আকাশবার্তা ডেস্ক :
আন্দোলন এবং নির্বাচন দুই কৌশলে এগোচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা। এতেও মন ভরছে না তারেক জিয়ার। দলের স্থায়ীকমিটি ও অন্য শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না তিনি। তাই নির্বাচনের আগে সহিংসতায় গঠন করছেন তার নিজস্ব বাহিনী। এ বাহিনীর মূল কাজই হবে গুপ্ত হামলা! তিন ক্যাটাগরিতেই তা গঠন হচ্ছে। একটি গ্রুপের সাথে আরেকটি গ্রুপের কোনো যোগসূত্র থাকবে না। যার নিয়ন্ত্রক শুধুই তিনি! এর মধ্যে রয়েছে বস্তির লোকজন এবং ভাড়াটে সন্ত্রাসী যারা টাকার বিনিময়ে গুপ্ত সন্ত্রাস চালাবে।
ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে দলের অন্য একটি গ্রুপ শক্তি প্রদর্শনে সশস্ত্র মহড়া দেবে আর সব চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ টিমকে। দলে সাইবার ইউজার নামক একটি ভাতৃত্ব সংগঠন থাকলেও এর পাশাপাশি বেসরকারি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ করাতে চাচ্ছেন তারেক। সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় প্রভাব থেকেই এ পন্থাকে এখন সেল হিসেবে রূপ দিতে চাচ্ছেন। তারেকের ভাষ্য নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দলের লোকজন দিয়ে যদি সহিংস কাজ করা হয় তাহলে তার দায়ভার সম্পূর্ণরূপে বিএনপিকেই নিতে হবে। তখন আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এদিকে তৃণমূলের সাথে আলোচনার পর অক্টোবরে ঢাকা অচলের পরিকল্পনা এঁকেছেন দলের অন্য নীতিনির্ধারকরা। ২০ থেকে ২৫ দিনের আন্দোলনে ক্ষমতাসীন সরকার এবং আন্তর্জাতিক মহলে কার্যত ভূমিকা প্রমাণে এখন থেকেই তৈরি হচ্ছে বিএনপি। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কাছে এখন তারেক বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে! তারেক যদি নিজস্বভাবে কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিএনপি এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তারেকের বাহিনীর মাধ্যমে নির্বাচনের আগে যদি এমন কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয় মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে বড় হুমকিতে পড়ে তাহলে নির্বাচনের পরিবেশই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে সময়ের আলোকে নির্বাচন নাও হতে পারে। তখন এসবকিছু নিয়ন্ত্রণে দেশের নেতৃত্ব অন্যজনের হাতে চলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা বিএনপির অন্য নীতিনির্ধারকদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে এখন ইস্যুর খোঁজে ওঁতপেতে আছে তারেকের উগ্রবাহিনী। রাজধানী এবং বিভিন্ন জেলায় বড় ধরনের নাশকতা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তৎপর তারা। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিষয়টি স্পষ্ট হয় দলের নেতাদের কাছে। বিএনপির একাংশের নেতারা মনে করছেন, তারেকের অর্থায়নে সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ছাড়াও সাইবারে বড় একটি টিম কাজ করছে যার মূল কাজই হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের কর্ম উপস্থাপন করা। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা।
এ টিমের লোকজন শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও সমানতালে চালাচ্ছে কর্ম। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দৃশ্যসন্ত্রাস, গুপ্তসন্ত্রাস এবং তথ্যসন্ত্রাস চালিয়ে সফল হতে এখন থেকেই নাটেরগুরু তারেক তাদের মনিটরিং করছেন। এক্ষেত্রে তারেকের যুক্তি হলো দলীয় লোকজনকে দিয়ে কাজ করালে তার দায়িত্ব বিএনপির ওপর বর্তাবে, ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিএনপির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সাম্প্রতিক সময়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে তারেকের এই বাহিনী আংশিকভাবে কাজ করে সফল হয়েছে বলেও দাবি লন্ডনের একটি সূত্রের।
এই টিম বাস্তবায়নে দেশের বাইরে থাকা ব্যবসায়িক বড় একটি সিন্ডিকেট তারেকের হাতে কোটি কোটি টাকা তুলে দিচ্ছেন। দেশের মধ্যে কিছু ব্যবসায়ীও এর সাথে সম্পৃক্ত। এদের চিহ্নিত করাও সম্ভব নয়। কারণ এদের অধিকাংশই সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে টিকে আছে। ফলে এদের কাউকে সন্দেহই করা হচ্ছে না। এ তিন ক্যাটাগরির লোকজন ছাড়াও ইতোমধ্যে সুশীলসমাজের বড় একটি অংশের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সফল হয়েছেন তারেক। এর মধ্যে কয়েকজন সুশীলের নাম জানা গেলেও পলিসির কারণে তা প্রকাশ থেকে বিরত থাকা হলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা বলেন, ভাড়াটে ব্যক্তিরা যদি যান চলাচলে গাড়ির ওপর পেট্রোলবোমা মারে, অগ্নিসংযোগ করে কিংবা আরও অশুভ কর্মপন্থা অবলম্বন করে তাহলে পথেঘাটে আপনি আমি আমাদের ছেলে-সন্তান কেউ নিরাপদে থাকবে না।
এদিকে অক্টোবরকে টার্গেট করে কঠিন আন্দোলনের পথে এগোচ্ছে বিএনপি। সাম্প্রতিক সময়ের কোটা আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে বিএনপি অনেক কিছুই শিখেছে। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে আন্দোলন নিয়ে বিএনপির সমালোচনার পর নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণে এ দুই আন্দোলনের চেয়েও বড় আন্দোলনের নতুক ছক তৈরি করছেন তারা। আন্দোলনে ঢাকাকেই টার্গেট করা হচ্ছে। ঢাকা ঘিরেই আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। বিএনপির এক নীতিনির্ধারকের ভাষ্য ‘২০০৬ সালের অক্টোবরে আওয়ামী লীগ দেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, এবার বিএনপিও সেই পথে হাঁটবে। লন্ডনের প্রেসক্রিপসনে দলের শীর্ষ নেতারা মাঠে নামতে বাধ্য হবেন। তাই এখন থেকেই বিএনপির একটি মনিটরিং টিম আওয়ামী লীগের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করছেন। মনিটরিং টিমের তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ এখনো প্রশাসন এবং পুলিশনির্ভর।
তা ছাড়া সাংগঠনিকভাবে তাদের দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। এবং সর্বোপরি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কোটা এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে সরকারের পদক্ষেপের পর শিক্ষার্থীরাও ক্ষমতাসীন সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বলে মত তাদের। এছাড়া মনিটরিং টিমের ভাষ্য, এই সরকার গণতন্ত্রের আড়ালে সম্পূর্ণরূপে স্বৈরতন্ত্রে দেশ পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করতে জেলা থেকে তৃণমূল নেতাদেরও ঢাকায় আনা হয়।
গত ৩ ও ৪ আগস্ট ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে স্থায়ী কমিটি। দুদিনের চার অধিবেশনে অনুষ্ঠিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রায় ৪শ নেতা উপস্থিত ছিলেন। সক্রিয় আন্দোলনে কেন্দ্রীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে ১৬০ জন জেলা নেতা কথা বলেন। তারা মির্জা আব্বাসসহ ঢাকার শীর্ষ নেতাদের ঢাকার আন্দোলনে ভূমিকা চান, আন্দোলন শুরু হলে তৃণমূলকে মাঠে ফেলে যাতে তারা দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে না পারেন সেজন্য এখন থেকেই নজরদারির আহ্বানসহ নির্বাচনের আগেই খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কার্যত আন্দোলন চেয়েছেন তারা।
সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলে রূপরেখা চান। এ জন্য যদি জামায়াতে ইসলামীকে ছাড়তেও হয় তাই করার পরামর্শ দেন তৃণমূল। তবে হুঁশিয়ারি দিয়ে এও বলেন, যাতে খালেদার মুক্তি ছাড়া কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেন। এছাড়াও সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের বৈঠকে বিএনপি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। কিন্তু দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি রেখে, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া বর্তমান সংসদের অধীনে নির্বাচন হলে সেটা কোনোভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সেনাবাহিনী মোতায়েন ছাড়া নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে বিএনপি।
বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখিত বক্তব্য উপস্থাপনে জানিয়েছেন, সদ্য অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাত, নির্বাচন কমিশনের ব্যর্থতা, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে হামলা, গণমাধ্যমের ওপর নতুন নির্দেশনা জারি, সার্বিক রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরেন।
এছাড়াও সম্প্রতি ছাত্রদের আন্দোলনে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে তাদের রক্তাক্ত করার কথা, হেলমেট ও মুখোশ পরে বিভিন্ন সংবাদকর্মীর ওপর হামলা করে তাদেরও আহত করার কথাও জানান। হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের জড়িত থাকার ব্যাপারে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও প্রচারিত ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা তুলে ধরেন সেই বৈঠকে।
তবে এ দুই বৈঠকের পর বিএনপির দুই নীতিনির্ধারকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন তিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করছেন। নির্বাচনের আগেই খালেদার মুক্তি, তিনশ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত এবং নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তাই আন্দোলন এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তির পথেই কাজ করছেন তারা। এর সাথে দেশি-বিদেশি শক্তির সমর্থন আদায়ের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে বিএনপি। এখন বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে বাধ্য করা। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়তেও বেশ তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা।
এ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও এ মুহূর্তে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে সবদলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করাই বিএনপির মূল চ্যালেঞ্জ। অতীতের চেয়ে বিএনপি এখন কঠিন সময় পার করছে এটি অস্বীকার করার কিছুই নেই। এখন খালেদার মুক্তি মিললেই সব চ্যালেঞ্জ সহজ হয়ে যাবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘এই সরকার ক্রমশ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এখনই আন্দোলনের ভালো সময়।’
নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের চ্যলেঞ্জ নিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, এই সরকারের শেষ সময় এসে গেছে। অতিদ্রুত বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তন ঘটবে। আমাদের নেত্রী কারাগারে তাই আমাদেরও সময় আসছে একটা সক্রিয় ইমানি ভূমিকা পালন করার। আন্দোলনের রূপ নিয়ে আমার সংবাদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান দুদু।
তিনি বলেন, বিএনপি সকল দলের অংশগ্রহণে ভালো একটা নির্বাচন চায়। একটি উৎসবমুখর নির্বাচন চায়। কিন্তু সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে হাঁটছে না। আদালতকে ব্যবহার করে এই সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেছে। এখনো আলোচনার মাধ্যমে বিএনপি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাইবে। সরকার যদি সেই পথে না হাঁটে তাহলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বিএনপির আন্দোলন সরকার সামাল দিতে পারবে না বলেও মত দুদুর।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ