শনিবার ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ ইং ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

রাজনীতিতে এখন আর কোনো শিষ্টাচার নেই

মো. আলী হোসেন >>

একসময় রাজনীতির মঞ্চে একে অপরের বিরুদ্ধে কাঁদা ছোড়াছুড়ি কিংবা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেও দিনশেষে একজায়গায় বসে চায়ের আড্ডায় মেতে ওঠতেন সবাই। বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চের নীচে এসে একে অন্যের সাথে হাত মেলাতেন। সুখ, দুঃখের খোঁজখবর নিতেন একে অন্যের। একদলের নেতারা অন্যদলের নেতাদের বাড়িতে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। এগুলো নব্বই দশকের আগের কথা। রাজনীতিতে হয়তো এমন স্বর্ণালী যুগ আর কখনও দেখা যাবে না।

আমরা যখন নব্বই দশকে রাজনীতি করি (১৯৯১-২০০১), তখনও রাজনীতির মাঠে একে অন্যের প্রতি অনেক সহমর্মীতা ছিল। তবে নিজদলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল খুবই চমৎকার। দলের এককর্মীর কিছু হলে অন্যরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতাম। এখন নিজদলের কাছেই নিরাপদ নয় কর্মীরা। বিগত এগার বছর যাবত আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। কিন্তু এই এগার বছরে আমার জানামতে সারাদেশে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, বেশিরভাগ মামলার বাদী নিজদলের লোকজন। একই সময়ে হামলা বা রক্তারক্তির ঘটনাগুলোও ঘটেছে নিজদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। এসব বিরোধ মিমাংসা করতে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের কোনো উদ্যোগী ভূমিকা নেই। অথচ, একসময় দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলে নিজেদের দেওয়া মামলায় নিজেরাই বেশি হয়রানির শিকার হবে।

আওয়ামীলীগের টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাকালীন চলমান এ সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ তার কাঙ্খিত উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই বড় বড় দুর্নীতির অনেক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। এসব অপকর্মগুলো ক্ষমতার উচ্চাসনে যারা বসে আছেন, তাদের অনেকের আশ্রয়ে প্রশ্রয়েই হচ্ছে। শুধু একজন শেখ হাসিনা সৎ হলেই দেশ দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে না। মাঠে ঘাঠে যে যেখানে দায়িত্ব পেয়ে এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তারাই অবৈধভাবে টাকা কামাচ্ছেন চোখ বন্ধ করে। অথচ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ এমনটা ছিল না। তিনি আমৃত্যু শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন।

সারাবিশ্বে চলমান মহামারী করোনাকালে দেশে বিদেশে অনেক নামী-দামী ধর্ণাঢ্য ব্যক্তিরা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন অনেক নামকরা ব্যক্তি। যাদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লেখক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ রয়েছে। বাংলাদেশেও অনেক নামকরা এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ মারা গেছেন। যারা জীবদ্দশায় বিলাসী জীবনযাপন করেছেন, অনেকে টাকার ওপর ঘুমিয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তারাও বেঁচে থাকতে পারেননি। কারণ, মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কারো সুযোগ নেই।

করোনামহামারী আমাদের মাঝ থেকে অনেক মেধাবী প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। যারা বেঁচে থাকলে দেশকে আরো অনেককিছু দিতে পারতেন। আপসোস, আমরা তাদেরকে হারিয়েছি এটাই নিয়তির বাস্তবতা। এখানে মানবসৃষ্ট কোনো কারণ নেই।

আমার দেখা একজন ক্ষুদ্র রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম বাবুল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দীক্ষিত একজন ব্যক্তি ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে পিতার সম্পত্তি বিক্রি করেই রাজনীতি করেছেন। রাজনীতি করে যা পেয়েছেন, তার চেয়ে হারিয়েছেন অনেক বেশি। কাটছিট কথা বলার একজন মানুষ ছিলেন। সদালাপীও ছিলেন বটে। কিন্তু তবুও একটি মহল তাঁকে ভালো চোখে দেখতেন না। তবে কারো এই ভালো চোখে না দেখার বিষয়টিও কখনও তিনি কাউকে বুঝতে দিতেন না। নিজেরমত করে চলতে পছন্দ করতেন। কখনও কখনও বদমেজাজীও ছিলেন। ছাত্ররাজনীতিকালেও আমরা অনেকেই তাঁর হাতের চড়থাপ্পড় খেয়েছি। পরক্ষণেই আবার আমাদেরকে বুকে আগলে নিতেন। এমন একটা মানুষ হঠাৎ না বলেই চলে গেলেন পরকালে। কোনো কিছুই বলে গেলেন না। অনেক স্বপ্ন ছিল চন্দ্রগঞ্জকে নিয়ে। অনেক বাঁধা পেরিয়ে চন্দ্রগঞ্জকে উপজেলায় উন্নীত করতে ভেতরে ভেতরে অনেক কাজ করেছেন। তিনি ছাড়াও চন্দ্রগঞ্জের উন্নয়নে আরো অনেকেই কাজ করছেন, আমি কাউকেই খাঁটো করতে চাই না।

বন্ধুভৎসল সেই নুরুল ইসলাম বাবুল চলে যাবেন, এত তাড়া ছিল কীসের জানিনা। তবে কখনও স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় কোন্দলকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন না। বিশেষ কারো সাথে দলীয় কোন্দলে নিজেকে জড়িতও করতেন না। তাঁর মৃত্যুতে চন্দ্রগঞ্জবাসী একজন অভিভাবককে হারালো।

কতটা জনপ্রিয় ছিলেন নুরুল ইসলাম বাবুল বা একজন ইউপি চেয়ারম্যান সে তর্কে আমি যেতে চাই না। তবে মৃত্যুর খবরের পর মৃত্যুর সংবাদসহ তিনদিন যাবত ফেসবুকে তাঁর ছবি ভাইরাল ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে কত মানুষ, কত বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্খি, আত্মীয়-স্বজন, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষেরাও তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। দুঃখ প্রকাশ করেছেন সবাই। সেই মানুষের জানাজা ও দাফন হলো অতি নিরবে ও নিস্তব্ধে। শুনেছি, করোনা পজেটিভকে পুঁজি করে সেখানেও একটা অপরাজনীতি হয়েছে।

নুরুল ইসলাম বাবুলের মৃত্যুর পর অনেকের চেহারা দেখেছি। কে কী ধরনের চেহারা প্রদর্শন করেছেন আমার অন্তত বুঝতে বাকী ছিল না। অথচ, নুরুল ইসলাম বাবুল তাদেরই একজন দলীয় সহযোদ্ধা ছিলেন। কারো কারো শুভাকাঙ্খিও ছিলেন। আওয়ামীলীগের জেলা কমিটির একজন সম্পাদকীয় পোষ্টের নেতা ছিলেন নুরুল ইসলাম বাবুল এবং তিনি নৌকার প্রার্থী হিসেবে ইউপি চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবে দলীয় নেতা-কর্মীদের শোক জানানোর কথা। কালো ব্যাজ ধারণ করার কথা। সেখানে ভবিষ্যত পদ-পদবী পাওয়া বা জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য তাঁর মৃত্যুটা যেন অনেকের প্রত্যাশা ছিল। কেউ কেউ তো অপকটে উল্লাস প্রকাশ করতেও দেখেছি। তাঁর কবর জেয়ারতে লাল গোলাপ শুভেচ্ছার স্লোগানও শুনেছি। এগুলো কোনো রাজনৈতিক শিষ্টাচার নয়।

অথচ, বাংলাদেশে সবচেয়ে প্রাচীন দল আওয়ামীলীগ এবং আওয়ামীলীগই সবাইকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়।

লেখক : মো. আলী হোসেন >> সাংবাদিক

ও সভাপতি- সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন
চন্দ্রগঞ্জ থানা কমিটি-লক্ষ্মীপুর।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

জানুয়ারি ২০২১
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ডিসেম্বর    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১  
}