বুধবার ১৮ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ঐক্য-বিএনপিতে বিষাদের আভাস

আকাশবার্তা ডেস্ক : 


বিএনপির টার্গেট কী? ক্ষমতায় যাওয়া নাকি দেশের পরিবর্তন। নাকি তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে ড. কামাল-বি. চৌধুরীর ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে ঢাকা অচল করে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি? এমন প্রশ্নই রাজনীতি পাড়াসহ সর্বত্র। তাছাড়া ঐক্য নিয়েও বিএনপির একাংশে সন্দেহ বাড়ছে।

ড. কামাল হোসেন গণআন্দোলন ছাড়াই কোন ইশারায় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন! কারণ এখনো ঐক্যর নেতারা বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ভারতসহ অন্য দেশের প্রভাবের কথা বলছেন না। কীভাবে সরকার পতন হবে এ নিয়ে কার্যকর রূপ রেখা নেই। কাঁটাছেড়া সংবিধানের কথাও বলছেন না। গত দুমাস আগেও ড. কামাল হোসেন আইন বিভাগ-শাসন বিভাগ নিয়ে কথা বললেও হঠাৎ নীরব হয়ে গেলেন।

এখন বিএনপি পাড়ার প্রশ্ন কী চাচ্ছে জাতীয় ঐক্য? দেশ সংস্কার নাকি ক্ষমতা! নাকি লাভে লোভের হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়া। রয়েছে গুঞ্জনও, শেষ মুহূর্তে সরকারের কাছে অর্থলোভে পিছু হাঁটবেনাতো! প্রশ্ন রয়েছে জাতীয় ঐক্য কী বিএনপির প্ল্যান নষ্ট করবে নাকি বিএনপি ঐক্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাঁঠাল ভেঙে খাবে।

তবে লন্ডনের ছকে বিএনপি হাঁটছে দুই পথে। বিএনপির দাবি আ.লীগ ছাড়া সবাই ঐক্য চাচ্ছে। তবে ঐক্যর নেতারা এ নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। জনগণ এ নিয়ে ধূম্রজালে আছে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। তাদের লক্ষ্য পরিষ্কার হচ্ছে না। কী কারণে ঐক্য করেছে। অনেকেই মনে করছেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে। বলছেন সিট ভাগাভাগির কথা। কতদিন সরকার চালাবেন সেটিও বলছেন। ঐক্য প্রসঙ্গে মালয়েশিয়ার মডেলের কথাও তুলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

মালয়েশিয়ার মডেল মাহাথির মুহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম তারা যে জোট বেঁধেছিলেন সেই আওয়াজটা তুলছেন অনেকে। আনোয়ার ইব্রাহিমের আসন সংখ্যা বেশি থাকলেও পরিবর্তনের জন্য মাহাথিরকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়। বাংলাদেশেও সেই মডেলের কথা বলা হচ্ছে। বিরোধীদের মূল টার্গেট ক্ষমতায় যাওয়া। কিন্তু সেই মাহাথির কে? সেটি কেউ স্বীকার করছেন না। তবে এ নিয়ে বিএনপি সূত্রগুলো বলছে, কৌশলে বিএনপি দুই পথে হাঁটছে।

একদিকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে অদৃশ্য সম্পৃক্ত রেখে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করবে অন্যদিকে রাজধানী থেকে তৃণমূল পর্যন্ত এখন থেকেই দুই মাস লন্ডন থেকে সাময়িক পুরো আন্দোলনের একক নির্দেশনা দেবেন তারেক জিয়া! রাজনীতি পাড়ায় গুঞ্জন রয়েছে এই সময়ে ফখরুলকে দিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অন্যদিকে অভ্যুত্থানের মতো বড় কিছুরও পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে বিএনপি।

সম্প্রতি ফখরুলের জাতিসংঘে সফর কৌশলেরই পথ। এদিকে দিনদিন দ্বন্দ্ব প্রকাশ পাচ্ছে ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ঐক্য প্রক্রিয়ায়। গত শনিবার জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিন বি. চৌধুরী অসুস্থতার কথা বলে মগবাজার এসেই মাঝপথ থেকে ফের বাসায় ফিরে যান।

তার অনুপস্থিতেই সংবাদ সম্মেলনে ও মিছিলে যুক্তফ্রন্টের অন্তর্ভুক্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আসম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। লন্ডন সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার জন্য ড. কামাল হোসেন এবং বি. চৌধুরীদের ঐক্য আওয়ামী লীগের একটি ফাঁদ। খালেদা জিয়া কারাগার থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও তার আইনজীবীদের মাধ্যমে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

কিন্তু তারেক জিয়া চাচ্ছেন কৌশলগত কারণে হলেও নির্বাচনে যাওয়া উচিত। বিএনপি যদি এবার নির্বাচনে না যায় তাহলে দলের আর অস্তিত্ব থাকবে না। দলের একটি সূত্র বলছে, তারেক জিয়া মনোনয়ন বাণিজ্য করার জন্য দলকে নির্বাচনমুখী করতে চাইছেন। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।

তারেকের ভাষ্য, শরিকদের ৩০-৫০ আসনের বিনিময়ে হলেও তাদের নির্বাচনি মাঠে নামানো উচিত। এদিকে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, সরকার পতনই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের প্রধান কর্মসূচি।

ঐক্যর একটি সূত্রের মতে, বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী দিন দিন জাতীয় ঐক্যের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি করছে, যুক্তফ্রন্টের সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছেন। সূত্রের ভাষ্য, ড. কামাল হোসেনের যেমন আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষোভ, তেমনি বিকল্পধারার সভাপতি বি. চৌধুরীরও রাগ-অভিমান আছে বিএনপির ওপর। সম্প্রতি ড. কামাল ও মান্নার বিএনপির প্রতি দুর্বলতা এবং জাতীয় ঐক্যে দলটিকে নিতে তাদের উদগ্রীব মনোভাব দেখেই বি. চৌধুরী যুক্তফ্রন্ট এবং জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার কার্যক্রম থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে ফেলছেন।

এছাড়া জাতীয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে ১৫০ আসনের দাবিতেও অনড় বি. চৌধুরী। বি. চৌধুরী চাচ্ছেন, বিএনপি তাদের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করুক। কিন্তু ঐক্য প্রক্রিয়ার দুই নেতা ড. কামাল ও মাহমুদুর রহমান মান্না নিজেরাই বিএনপিকে ঐক্যে নিতে অতিউৎসাহ দেখাচ্ছেন। এ কারণে জাতীয় ঐক্য ও যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বি. চৌধুরী।

গত শনিবার অসুস্থতার অজুহাতে ঐক্য ঘোষণার দিন অনুপস্থিত থাকাও ছিলো বি. চৌধুরীর কৌশল। বি. চৌধুরী গোষ্ঠীর ভাষ্য, সম্প্রতি তারা নির্বাচনের জন্য যে দাবি ও লক্ষ্য দিয়েছেন তা বিএনপিরই ছক। তার মধ্যে রয়েছে, তফসিলের আগেই সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনি রোডম্যাপ নির্ধারণ, নির্বাচনের একমাস আগে সংসদ ভেঙে দেয়া, টেলিভিশন-রেডিও ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশ নির্বিঘ্নে করতে দেয়া, কোটা সংস্কার ও সড়ক আন্দোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি, বর্তমান সরকার বাতিল করা, নির্বাচনের একমাস আগে ও ১০ দিন পর পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করা, ইভিএম বাতিল, নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা।

নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ না নেয়া। নির্বাচনের আগে ও পরে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, আইনশৃঙ্খলা সংস্থাসহ সিভিল প্রশাসনকে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা। এ দাবিগুলো এতদিন বিএপিরই ছিলো। যে জন্য ড. কামাল- মান্না বিএনপির সুরে কথা বলছেন।

বাংলাদেশে জোটের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি বলেন, একটা স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য গঠন হওয়া ঐক্য কিংবা জোট শতভাগ প্রভাব ফেলবে। নির্বাচন এলেই জোট গঠন হয় এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র। তেমনি এবারো জোট গঠন হয়েছে। জোটের প্রভাব আর গুরুত্বকে ছোট করে দেখার কারণ নেই। জোটের স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করবে ক্ষমতায়ন।

বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, অসুস্থ দেশকে সংস্কারের জন্য জোট প্রয়োজন। এজন্য সম্মিলিত জোট হচ্ছে। বাংলাদেশের এ সময়ে জোট গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐক্যর মাধ্যমে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কেউ এককভাবে কিছু করলে হবে না। দেখা গেলো আওয়ামী লীগ যেমন এখন ক্ষমতায় এসে শুধু বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু বলে কাজ করছে, জিয়াউর রহমানের নামই নিচ্ছে না। আবার বিএনপি ক্ষমতায় এলে বঙ্গবন্ধুকে ভুলে যাবে, শুধু জিয়াউর রহমানের কথা বলে দেশ চালাবে।

এভাবে অসুস্থ রাজনীতিতে দেশ চলতে দেয়া যায় না। ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, সম্প্রতি ছাত্ররা রাস্তায় নেমে আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে দেশ কতটা অসুস্থ। দেশের প্রশাসন, পুলিশবাহিনী, আইন-আদালত, শিক্ষা, চিকিৎসা, গণতন্ত্র, মিডিয়া সব অসুস্থ হয়ে আছে। এগুলো সংস্কারের জন্য সম্মিলিত ঐক্যের দাবি এই বুদ্ধিজীবীর।

এখনো কোনো ধরনের আন্দোলনের ইঙ্গিত নেই ঐক্য থেকে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জনগণ ঐক্য প্রক্রিয়ার পক্ষে চলে আসতেছে। নির্বাচনের আগে সবার মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে যাবে। দেশেরও পরিবর্তন হবে। আন্দোলন হতে থাকবে… সব তৈরি করা আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে আমার সংবাদকে বলেন, আমাদের পাশের দেশ ভারতে অঞ্চলভিত্তিক পর্যন্ত জোট হয়। যারা এককভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছেন তাদের ওপর একসময় মানুষ ক্ষিপ্ত হয়। আর তাদেরও জবাবদিহি করতে হয়। এ জায়গাগুলো যখন উঠে যায় তখন জোটের প্রয়োজন হয়। তখন জোটশক্তি দুর্বলদের অধিকারগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে। এদেশেও জোটের গুরুত্ব আছে।

এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরও বলেন, এদেশেও জোট এবং ঐক্যশক্তির ইতিহাস আছে। যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন, মুসলিম লীগের পতন, স্বৈরাচার এরশাদের পতনও ঐক্যশক্তির মাধ্যমে হয়েছে। তাই সাম্প্রতিক দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ঐক্য হয়েছে।

আগামী নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে জোটশক্তি কার্যত ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য। জাসদ (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নয়, আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই জোট দাবি রাখে। বাংলাদেশে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দলের ঊর্ধ্বে থেকে জাতীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য এবং ঐতিহাসিক কর্তব্যসাধনে জোট প্রয়োজন। তাছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র রুখতে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে জীবিত রাখতে জোট অতীতেও ভূমিকা রেখেছে এবারো রাখবে।

সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১