বুধবার ৭ই ডিসেম্বর, ২০২২ ইং ২৩শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দেশে দেশে ইফতার সংস্কৃতি

লাইফস্টাইল ডেস্ক :

পবিত্র মাহে রমজানে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে অনেক পরিবর্তন আসে। রোজাদারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ইফতারের সময়। ইফতারে আমাদের দেশের আয়োজনে থাকে নানা রকমের খাবার। অন্যান্য দেশেও তাই। সারাদিন রোজা থাকার পর রোজাদারেরা চেষ্টা করেন সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার খেতে। সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আনন্দচিত্তে রোজা পালন করছেন।

তবে স্থানের পার্থক্যের কারণে কেউ ১১ ঘণ্টা থেকে ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখছে। প্রায় সকল দেশেই ইফতার নিয়ে থাকে নানা ধরনের আয়োজন ও উৎসব। প্রতি বছর প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশ অত্যন্ত চমৎকার ইফতারের আয়োজন করে থাকে। অবশ্য গত দুই বছর করোনা মহামারীতে তেমন একটা ইফতারের আয়োজন হয়নি।

প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় ১৪০ কোটি মুসলমান ইফতারিতে রোজা ও ইফতারে অংশ নেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইফতারের আয়োজনে মানুষ কী খায়-

বাংলাদেশ : বাংলাদেশে ইফতারে নিয়মিত আইটেম থাকে খেজুর, পিঁয়াজু, বেগুনি, হালিম, আলুর চপ, জিলাপি, মুড়ি ও ছোলা, শরবত। এর বাইরে সংযুক্ত হতে পারে হালিম, লাচ্ছি, বিরিয়ানি, কাচ্ছি, ফিশ কাবাব, মাংসের কিমা। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের ফল ফলাদি।

সৌদি আরব : খেজুরের নানা রকম সুস্বাদু আইটেম থাকে সৌদি ইফতারে। সৌদি আরবের মসজিদে হারাম ও মসজিদে নববীতে প্রতিদিন লাখো মানুষ একসাথে ইফতার করে থাকে।   ইফতারিতে থাকে কোনাফা, ত্রোম্বা, বাছবুচান্ডর নামক নানা রকম হালুয়া। এছাড়া ইফতারে থাকে সাম্বুচা, এতে মাংসের কিমা থাকে। সালাতা (সালাদ), সরবা (স্যুপ), জাবাদি (দই), লাবান, খবুজ (ভারী ছোট রুটি) বা তমিজ (বড় রুটি) ইফতারের অনন্য উপাদান।

ইন্দোনেশিয়া : ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় রমজানে চালু হয়েছে ব্যতিক্রমী এক রেস্টুরেন্ট। ১০০ ফুট উচ্চতায় সেটি ঝুলে থাকে শূন্যে। লাউঞ্জ ইন দ্য স্কাই নামে রেস্টুরেন্টটিতে ইফতার করতে আসছেন অনেকে। সেখানে ইফতারকে বুকা পুয়াসা বলা হয়। বেদুক বাজানোর মাধ্যমে ইফতারের সময় নিশ্চিত করার রেওয়াজ রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। আসরের নামাজের পর বাজারগুলোতে বিভিন্ন ইফতার বিক্রি হয়।

ইরান : এ দেশের মানুষ নানাভাবে বিভিন্ন উপাদানে ইফতার করে থাকে। এখানে অঞ্চলভেদে ইফতার সামগ্রীতেও পার্থক্য দেখা যায়। তবে সাধারণভাবে সব দেশের ইফতারে ফল, জুস, খেজুর, পানি, দুধ বেশ প্রচলিত। ফলের মধ্যে থাকে খেজুর, আপেল, চেরি, তরমুজ আখরোট, তলেবি বা এক ধরনের বাঙ্গি, কলা, আঙ্গুর ইত্যাদি। এছাড়া, মধু, রুটি, পনির, দুধ, পানি, চা উ ল্লেখযোগ্য।

আফগানিস্তান : গরু বা খাসির মাংসের কাবাব আফগানিস্তানের ইফতরে বিশেষ খাবার হিসেবে বিবেচিত। শুকনো ফল এবং জুস এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ইফতার আইটেম।

ব্রুনাই : এখানকার স্থানীয় ভাষায় ইফতারকে সোংকাই বলা হয়। ঐতিহ্যগতভাবেই আঞ্চলিক বা গ্রামীণ মসজিদগুলোতে এর আয়োজন করা হয়। সাধারণত সরকার ও স্থানীয় বাসিন্দারা এই সোংকাইয়ের আয়োজন করে থাকে। এখানে ইফতারের আগে বেদুক নামে এক ধরনের ড্রাম বাজানো হয়, যার মানে হচ্ছে, ইফতারের সময় হয়ে গেছে। এ ছাড়া রাজধানী বন্দর সেরি বেগাওয়ানে সোংকাইয়ের সংকেত হিসেবে কামান থেকে গুলি ছোড়া হয়।

তুরস্ক : ‘রমজান কিবাবি’ নামক খাদ্যটির ইফতার হিসেবে আলাদা কদর রয়েছে তুরস্কে। এটা বিশেষ ধরনের কাবাব। এছাড়া রোজা ভাঙতে এখানে নানা রকম শরবতের ব্যবহার বেশ পুরনো। এছাড়া তাজা পাইড রুটি, তাজা খেজুর, কালো এবং সবুজ জলপাই, তার্কিশ সাদা পনির, তাজা কাসার পনির, পুরনো কাসার পনির, মশলাদার গরুর মাংসের পাতলা স্লাইস, মসলাদার সসেজ, মিষ্টি মাখন, ফল, মধু, প্রচুর পরিমাণে টমেটো ও শশা।

মিসর : দেশটির পথে পথে ছোট ছোট সোনামণিদের লেটুসপাতা বিক্রি করতে দেখা যায়। সেখানকার ইফতারে এ পাতার দারুণ সমাদর। ইফতারিতে তাদের প্রধান মেন্যু কোনাফা ও কাতায়েফ। এগুলো মূলত কেকজাতীয় খাদ্য।
ফিলিস্তিন : বাংলাদেশের ইফতারির সঙ্গে ফিলিস্তিনের ইফতারের বেশ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তবে তারা জেরুজালেমের চিরায়ত ঐতিহ্য অনুযায়ী তাদের জনপ্রিয় পানীয় তামারিন জুস পান করে।

সিরিয়া : হালুয়ার জন্য বিখ্যাত শহর সিরিয়া। আরব দেশগুলোর মধ্যে ভালো হালুয়া তৈরি করে সিরিয়ার লোকেরা। তারা এ খাবারকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তাদের হালুয়া যে কত নকশার হতে পারে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এ ছাড়া তারা ইফতারের পর দিজাজ সয়াইয়া, খবুজ, সরবা খায়।

দুবাই : গোসতের সঙ্গে রুটি মসুর ডাল ও বিভিন্ন প্রকার সালাত। দুবাইবাসী ইফতারে গোসতকে প্রাধান্য দেয়। শুধুমাত্র ইফতারকে কেন্দ্র করে খাসি ভেড়া, দুম্বা বা উট জবাই করে দেয়া তাদের সাধারণ রীতি। তাদের ইফতার বহুক্ষণ চলে। তাদের ইফতার মানেই সন্ধ্যা রাতের খাবার। ইফতারের মজলিস বহুক্ষণ চলতে থাকে। তবে এবার হয়তো ইফতারের এমন আয়োজন হচ্ছে না।

মরক্কো : আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে ইফতারের প্রথম তালিকায় আছে খেজুর, স্যুপ, রুটি। এছাড়াও বিভিন্ন হাতের তৈরি খাবার থাকে তাদের ইফতারে।
পাকিস্তান : খেজুর ও পানি দিয়ে তাদের ইফতার শুরু হয়। তবে তাদের আয়োজনে থাকে হরেক রকমের চোখ ধাঁধানো খাবার। চিকেন রোল, স্প্রিং রোল, শামি কাবাব এবং ফলের সালাদের পাশাপাশি মিষ্টি ও ঝালজাতীয় খাদ্য, জিলাপি, সমুচা, নিমকি ইত্যাদি।

জর্দান : জর্দানে মুসলমানদের ইফতারে থাকে বিভিন্ন প্রকারের রুটি সঙ্গে পনির ও মিষ্টি হালুয়া। খেজুরও তাদের প্রধান ইফতার। আরো বিভিন্ন ভাজা পোড়াতেও তারা অভ্যস্ত।

সোমালিয়া : হাজার হাজর বছর ধরে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত দেশটি। সোমালিয়ার ইফতারে থাকে স্থানীয় একধরণের খাবার যা মাছ দিয়ে তৈরি হয়। খেজুর কাবাব পনিরও থাকে।

মালয়েশিয়া : ইফতারে আখের রস ও সয়াবিন মিল্ক খান, যাকে তাদের ভাষায় বারবুকা পুয়াসা বলা হয়। এছাড়া লেমাক লাঞ্জা, আয়াম পেরিক, নাসি আয়াম, পপিয়া বানাস ও অন্যান্য খাবার খেয়ে থাকে মালয়রা।

মালদ্বীপ : এখানে ইফতার ‘রোয়াদা ভিলান’ নামে পরিচিত। তাদের ইফতারের মূল উপাদান শুকনো বা ফ্রেশ খেজুর। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ বা হোটেলে ইফতার ও ডিনারের বিশেষ আয়োজন থাকে। অন্যদিকে সেখানকার মসজিদগুলোতে ফ্রি খেজুর জুসের ব্যবস্থা করা হয়।

মস্কো : রাশিয়তে ইফতার আয়োজনে খেজুর ও অন্য ফল রাখা হয়। এরপর স্যুপ, রুটি ও বিভিন্ন স্থানীয় খাবারের আয়োজন তো রয়েছেই। রাশিয়ান ঐতিহ্যবাহী কাভাসকেও তৃষ্ণা মেটাতে সেরা পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

পর্তুগাল : পুর্তুগালে ইফতারের তালিকা প্রধান হলো এক প্রকার কেক যার নাম পাস্টার দি নাতা ও সারডিন মাছের কোপ্তা বেশ পছন্দ করেন তারা। এ ছাড়া রয়েছে প্রেগোরোজ, ট্রিনচেডো, প্রাউজ (চিংড়ি), স্প্রিং গ্রিল ও স্যুপ।

ব্রিটেন : রানি এলিজাবেদের দেশ ব্রিটেন। ব্রিটেনের ইফতারিতে আহামরির কিছু নেই। যা কিছু আছে দেখুন- খেজুর, ফল, স্যুপ, জুস, রুটি, ডিম, মাংস, চা-কফি দিয়ে ইফতার।

ইতালি : ইতালীয় মুসলিমরা ইফতার করে ইউরোপীয়দের নিয়মে। সাধারণত তাদের খাদ্য তালিকায় বার্গারজাতীয় খাদ্য, মাল্টা, আপেল, আঙুর, বিভিন্ন ফলের রস ইত্যাদি। তবে গোসতের বিভিন্ন প্রকার ভাজাপোড়াও থাকে।

কানাডা : কানাডায় মোট জনসংখ্যার ৩.২% মুসলমান। কানাডীয় মুসলমানরা সাধারণত আরবীয়দের মতো ইফতারে খেজুরকে প্রাধান্য দেয়। খেজুর খুরমা পনির সালাদ বিভিন্ন স্যুপও ইফতারির প্লাটে থাকে।

স্পেন : স্প্যানিশ মুসলমানরা ইফতার করেন হালাল শরমা, ডোনার কাবাব, হামাস (যা তেরি করা হয় ছোলা, তিল, জলপাই তেল, লেবু, রসুন ইত্যাদি দিয়ে। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের খাবার, লাম্ব কোফতা, আলা তুরকা, পাইন অ্যাপেল, টমেটো সালাদ।

জাপান : জাপানের মুসলমানদের ইফতারি আইটেমে রয়েছে জুস, স্যুপ ও মাশি মালফুফ, যা আঙুর, বাঁধাকপির পাতা ও চাল মিশিয়ে বানানো এক প্রকার খাদ্যৗ। এছাড়াও গোসতের অনেক আইটেম থাকে।

ভারত : ভারতের একেক রাজ্যে ইফতারির একেক রকম পদ হয়।হায়দরাবাদের লোকজনের ইফতার হয় হালিম দিয়ে। তামিলনাড়ু ও কেরালায় ইফতার হয় ননবো কাঞ্জি দিয়ে। এটি তৈরি হয় ভাত, খাসির মাংস, সবজি ও মসলা দিয়ে। পাশাপাশি থাকে বন্ডা, পাকুড়া- এসব খাবার।

আমেরিকা : আমেরিকার ইফতারসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খেজুর, খুরমা, সালাদ, পনির, রুটি, ডিম, মাংস, ইয়াগার্ট, হট বিনস, স্যুপ, চা ইত্যাদি।
দক্ষিণ কোরিয়া: ইফতারিতে এখানকার মুসলমানরা নুডলস, স্যুপ, ফলের রস, বিভিন্ন প্রকারের ফলফলাদি খেয়ে থাকে। সাহরিতে মাংস ও রুটি।

লেবানন : সুবিধাবঞ্চিত দেশগুলোর অন্যতম। লেবাননীয় ইফতারে থাকে গোসতের কাবাব। আলুর তৈরি ভিন্ন জাতের খাবার। তবে তাদের ইফতারকে সাজাতে দুধ ও মধুর তৈরি বিভিন্ন খাবারও থাকে বেশ।

আলজেরিয়া : আলজেরিয়ানরা তাদের ইফতারের প্রধান উপাদান হলো খেজুর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার শরবত ও পনির। তবে গোসতের আইটেম থাকে প্রচুর।

মালদ্বীপ : এখানে ইফতার ‘রোয়াদা ভিলান’ নামে পরিচিত। তাদের ইফতারের মূল উপাদান শুকনো বা ফ্রেশ খেজুর। বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ বা হোটেলে ইফতার ও ডিনারের বিশেষ আয়োজন থাকে। অন্যদিকে সেখানকার মসজিদগুলোতে ফ্রি খেজুর জুসের ব্যবস্থা করা হয়।

অস্ট্রেলিয়া : স্যান্ডউইচ, পনির, মাখন, দুগ্ধজাতীয় খাবার, নানাবিধ ফল ও ফলের রস খাওয়া হয়।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ডিসেম্বর ২০২২
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« নভেম্বর    
 
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
৩১