই কথোপকথনের সূত্র ধরেই শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের অবস্থান সনাক্ত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাই পুলিশ তাকে গত বুধবার রাতে আটক করে।

জিসানের নেতৃত্বে রাজধানীর মালিবাগের একটি আবাসিক হোটেলে গোয়েন্দা পুলিশের দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে খুন করে। এরপর থেকে সে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে চলে যায়। এরপর সেখান থেকেই বাংলাদেশে তার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ শুরু করে। পরে ভারতীয় নাগরিক পরিচয়ে পাসপোর্ট নিয়ে দুবাইয়ে পাড়ি জমায়। তার পর থেকেই সে দুবাইয়ে ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে তোলে। আর বাংলাদেশের চাঁদাবাজির সম্রাজ্য বজায় রাখে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো) মহিউল ইসলাম জানান, শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘জিসানকে গ্রেপ্তারের জন্য গত দুমাস আগে থেকে ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো দুবাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। গোয়েন্দা পুলিশ-ডিবি থেকে জিসানের লেটেস্ট ছবি ও তথ্য পাঠানোর পর তারা (দুবাই-এনসিবি) জিসান আহম্মেদকে শনাক্তের কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে দুবাই এনসিবি জানায়, তারা জিসানকে নজরদারির মধ্যে রেখেছেন। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে গত বুধবার রাতে গ্রেপ্তার করে।

পরে ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো দুবাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করে। দুবাই এনসিবি জিসানের বিষয়ে মামলাসংক্রান্ত সকল তথ্য চেয়েছে। ওই সব প্রমাণগুলো মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ১৫ মে সন্ত্রাসীরা মালিবাগের সানরাইজ আবাসিক হোটেলে অবস্থানরত ব্যবসায়ীদের টাকা ও মূল্যবান স্বর্ণ লুণ্ঠন করার তথ্য পায় ডিবি পুলিশ। পরে পুলিশ সন্ত্রাসীদের জন্য হোটেলের ১৩ ও ১৪ নম্বর কক্ষ ভাড়া নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।

পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে হোটেলের দ্বিতীয় তলায় গোলাগুলি শুরু হয়। ডিবি পুলিশ সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করতে থাকে। একপর্যায়ে এক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হলে সন্ত্রাসীরা তাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইন্সপেক্টর নুরুল আলম ও এসআই আলমগীর হোসেন নিহত হন। এ ঘটনায় নয়াটোলার জিসান, মগবাজারের উপল ও এজিবি কলোনির ইখতিয়ার ছিল।

সূত্র : আমার সংবাদ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

অক্টোবর ২০১৯
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« সেপ্টেম্বর    
 
১০১১
১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৮২৯৩০৩১  
}