আকাশবার্তা ডেস্ক :
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে গতকাল সোমবার রাত ১২টার পর থেকে আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে ভারত। পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর গ্রিড থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার আন্তঃবিদ্যুৎ সংযোগ গ্রিডের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আসে। গতকাল বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার গণভবন থেকে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লি থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
এ অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভেড়ামারায় নবনির্মিত ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ‘হাই ভোল্টেজ ডিসি ব্যাক টু ব্যাক স্টেশনের দ্বিতীয় পর্যায়েরও উদ্বোধন করেন দুই প্রধানমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেবও কলকাতা ও আগরতলা থেকে এ ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন।
এছাড়া আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্পের বাংলাদেশ অংশ এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল সংযোগ পুনঃপ্রকল্পের নির্মাণ কাজেরও উদ্বোধন হয় এ অনুষ্ঠানে। গত রোববার পর্যন্ত ভারত থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পায় বাংলাদেশ। নতুন ৫০০ মেগাওয়াট যুক্ত হওয়ার পর ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটে। অনুষ্ঠানের শেষের দিকে ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা মমতা ব্যানার্জীকে পূজার শুভেচ্ছা জানান। মমতা ব্যানার্জীও শেখ হাসিনাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান।
এ সময় শেখ হাসিনা মমতাকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানান। শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ইঙ্গিত করে বলেন, আপনি জিতুন, আমরা আসবো। কনফারেন্সে নরেন্দ্র মোদি হিন্দিতে বক্তব্য রাখলে শেষপর্যায়ে এসে তিনি বাংলায় বলেন, আজ থেকে আমরা আরও কাছে এলাম। আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। বর্তমান সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ইতিহাসের ‘সোনালি অধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেন মোদি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যে সম্পর্ক বজায় আছে তা বিশ্বে একটি রোল মডেল। ভারত থেকে অতিরিক্ত আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমাদের উন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এতে দুই দেশই লাভবান হলো। আর আমাদের উন্নয়নের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমর্থন ও সহযোগিতা মাইলফলক হয়ে থাকবে।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমরা ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছিলাম। বর্তমানে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০ হাজার মেগাওয়াট। মততা ব্যানার্জী আমাদের আরও ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিতে চেয়েছেন। আশা করি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি জি তাতে কোনো আপত্তি করবেন না।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে প্রতিটি সেক্টরে দ্রুত উন্নয়ন হচ্ছে। আমরা ২০৪১ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে এগিয়ে যাচ্ছি। সে হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে।
এ বিদ্যুৎ পেলে বাংলাদেশের অনেক সাফল্যগাঁথার সঙ্গে ভারতের অবদান থাকবে। ভারতের কাছ থেকে নতুন নতুন সহযোগিতার ফলে নতুন নতুন বাতায়ন খুলে যাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্ব আরও অটল থাকবে। এই সহযোগিতার কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীসহ সব সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।জাতীয় গ্রিডে নতুন আসা ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট আসবে ভারতের সরকারি কোম্পানি ‘ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট’ থেকে। বাকি ২০০ মেগাওয়াট আসবে বেসরকারি কোম্পানি ‘পাওয়ার ট্রেডিং কর্পোরেশন’ থেকে।
পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর থেকে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা হয়ে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয় ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর। ওই সঞ্চালন লাইন দিয়ে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া ত্রিপুরা থেকে কুমিল্লা হয়ে আসছে আরও ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।ভারতীয় ৭৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় স্থাপিত উচ্চক্ষমতার সঞ্চালন লাইনের দুই ব্লকের মাধ্যমে রোববার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত ১টার পর দেশে আসছে বলে জানিয়েছেন ভেড়ামারা সঞ্চালন লাইন প্রকল্পের পরিচালক কিউএম শফিকুল ইসলাম।
এর আগে রাত ৮টায় ভেড়ামারা সঞ্চালন লাইনের প্রথম ব্লক দিয়ে ৪৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল। এরপর নতুন নির্মিত দ্বিতীয় ব্লক দিয়েও ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ আসতে শুরু করে। রাত ঠিক ১২টায় দুই ব্লক মিলিয়ে মোট ৫৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসা শুরু হয়। গত শুক্রবার এ বিষয়ে পিডিবির সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়। এর আগে, ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়। গত রোববার পর্যন্ত ওই ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াও ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি হচ্ছিল।
গতকাল আরও ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারত থেকে আমদানি শুরু হলো। সবমিলিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মোট পরিমাণ দাঁড়ালো ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট। ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াটের চুক্তি হলেও বাংলাদেশ তার চাহিদা মতো ভারতের কাছ থেকে এই বিদ্যুৎ নেবে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, এই বিদ্যুৎ আমদানির জন্য এরই মধ্যে ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি বিদ্যুৎ ভ্যাপার নিগাম লিমিটেড (এনভিভিএন) ও পাওয়ার ট্রেডিং কর্পোরেশন (পিটিসি) ইন্ডিয়া লিমিটেডকে নির্বাচিত করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত ১১ এপ্রিল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি তাদের দর প্রস্তাব অনুমোদনও করেছে।
পিডিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে স্বল্পমেয়াদে ৩০০ ও ২০০ মেগাওয়াট করে ভারতের এই দুই কোম্পানির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। সরকার স্বল্প ও দীর্ঘ দুই মেয়াদে ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদ এবং ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মেয়াদকে দীর্ঘমেয়াদ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সূত্র আরও জানায়, এনভিভিএন (ইন্ডিয়া) থেকে স্বল্পমেয়াদে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৭১ পয়সা দামে প্রতিদিন ৩০০ মেগাওয়াট ও পিটিসি ইন্ডিয়া থেকে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৮৬ পয়সা দামে প্রতিদিন ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে।
তবে, দীর্ঘমেয়াদে এনভিভিএন প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা মূল্যে ৩০০ মেগাওয়াট ও পিটিসি থেকে প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৫৪ পয়সা মূল্যে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে।এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আখাউড়া-আগরতলা ডুয়েল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প এবং কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল পুনর্বাসন প্রকল্পের খরচের একটি বড় অংশ মেটানো হবে ভারতের এক বিলিয়ন ডলার ঋণের অংশ থেকে।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া থেকে ত্রিপুরার আগরতলা পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ প্রকল্পের ৪৭৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ের মধ্যে ভারত সরকার ঋণ হিসেবে দেবে ৪২০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। বাকি ৫৭ কোটি ৫ লাখ টাকা বাংলাদেশ সরকারই জোগাবে। রেলপথের পাশাপাশি কালভার্ট, প্যাসেঞ্জার প্ল্যাটফর্ম, প্লাটফর্ম শেড, কাস্টমস অ্যান্ড ইমিগ্রেশন ভবন এবং পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ করা হবে এ প্রকল্পের আওতায়। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যের রেল যোগযোগ সহজ হবে।
রেলপথে ত্রিপুরা থেকে কলকাতার দূরত্ব ১ হাজার ৬৫০ কিলোমিটার থেকে কমে দাঁড়াবে ৫১৫ কিলোমিটারে। আর কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুরের মধ্যে ৫৩ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসন কাজে ব্যয় হবে ৬৭৮ কোটি ৫০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণ থেকে পাওয়া যাবে ৫৫৫ কোটি ৯৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা; আর ১২২ কোটি ৫২ লাখ ৩ হাজার টাকার জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। এ প্রকল্পের অধীনে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথে রেলসেতু, স্টেশন ভবন, প্ল্যাটফর্ম, রেললাইন এবং অন্যান্য রেল অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার করা হবে।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ