-
- রাজনীতি, শীর্ষ খবর
- বিএনপির নয়া ফাঁদ, কৌশলে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে
- আপডেট : June, 30, 2018, 5:04 am
- 413 জন পড়েছেন
দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতার স্বাদে আওয়ামী লীগ সমঝোতা ও ছাড় দেয়ার মানুষিকতা থেকে সরে এসেছে। আর এটিকে পুঁজি করে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পেতে নতুন ছকেই এগোচ্ছে বিএনপি। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর এ বিষয়টি জোরালোভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে কৌশলে জামায়াতের সাথে দূরত্ব বাড়াচ্ছে দলটি। আসন সমঝোতায় বামপন্থি নেতাদের নিয়ে রাজনৈতিক ঐক্যগঠনের পূরণো ছকও হাতে রেখেছেন।
তৃণমূলের দাবি বিএনপি মাঠে থাকার শক্তি হারিয়ে ফেলছে আর দলের দাবি বিএনপি নির্বাচনে জয়ের পথে অন্যতম বাধা সরকার। এ সরকারের অধিনে নির্বাচনে অংশ নিলে নিশ্চিত পরাজয় জেনেই ফের নতুন তিন সিটিতে বিএনপি অংশ নেবে। ক্ষমতাসীনদের অধিনে নির্বাচন চিত্র কেমন হয় এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তাদের অংশগ্রহণ। সম্প্রতি দেশের নির্বাচন চিত্র নিয়ে সচেতনমহল থেকে কূটনৈতিক ব্যক্তিরাও এ নিয়ে আঙুল তুলছেন। একাদশ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপির এ নয়া কৌশল সরকারকে ফাঁদে ফেলতে পারেন বলেও মনে করছেন রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
রাজনৈতিক সূত্রমতে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট নির্বাচনে অংশগ্রহণ সরকারের জন্য ফাঁদ হিসেবি ব্যবহার করবেন। ক্ষমতাসীনদের আমলের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সেল গঠন করে প্রচারণায় নেমেছেন দলটি। সম্প্রতি খুলনা ও গাজীপুরে নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর ভরাডুবি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিএনপি ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হলেও দলের হাইকমান্ডের দাবি দুই সিটিতে হেরে যাওয়াও বিএনপির কৌশল। বিএনপি হেরে যাবে এটা তারা আগ থেকেই জানতেন। তাই নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের হস্তক্ষেপ দেশি ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচারণায় এনে নিজেদের গণতান্ত্রিক তকমা লাগানোর পথই বেছে নিয়েছিলেন।
বিএনপির দাবি আওয়ামী লীগের অধিনে কোনো নির্বাচনই জনগণের অংশগ্রহণ নেই। মাঠে সেনাবাহিনী না থাকায় ভোটাররা আতঙ্কে কেন্দ্রে যায়নি। বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এ নির্বাচন মূলত পুলিশ প্রশাসন আর নির্বাচন কমিশনের যৌথ হস্তক্ষেপে হয়েছে, সেখানে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যত ভূমিকা ছিলো না। এটি শুধু খুলনা-গাজীপুরের নির্বাচনের চিত্র নয় আগামী তিন সিটিতেও একই স্টাইলে নির্বাচন হবে। এটি ধরে নিয়েই বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। যদিও প্রথমে এমন একটি ইঙ্গিত ছিলো গাজীপুর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হস্তক্ষেপ থাকলে সামনের তিন সিটিতে অংশগ্রহণ করবে না।
কিন্তু হেরে যাওয়াকে একাদশ নির্বাচনের জন্য কৌশল হিসেবে নিয়েই রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেট সিটিতেও অংশগ্রহণ করবেন। এ তিন সিটিকে টার্গেট করে দেশের প্রত্যকটি নির্বাচনে যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা থাকে, জয়ের জন্য আওয়ামী লীগের যে বক্র মনোভাব, নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ত ভূমিকা এগুলো কৌশলে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপি যদি এ কৌশলে এগোয় তাহলে একাদশ নির্বাচনের আগে অবশ্যই বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ আসবে। তাদের ধারণা হয়তো বিএনপির এই ফাঁদে আওয়ামী লীগকে পড়ে যেতে হবে। তখন তৃতীয় শক্তির মতো কোনো পরিবেশও তৈরি হয়ে যেতে পারে। কারণ বর্তমানে ক্ষমতাসীনরা সমঝোতা ও ছাড় দিয়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে অনেক আগেই বেরিয়ে গেছেন।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরই বিএনপি শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর সাথে কৌশলে দূরত্ব তৈরি করবে। ভারতসহ আন্তর্জাতিক দেশগুলো যাতে সরকারকে চাপ দিতে বাধ্য করেন। অন্যদিকে বামপন্থি নেতাদের আসন সমঝোতায় রাজনৈতিক ঐক্য গঠনে পরিকল্পিত কৌশলে হাঁটছেন বিএনপি। এবার সিলেটে ২০-দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে সেখানকার জামায়াতের মহানগর আমীর এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও মিডিয়াকে জামায়াতের সাথে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, টানাপড়েন চিত্র উপস্থাপনে বিএনপি কূটনৈতিক প্রচারণা চালাবেন।
তবে একটি সূত্রের মত, হয়তো একাদশ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দিতে পারেন। আর যদি নাও ছাড়েন তাহলে জামায়াতও তাদের স্বার্থ হাসিলে নিজস্ব গতিতে চলবেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের নির্বাচনের হালচিত্র নিয়ে কথা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। তিনি বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে ভোটারদের নিরাপদে ভোট দেওয়া।গাজীপুর সিটি নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে এবং পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে।
এছাড়া, আইনৃঙ্খলা বাহিনী যে অনিয়ম করেছে তা আমাদের চোখে পড়েছে। তবে, নির্বাচনগুলোতে সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। যা ইতিবাচক। আগামী জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে, তার ইঙ্গিত দেয় সদ্য সমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, এমন মন্তব্য করে মার্শা বার্নিকাট বলেন, বাংলাদেশ সরকার সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠান করতে বদ্ধপরিকর। প্রত্যাশা করছি, সরকার সেই অঙ্গীকার রাখবে।
বার্নিকাটের এমন মন্তব্যের পর রাজনীতিপাড়ায় স্বস্তি-অস্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে মেঘের আবাস ঘনিভূত হচ্ছে বলেও মত বিশিষ্টজনদের। এমন পরিস্থিতি তৈরিতে যেমন বিরোধী দলের হস্তক্ষেপ রয়েছে তেমনি কোনো অশুভ শক্তির দৃষ্টি থাকলে দেশের সারভৌমত্বে বড় আঘাত আসবে। চলমান নির্বাচন নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্য, নির্বাচন নিয়ে যদি বিএনপির কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে তারা বিদেশিদের নালিশ দিতে পারেন অন্যদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারক দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাষ্য, ‘বিএনপি’র আন্দোলনের অংশ হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় অংশ নিচ্ছে।
আগামীতে অনুষ্ঠিতব্য বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি নির্বাচনেও অংশ নেবে বিএনপি। সরকারের নির্লজ্জ গণবিরোধী চরিত্র উন্মোচনের জন্যই তারা অংশ নিচ্ছে সম্প্রতি এসব বিষয় নিয়ে আমার সংবাদের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের দুই বিশ্লেষক। তবে তারা ব্যক্তির মন্তব্য এড়িয়ে গিয়ে সার্বিক পরিস্থিতির কথা বলেছেন। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা আমার সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতারা এখন মুখে যাহা বলে তা কাজে রূপান্তর করেন না। আর যাহা করে ফেলেন তাহার ফলের জন্য জনগণ প্রস্তুত থাকে না। রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র এখন সিন্দাবাদের মতো হয়ে গেছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়া তারা মনে হয় চলার পথই খুঁজে পান না। এটি রাজনৈতিক দলের কাছে কাম্য নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন খুব নিকটেই। এ নিয়ে দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ব্যক্তিরা সম্প্রতি ভারত সফর করেছেন। দুই রাজনৈতিক দলই ভারতের সাহায্য পেতে মরিয়া। রাজনৈতিক দেউলিয়া হয়ে গেছে দুই দলই। দেশে নির্বাচনের জন্য ভারতের সাপোর্ট এটি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। আমি এটিকে জাতীয় অবজ্ঞা বলে বিবেচিত করবো। জাতীয় ইস্যু দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় দেশের মানুষকেই আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব নয় তবুও তারা দলীয় সিদ্ধান্তে ভোট ডাকাতির জাতীয় চরিত্রে নিজের প্রকাশ করছেন। ভোটের মাধ্যমে দেশের মানুষের অধিকার প্রয়োগ এ সরকারের অধিনে সম্ভব নয়। এটি আমরা আগেও বলেছি, এখনো বলছি। ২০১৪ সালে ভারতকে কোলে বসিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। জনগণের ভোটে হাসিনার কখনোই ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়।
আজ শুনলাম ওবায়দুল কাদের যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে মন্তব্য করার সময় তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। মার্শা বার্নিকাটতো সত্যে কথা বলেছেন, এজন্য ওবায়দুল কাদেরের তা সহ্য হচ্ছে না। কি আর বলবো আওয়ামী লীগেরতো রাজনৈতিক শিষ্টাচারই নেই। তবুও বলছি, ওবায়দুল কাদেরের এমন মন্তব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বহির্ভূত।
এদিকে বিএনপির সমালোচনা করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনে একটি গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে (সংস্থাটির নাম তিনি বললেও পলিসির কারণে তা থেকে বিরত থাকা হলো) তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সে সংস্থাটি কী চাচ্ছে বিএনপি যতদিন তা বুঝতে দেরি করবে তাদের জন্য আরও অমঙ্গল নিয়ে আসবে। এখন নির্বাচনে কারচুপির জন্য গন্ডগোলের প্রয়োজন হয় না সূক্ষতাই বড় হাতিয়ার।
এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, গাজীপুরে এবং খুলনায় নির্বাচনের পর এখন এটা জনগণের কাছে স্পষ্ট দেশে যতই নির্বাচন হবে ২০১৪-র মতো নির্বাচন হবে। এ সরকারের অধিনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। কিন্তু এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৪ সালের মতো হতে দেবে না। এ নিয়ে সরকার আমাদের সঙ্গে আলোচনা করুক বা না করুক, বিএনপি এখন সবচেয়ে বড় জনপ্রিয় দল। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন। এটা এখন আমাদের দাবি নয় জনগণের দাবিও।
এছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান দুদু বলেন, দেখুন প্রতিটা নির্বাচনে এই সরকার নতুন নতুন জালিয়াতির কৌশল তৈরি করছে। জালিয়াতির এ কৌশল শুধু দেশের জনগণের কাছে নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর আওয়াজ ও প্রতিবাদ আসছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটও বলেছেন, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে এবং পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে অনিয়ম করেছে তা তাদের চোখে ধরা পড়েছে।
বার্নিকাট সত্য কথা বলেছেন, জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা বলেছেন। মানুষের কথাটা বলেছেন, সত্যটা উন্মোচন করেছেন। এমন সত্য কথা বলায় গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের একটি প্রোগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে সতর্কভাবে কথা বলার জন্য বলেন। আমার দৃষ্টিতে ওবায়দুল কাদেরের উদ্ভট এমন মন্তব্যে দেশের মানুষ বিস্মিত। তবে আমরা এও বলছি, এ সরকারের অধিনে আমরা নির্বাচনে অংশ নিলে আমাদের খারাপ অবস্থা হবে এটি জেনেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা স্পষ্ট করতে চাই, এ সরকারের সত্যিকারের নির্বাচন চরিত্র কী?
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।
এই বিভাগের আরও সংবাদ