,

অসময়ে পেঁয়াজ কেনার অনুরোধ ভারতের

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক :

একটা উষ্ণ সম্পর্কে থেকেও পেঁয়াজ ইস্যুতে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে জল কম ঘোলা হয়নি। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই প্রতিবেশীকে বিপদে ফেলে কোনো আগাম নোটিস না দিয়েই ভারত সরকার বাংলাদেশে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

সেই স্থগিতাদেশ এখনো প্রত্যাহার হয়নি। পেঁয়াজ ইস্যুতে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে দুই দেশের সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়েও। এতে বাংলাদেশের অসন্তুষ্টির বিষয়টিও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ওঠে এসেছে। তা সত্ত্বেও পেঁয়াজের স্থগিতাদেশ তুলে নেয়ার বিষয়ে ভারত সরকারের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

একপর্যায়ে বলা হয়, ভারতই এখন পেঁয়াজ সংকটে রয়েছে। তারা নিজেরাও বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করছে। অনন্যোপায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত দেশের চাহিদা মেটাতে পেঁয়াজ কেনায় নতুন নতুন রুট বা দেশ অনুসন্ধান করে। মিয়ানমার, চীন, মিসর, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বেশি দামে স্বাদহীন পেঁয়াজ কিনে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে।

এমন পরিস্থিতিতে সরকার আগামী রমজানকে সামনে রেখে নতুন করে আরও দুই লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি দুভাবেই তা আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চীন থেকে প্রায় প্রতিদিনই আসছে আমদানিকৃত পেঁয়াজ।

পাশাপাশি দেশেও মৌসুমের পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করেছে। বাজারেও দাম পড়তির দিকে। ঠিক সেই সময়ে এসে বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দিতে চায় ভারত সরকার। অর্থাৎ অসময়ে বাংলাদেশকে পেঁয়াজ কেনার অনুরোধ জানিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী।

তা-ও আবার ভারতের উৎপাদিত পেঁয়াজ নয়। বিভিন্ন দেশ থেকে রাজ্য সরকারগুলোর চাহিদা পূরণে উচ্চমূল্যে আমদানি করা স্বাদহীন পেঁয়াজ। মূলত রাজ্য সরকারগুলোর চাহিদা পূরণে কেন্দ্রীয় সরকার এই পেঁয়াজ আমদানি করেছিল। এখন সেই পেঁয়াজই নিতে চাচ্ছে না দেশটির রাজ্য সরকারগুলো।

কারণ সেসব প্রদেশের নিজস্ব উৎপাদিত পেঁয়াজই এখন বাজারে আসার সময় হয়েছে। তা ছাড়া আমদানি করা পেঁয়াজ স্বাদ ও গন্ধহীন এমন অজুহাতও তোলা হয়েছে। ফলে পেঁয়াজ আমদানি করে অনেকটাই বিপদে পড়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই-কমিশনার রকিবুল হকের সঙ্গে বৈঠক করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী। ওই বেঠকেই তিনি হাই-কমিশনারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পেঁয়াজ আমদানির অনুরোধ করেছেন।

এতে দাবি করা হয়, দেশীয় (ভারতের চাহিদার ভিত্তিতে) আমদানিকৃত পেঁয়াজ রাজ্য সরকারগুলো কিনতে রাজি না হওয়াই বাংলাদেশকে তা কিনে নেয়ার প্রস্তাব করা হয়। ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য প্রিন্ট তাদের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে।

ওই প্রতিবেদনে বৈঠকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভারতের জ্যেষ্ঠ এক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে সরকারের মনোভাব জানতে গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোয় যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির নতুন কোনো সিদ্ধান্ত হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা জানান, একদিকে দেশীয় পেঁয়াজ ওঠতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, অনেক আগেই দুই লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন সেই পেঁয়াজও আসতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারত থেকে নতুন করে পেঁয়াজ আনার কর্মপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নেই। নেয়ার সম্ভাবনাও কম।

তবে আমদানি হলেও সেই সিদ্ধান্তটি এখন একেবারেই সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওপরই নির্ভর করছে। অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ভারত বাংলাদেশকে পেঁয়াজ কেনার অনুরোধ করেছে— এমন তথ্যটি সে দেশের একটি গণমাধ্যমেই কেবল প্রকাশ হয়েছে।

সেখানে দায়িত্বশীল কারো বরাত দেয়া হয়নি। আবার আমরাও এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত বা মৌখিক প্রস্তাব পাইনি। বিষয়টি যেহেতু আলোচনায় এসেছে— সে বিষয়ে নিশ্চয়ই আমরা আমাদের হাই-কমিশনারের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা যাচাই করে দেখবো।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার্থেই সর্বদা কাজ করা উচিত। আমি মনে করি, সরকার সেটি করছেও। তাই পেঁয়াজ নিয়ে ভারত সরকার কী সমস্যায় পড়লো সেটি নিয়ে আমাদের ভাবার কাজ নয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিষিদ্ধপণ্য ছাড়া যেকোনো পণ্য যেকোনো সময় আমদানি হতেই পারে। যা এতদিন দুই দেশের মধ্যে চলেও আসছে। এখন ভারত যদি বাংলাদেশকে পেঁয়াজ দিতে চায়, আমাদের সেই পেঁয়াজের প্রয়োজন হবে কি-না, আমি জানি না। যদি হয়-ও, সেটিও জানি না আমরা নেবো কি-না।

তিনি আরও বলেন, এখন দেশে পেঁয়াজের মৌসুম শুরু হয়েছে। বাজারে আসছে দেশি পেঁয়াজ। বাজারও প্রায় নিয়ন্ত্রণে আসার পথে। শুনেছি রমজান উপলক্ষে অনেক আগেই টিসিবিসহ দেশের চারটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আরও দুই লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। চীন থেকে সেই পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েছেও।

এ পরিস্থিতিতে ভারত থেকে যদি পেঁয়াজ আনতেই হয়— সে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নীতিনির্ধারকদের দেশে পেঁয়াজের সার্বিক চাহিদা, বর্তমানে উৎপাদন পরিস্থিতি এবং কী আমদানি পেঁয়াজ দেশে এসেছে, পাইপলাইনে কত হাজার বা লাখ মেট্রিক টন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে— সেসব পরিস্থতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। সে ক্ষেত্রে যদি আমদানির প্রয়োজন হয়, তাহলে আমদানি করবে।

কিন্তু এখানেও কথা থাকে। ভারত ওইসব পেঁয়াজ উচ্চমূল্যে কিনেছে। আমরা অন্য জায়গায় কম দামে পেলে উচ্চমূল্যে সেই পেঁয়াজ কিনবো কেন? তাই পেঁয়াজ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যাতে দেশের কৃষক ও ভোক্তা স্বার্থের পরিপন্থি না হয়।

যদি কিনতেই হয়, তাহলে আমি বলবো; বাজারমূল্য বিবেচনা করতে হবে। দরকষাকষি করে যতটা কমানো যেতে পারে। এরপর ট্রান্সপোর্ট ফ্যাসালিটিসহ প্রণোদনার জায়গাটিও নিশ্চিত করতে হবে। যাতে ওই পেঁয়াজ স্থানীয় বাজারে সহনীয় দামে বিক্রি করা যায়।

এ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে সরকারি সিদ্ধান্তে পেঁয়াজ আমদানি করা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আমরা পেঁয়াজের ব্যবসা করি না। সরকারি সিদ্ধান্তে দেশের স্বার্থেই এখন পেঁয়াজ আমদানি করছি। চীন থেকে প্রতিদিনই আমাদের লক্ষ্যমাত্রার পেঁয়াজ দেশে আসছে। তবে ভারত থেকে আমরা কোনো পেঁয়াজ আমদানি করছি না।

প্রসঙ্গত, ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্যা প্রিন্ট-এ নাম প্রকাশ না করা এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত বিদেশ থেকে মোট ৩৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির চুক্তি করেছে। ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটিতে ১৮ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ পৌঁছেছে। রাজ্য সরকারগুলোর চাহিদা মেপেই এসব পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়।

কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে (ভারতে) পৌঁছার পর বিভিন্ন প্রদেশের সরকার আমদানিকৃত পেঁয়াজের মাত্র তিন হাজার মেট্রিক টন নিয়েছে। অবশিষ্ট পেঁয়াজ মুম্বাইয়ের জওয়াহেরলাল নেহরু বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে।

ওই কর্মকর্তার বরাতে আরও উল্লেখ করা হয়, ভারত এসব পেঁয়াজ প্রতি মেট্রিক টন ৫০ হাজার থেকে ৫৯ হাজার (৬০০ থেকে ৭০০ ডলারে) টাকায় আমদানি করেছে। এখন বাংলাদেশকে এসব পেঁয়াজ প্রতি মেট্রিক টন ৫৫০ থেকে ৫৮০ ডলারে কিনে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

জবাবে ওই বৈঠকে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই-কমিশনার রকিবুল হক ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীকে বলেছেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীন থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছে এবং নেপাল হয়ে আরও পেঁয়াজ দেশের বাজারে ঢোকার অপেক্ষায় আছে।

সুতরাং বিনামূল্যে পরিবহনসহ ভারতের কিছু প্রণোদনা থাকা উচিত। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে এই সময়ে পেঁয়াজ কেনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

প্রতিবেদনে ভারতের ভোক্তা কল্যাণ-বিষয়ক মন্ত্রী রাম বিলাস পাসওয়ানের বরাত দিয়ে বলা হয়, চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি (রাম বিলাস পাসওয়ান) জানান, আমদানিকৃত পেঁয়াজের থেকে মহারাষ্ট্র সরকার ১০ হাজার মেট্রিক টন, আসাম তিন হাজার মেট্রিক টন, হরিয়ানা তিন হাজার ৪৮০ মেট্রিক টন, কর্নাটক ২৫০ মেট্রিক টন ও ওড়িস্যা প্রদেশ সরকার ১০০ মেট্রিক টন চাহিদা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের আমদানিকৃত পেঁয়াজ নিতে রাজি না হওয়ায় সেগুলো পচে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

জানুয়ারি ২০২০
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ডিসেম্বর    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
}