,

ফ্ল্যাট বাড়িতে সুন্দরীদের হাট!

লাইফস্টাইল ডেস্ক :

কোকিল কণ্ঠের এক নারী। বেশভূষায় গ্ল্যামার জগতের নায়িকা। নাম তার সুবর্ণা রূপা। উন্নত বিশ্বের দামিদামি মেকআপে তিনি সাজেন। শুধু তাই নয়, বাহারি বাহারি পোশাকে তিনি সরকারি-বেসরকারি এবং ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছাড়াও সমাজের উচ্চবৃত্তের মানুষদের সামনে হাজির হন। দেখতে ঠিক হরিণীর মতো। ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলের লাইভেও তাকে দেখা যেত। রাজধানীর এক ফ্ল্যাট বাড়িতে সুর্য ডোবার সাথে সাথেই তার গানের আসর। প্রতিবেশী আর পরিচিতরা তাকে গানের শিল্পী হিসেবেই চিনতেন।

কিন্তু না! তিনি শুধুই শিল্পী না, এক ভয়ঙ্কর জগতের নারী। স্বামী, সন্তান কাউকে তিনি সঙ্গে রাখেন না। কাছে রাখেন কয়েকজন সন্দুরী, আর এক তরুণকে। রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় ফ্ল্যাটবাসা ভাড়া নিয়েই তিনি থাকতেন। কোকিল কণ্ঠের শিল্পী পরিচয়ের আড়ালে তার ভয়ঙ্কর মরণ নেশা মাদকের ব্যবসা করতেন। তার ফ্ল্যাটটিকে সুন্দরী উঠতি বয়সের নারী ও মাদকের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা চাঞ্চল্যকর এই তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, শুধু রূপা নয়, তার মতো গ্ল্যামার জগতের আরও অনেক নায়িকা থেকে শুরু করে নামিদামি ব্যক্তিদের স্ত্রী ও সন্তানরাও অল্প সময়ে ধনী হওয়ার নেশায় ইয়াবার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। তাদের শনাক্তকরণে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছেন। আর এই মাদক সম্রাজ্ঞীদের মধ্যে জামিলা ওরফে জামিলা খালা, রাবেয়া, রুমাকে গত সোমবার গভীর রাতে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার উত্তর শাহজাহানপুরস্থ বরিশাল স্যানেটারির সামনে রাত ২টার দিকে তাদের গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ পিস অ্যামফিটামিনযুক্ত ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত জামিলা রাজধানীতে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যাপক খ্যাতি অর্জনকারী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গুলশান সার্কেলের পরির্দশক সামছুল কবির জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা একে অপরের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবার ব্যবসা করছেন।

অপরদিকে সুবর্ণা রূপা নগরীর খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকার ১৯ নম্বর সড়কের ছয় তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন। ওই বাসায় গত ২৯ অক্টোবর অভিযান চালিয়ে সুবর্ণা রূপা ও তার সহযোগী রুবেলকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা তাদের আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের পর বারবার সুবর্ণা নিজেকে বড় মাপের শিল্পী এবং কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক এক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতার পুত্রবধূ হিসেবে পরিচয় দেন। শুধু তাই নয়, তাকে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সমাজের প্রভাবশালী রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন মহল তদবির করেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যার পরপরই সুবর্ণার বাসায় গানের অনুষ্ঠানসহ পার্টি দেয়া হতো। ওই পার্টিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, প্রবাসীসহ প্রভাবশালীরা অংশ নিতেন। আর বাসার নিচে বিলাসবহুল গাড়িগুলো পার্কিং করা হতো। এই পার্টি গভীর রাত পর্যন্ত চলতো। পার্টিতে ড্যান্স আর কোকিল কণ্ঠের গানের তালে তালে আগন্তুকরাও নাচতো। সুবর্ণা রূপাসহ অনেকেই গান গাইতেন। ভেতরে ঢুকলে মনে হতো পশ্চিমা দেশের ডিজে পার্টি। আর অনবরত নিরাপদে ইয়াবা সেবন করতেন আগন্তুকরা। শুধু তাই নয়, মনোরঞ্জনের জন্য একঝাঁক ডানাকাটা পরীর মতো সুন্দরী রাখা হতো। গান আর ইয়াবা সেবনে বুঁদ হয়ে তরুণীদের সঙ্গে নাচ করতেন অংশগ্রহণকারীরা।

সূত্র জানায়, বাড়ির মালিকের নাম আলী আহমদ। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বলেছেন, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সুবর্ণা রূপার ফ্ল্যাটে সমাজের পরিচিতজনরা আসতেন। অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে তাকে বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিস করা হয়েছিল। সুবর্ণা শুরুতে তার বাড়ির ছয়তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন। এরপর তিনি তিনতলার ফ্ল্যাট ভাড়া নেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সুবর্ণার ফ্ল্যাটে নিয়মিত চার-পাঁচজন তরুণী থাকতো। আর অভিযানের সময় সেখানে চারজন তরুণীকে পাওয়া গেছে। তারা তখন মাদকাসক্ত ছিলো। তাদের আটকের পর উত্তরার একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

অপর এক সূত্র জানায়, সুবর্ণার ফ্ল্যাটে একজন গৃহপরিচারিকা, দ্বিতীয়জন আত্মীয়, বাকি দুজন তার ভক্ত বলে পরিচয় দিয়েছেন। আর তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। ফেসবুকেই তাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। আর গ্রেপ্তারকৃত সুবর্ণার বাসায় থাকেন রুবেল নামে এক যুবক। তিনি প্রথমে ভাই পরিচয় দিলেও নোয়াখালীর সেনবাগের ছাতাপাইয়া এলাকায় তার বাড়ি। ইয়াবা ও নারীদের খদ্দের সংগ্রহের কাজ করতো রুবেল। প্রায় তিন লাখ টাকা মূল্যের ফিজার বাইক চালায় সে।
ইয়াবা বিক্রেতা ও অনৈতিক ব্যবসার দালাল পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে পাঠাও চালক হিসেবে পরিচয় দিতো রুবেল। সে সুবর্ণার পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের কাছে নিয়মিত ইয়াবা সরবরাহ করতো।

সূত্র জানায়, সুবর্ণা রূপার স্বামীর নাম রেজাউল করিম রেজা থাকেন সৌদি আরবে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছেলে ও স্কুল পড়ুয়া এক মেয়ে রয়েছে। দুই সন্তানই থাকেন কক্সবাজারে। কক্সবাজারের বাহারছড়ায় সুবর্ণা রূপার শ্বশুরবাড়ি। তার ছেলে-মেয়ে খিলগাঁওয়ের ওই বাসায় তেমন আসতো না। আর মাঝে-মধ্যে তার সন্তানরা এলেও তখন তিনি বাসায় কোনো পার্টির আয়োজন করতেন না। শুধু তাই নয়, তার ছেলে-মেয়ে থাকাকালীন বোরকা পরে চলাফেরা করেন সুবর্ণা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর খিলগাঁওয়ের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে তাকে আটক করে। এসময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নারী সদস্যরা তার শরীরের বিশেষ অঙ্গে রাখা ১০৭ পিস ইয়াবা জব্দ করে। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন বাদি হয়ে খিলগাঁও থানায় মামলা করেছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রমনা অঞ্চলের পরিদর্শক কামরুল ইসলাম জানান, হোম পার্টিসহ রুবেলের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্নস্থানে ইয়াবা সাপ্লাই দিতেন সুবর্ণা। আর ইয়াবাগুলো তিনি কক্সবাজার থেকেই সংগ্রহ করতেন। তার সঙ্গে বড় কোনো মাদক সিন্ডিকেটের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাবে।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

নভেম্বর ২০১৯
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« অক্টোবর    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০  
}