,

কাউন্সিল উত্তাপে চাঙ্গা যুবলীগ

আকাশবার্তা ডেস্ক :

সংগঠনের সপ্তম কাউন্সিল উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম সহযোগী সংগঠন আওয়ামী যুবলীগে। ক্যাসিনো ঝড়ে বেশকিছু দিন সমালোচনার শীর্ষে থাকা সংগঠনজুড়ে এখন নেতৃত্বের লড়াই।

সংগঠনটির বিতর্কিতদের ধরাশায়ী হবার সুবাদে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ক্লিন ইমেজের একাধিক প্রার্থী। যদিও বয়স নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন অনেক প্রার্থী। এরপরও কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে জোর লবিয়িং শুরু করেছেন তারা।

এদিকে, কংগ্রেস সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি প্রায় শেষপর্যায়ে এনেছে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি। আগামীকাল ২৩ নভেম্বর আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় সপ্তম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে। কংগ্রেস ঘিরে গঠিত ১১টি উপ-কমিটি কাজ শেষ পর্যায়ে এনেছে। সোহরাওাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের মূল আয়োজন করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর আদলে তৈরি হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন মূলমঞ্চ।

একইসঙ্গে যুবলীগের বর্ণাঢ্য ইতিহাসও তুলে ধরা হবে সম্মেলন স্থলে। থাকবে সরকারের নেয়া উন্নয়ন প্রকল্পের প্রচারণা। কংগ্রেসে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া বর্ণিল সাজে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও আশপাশ সাজানো হবে। মনিটরের মাধ্যমে আগত সকল আয়োজন কাউন্সিলর এবং ডেলিগেটদের সামনে দেখানো হবে।

গত মাসে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে অবৈধ পন্থায় অঢেল সম্পত্তি ও সরকারি দলের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ বেশকিছু যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে। এরপর যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরীকে অব্যাহতি দেন শেখ হাসিনা। দখল-চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-অস্ত্রবাজি-ক্যাডারবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসার অভিযোগে শুদ্ধি অভিযানে আটক ও পদহারা একাধিক প্রভাবশালী নেতা।

যার পরিপ্রেক্ষিতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগী, মেধাবী এবং পরীক্ষিত নেতাদের কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।গত দশকে যুবলীগের ত্রাণকর্তা হিসেবে পরিচিতদের ছাড়াই জমে উঠেছে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আমলে নিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয়

রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পৃক্ত এক ডজন পরিচ্ছন্ন নেতা নেতৃত্বে আসার লড়াইয়ে উঠে এসেছেন। যাদের ঘিরে যুবলীগের প্রতিটি ইউনিটের নেতাকর্মীরা চাঙা হয়ে উঠেছেন। অপকর্মে জড়িত যুবলীগের শীর্ষ কয়েক নেতার দাপটে যারা কোণঠাসা ছিলেন সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পর তারাও চাঙা হয়ে উঠেছেন।

সবমিলিয়ে সম্মেলন ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে। প্রার্থীদের শোডাউন, মিছিল, ব্যানার ফেস্টুন আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে গোটা ঢাকা। প্রার্থীদের কর্মী ও সমর্থকদের বিশাল আকৃতির ফেস্টুন দেখা মিলছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে।

সম্ভাব্যদের মধ্যে একাধিক প্রার্থী বয়স নিয়ে শঙ্কার মধ্যে পড়েছেন। সম্প্রতি যুবলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনে ৫৫ বছর পর্যন্ত বিবেচনায় রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

যুবলীগ সূত্র মতে, এবারের কংগ্রেস হতে যুবলীগের রাজনীতিতে ৫৫ বছর বয়স নির্ধারণ হলে অনিশ্চয়তায় পড়েছে সংগঠনটির শতাধিক নেতার ভাগ্য। পরিবর্তিত পরিস্থিতে ঐসব নেতাদের বাইরে রেখে যুবলীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। যার কারণে এবারের কংগ্রেসে বয়সের ব্যারিকেটের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে।

সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সূত্র মতে, সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা অনুযায়ী, গঠনতন্ত্রে সংশোধনী এনে যুবলীগের রাজনীতিতে বয়স সীমা ৫৫ করার প্রস্তাবনা কংগ্রেসে তোলা হবে। এই কংগ্রেসে ৫৫ বাস্তবায়ন হবে কি না— সেটা সেখানেই সিদ্ধান্ত হবে।

যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির সদস্য সচিব মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ৫৫ করার প্রস্তাব গঠনতন্ত্র সংশোধন করে কংগ্রেসে তোলা হবে। কংগ্রেসে সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

কেন্দ্রীয় কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে আসতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন সংগঠনটির কয়েকজন নেতা। এর মধ্যে সভাপতি আলোচনায় আছেন যুবলীগের অন্যতম প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন, মজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাড. বেলাল হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন মহি, সুব্রত পাল, সাংগঠনিক সম্পাদক বদিউজ্জমান বদি প্রমুখ।

এর বাইরে যুবলীগের বাইরে থেকে শীর্ষ একজন আসতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। সেক্ষেত্রে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপসের মধ্যে একজনকে দেখা যেতে পারে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. ফারুক হোসেন ১৯৮৬ সাল হতে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। এর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ফরিদপুর জেলায় শীর্ষপদে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এক-এগারো সরকারসহ জিয়া, এরশাদের সময়ে টানা ৪ বছর ৬ মাসসহ বিভিন্ন মেয়াদে ৭ বছরের বেশি কারাভোগ করেছেন। যুবলীগের ৬ষ্ঠ কংগ্রেস প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পান।

এর আগে ২০০৩ সালের বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের ৫ম কংগ্রেস (নানক-আজম কমিটির) কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। একাধিকবার যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৮৩ সালে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা (ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও রাজবাড়ী জেলা) ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে ফরিদপুরের ইয়াছিন কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।

স্বৈরশাসক এরশাদ পতন আন্দোলনের সময়ে মার্শাল ল বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্মুখিন হন। পরবর্তীতে এরশাদের পতন হলে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা উদ্যোগী হয়ে তাকে কারামুক্ত করেন।

প্রার্থীতা নিয়ে জানতে চাইলে মো. ফারুক হোসেন বলেন, সব সময় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি। দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় ও ফরিদপুরে ছাত্রলীগ করেছি। ১৯৮৬ সাল হতে যুবলীগ করি, একদিনের জন্যও সংগঠনের বাইরে থাকিনি। আমার সর্বোচ্চ দিয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করি।

তিনি আরও বলেন, যুবলীগের জন্য বা দলের জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত আছি এবং অতীতেও তা করেছি। তবে সবকিছুই আমি আমার নেত্রীর উপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি আমাকে যেভাবে যে পদে ভালো মনে করবেন তা আমি মাথা পেতে নেব।

এছাড়া আলোচনায় রয়েছেন আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবর রহমান চৌধুরী। তিনিও দুঃসময়ে যুবলীগের হাল ধরেছিলেন। ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যুবলীগের এক নং যুগ্ম সম্পাদক এবং ১-১১ সময় দুবছর যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন ২০১৬ সালে যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সহদপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

যুগ্ম সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি দীর্ঘ সময় ধরে যুবলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি এর আগে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি। তাকে সংগঠনটির শীর্ষ পদে চান অনুসারীরা।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক সুব্রত পাল ২০০৩ থেকে ২০১২ পর্যন্ত যুবলীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতে তিনি তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ ফজলুল হক মনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ১৪ জুলাই যুবলীগের সম্মেলন হয়। সম্মেলনে ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান ও হারুনুর রশীদ সাধারণ সম্পাদক হন।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

}