আকাশবার্তা ডেস্ক :
নির্বাচন এলেই ভোটারদের কদর বেড়ে যায় রাজনৈতিক নেতাদের কাছে। এসময় ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়ে থাকেন ভোটপ্রার্থীরা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই ঢাকাসহ সারাদেশেই নিজের ভোটের পাল্লা ভারী করতে বাংলাদেশের দুটি প্রধান বড় দল আ.লীগ ও বিএনপিসহ অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলো পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে।আগামী নির্বাচন প্রতিটি রাজনৈতিক দলেগুলোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আ.লীগ মনে করে দেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে তাদের আবারো ক্ষমতায় আসা দরকার।
অন্যদিকে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে বিএনপিকে ক্ষমতায় আসা দরকার বলে মনে করেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। গত রোববারের জনসভার মধ্য দিয়ে বিএনপি নেত্রীর মুক্তি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সকল নেতাকর্মীদের মামলা প্রত্যাহারসহ ৭ দফা দাবি ঘোষণা করলেও মূলত ভোটের মাঠে জানান দিতেই এই সভা-সমাবেশ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেই লক্ষ্যে সম্প্রতি প্রতি জেলায় জেলায় স্মারকলিপি প্রদান ও মহানগরে সমাবেশ করেছে। অতিসত্ত্বর দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হবে বলে দলটির নেতাকর্মীরা মনে করে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন থেকেই আ.লীগের নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে নিজেদের জানান দিতে সামাজিক কার্যক্রমসহ গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। সবার লক্ষ্যই আগামী নির্বাচনে ভোটারদের নিজের দিকে আকৃষ্ট করা। আ.লীগ নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটারদের কাছে গত ১০ বছরের উন্নয়নকে তুলে ধরছে। তারা ভোটারদের বোঝাতে চেষ্টা করছে উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে আ.লীগকে আবারো ক্ষমতায় আসা দরকার। এছাড়াও বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরছেন ভোটারদের সামনে। অন্যদিকে বিএনপি তুলে ধরছেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দেশে গণতন্ত্রের অভাব। দেশের মানুষ আজ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের শত শত কোটি টাকা লোপাট হচ্ছে। ভোটারদের কাছে আ.লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কথা তুলে ধরছেন। গণতান্ত্রিক সরকার স্থাপনে তারা জনগণের মন জয় করার চেষ্টা করছেন।
এছাড়াও ছোট-বড় মিলে প্রায় একশরও উপরে দল রয়েছে এদেশে। যারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বড় দলের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে ইসলামি ঘরানার দলগুলো। পিছিয়ে নেই বামদলগুলো। সব মিলিয়ে এখন সব জায়গায় চলছে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা। হিসাব-নিকাশ হচ্ছে কে পাচ্ছে দলীয় মনোনয়ন। কাকে মনোনয়ন দিলে পাস করার সম্ভাবনা রয়েছে এমনটি নিয়ে ভাবছেন নিজ দলের নেতারা। অন্যদিকে দলের অন্ধভক্তরা ভাবছেন নির্বাচনে নিজের দলের প্রার্থী অবশ্যই পাস করবেন।
এমনকি কিছু কিছু ভক্ত নির্বাচনের আগেই তার প্রার্থীর পাস হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছেন। গতকাল হাসনাবাদ চায়ের স্টলে বসে কথা বলছিলেন আ.লীগ বিএনপির সমর্থকরা। একপর্যায়ে আ.লীগের এক সমর্থক বললেন, বিপু ভাই গত ১০ বছরে যে উন্নয়ন করছে মানুষ এখন আ.লীগ ছাড়া কোনো চিন্তা করে না। আবার নসরুল হামিদ বিপু পাস করবেন বলে তারা আশাবাদী। এছাড়াও বিএনপির সমর্থকরাও এগিয়ে রাখছেন তাদের নেতাদের। সাধারণ মানুষের সাথে তাল মিলিয়ে একই সুরে কথা বলছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, দেশের মানুষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি তথা বিশ দলীয় জোট পাস করবে বলে তিনি আশাবাদী। বিএনপির সাত দফা যদি আ.লীগ না মানে তাহলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কি হবে তা পরে জানানো হবে বলে জানান এই নেতা।
তবে নির্বাচনি কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিএনপি মনে করে দেশে এখন সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অবশ্যই তারা বিপুল ভোটে পাস করবে। অন্যদিকে আ.লীগ নেতারা মনে করেন গত দশ বছরে আ.লীগ যে উন্নয়ন করেছে জনগণ এই মুহূর্তে আ.লীগের বিকল্প কিছু ভাবছে না।এব্যাপারে আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামিম আমার সংবাদকে বলেন, বিএনপি এখন জনবিচ্ছিন্ন দল। তাদের এখন কেউ ভোট দেবে না। যে কারণে দেশের মানুষের প্রতি আস্থা হারিয়ে তারা এখন বিদেশিদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।
বিএনপির সাত দফা দাবি অযৌক্তিক মনে করে এই নেতা বলেন, বিএনপি যাই বলুক দেশে সংবিধান মেনে শেখ হাসিনা সরকারের অধিনেই নির্বাচন হবে এবং সে নির্বাচনে আ.লীগই পাস করবে। যারা গত দশ বছরে আন্দোলন করতে পারেনি তারা আগামী এক মাস আন্দোলন করে অনেক কিছু করে ফেলবে এমনটা ভাবা ঠিক না। কারণ মানুষ তাদের আন্দোলনে সাড়া দেয় না। একথার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন বিএনপিনেতা খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল বলেন, বিএনপির আন্দোলন যৌক্তিক না অযৌক্তিক সেটা আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে প্রমাণ করবো। আ.লীগ নেতার মন্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষন করে তিনি আরও বলেন, যারা গত দশ বছর আন্দোল চাঙ্গা করতে পারেনি তারা যে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন পারবে না এমনটি ভাবা ঠিক না। দেশে রাজনৈতিক দল একশরও উপরে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। যারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
এর বাইরে নাম শোনা এক দলের এক নেতাসম্বলিত দলের সংখ্যা অগুনতি। যা গণতন্ত্রের জন্য সুন্দর বার্তা। আর বহুদল বাঙালির জন্য শুভ পরিবর্তন অবশ্যই কাম্য, তবে আ.লীগকে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে কোনোভাবেই বাংলাদেশে শুভ পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে দাবি করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে কেউ কেউ মনে করেন, আ.লীগের ব্যর্থতা আছে, অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে সফলতার পাল্লা তার চেয়ে ভারী। আওয়ামী যুবলীগের সহ-সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হাশেম রেজা মনে করেন, বিএনপির সাত দফা হচ্ছে অযৌক্তিক দাবি। কারণ খালেদা জিয়া তার অপকর্মের কারণে জেলে গেছেন। তারেক রহমানসহ অন্যন্য নেতারাও মামলায় পড়েছেন তাদের অপকর্মের কারণে। এটার সাথে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। দেশে সংবিধান অনুযায়ী জননেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে।
আ.লীগের গত দশ বছরের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে এই যুবনেতা আরও বলেন, আ.লীগ গত দশ বছরে দেশে যে উন্নয়ন করেছে দেশের মানুষ এখন আ.লীগ ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা করে না। আমরা নৌকাকে বিজয় করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। গণসংযোগ ও সমাবেশ করে সাধারণ মানুষের মাঝে নৌকার প্রতি যে ভালোবাসা লক্ষ্য করেছি, তার উপর ভিত্তি করে বলতে পারি আগামী নির্বাচনে সাধারণ মানুষ নৌকাকে ভোট দেবে এবং নৌকার বিজয় কোনো শক্তিই ঠেকাতে পারবে না। বাংলাদেশের ১৮ কোটির অধিক জনগণকে নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। মোট ভোটের হিসাব নিয়ে নিশ্চই নির্বাচনি জোট করেছেন। বাংলাদেশে আ.লীগ ও বিএনপি ৭০ শতাংশ ভোট নিয়ন্ত্রণ করে।
জাতীয় পার্টি এবং জামায়াত নিয়ন্ত্রণ করে ১০ শতাংশ ভোট। বাকি ২০ শতাংশ ভাসমান ভোট যারা নির্ধারণ করে দেয় সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত। যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্য আসলে কাদের নিয়ে, কি জন্য। তাদের যে দাবিদাওয়াগুলো আছে, বিএনপি-জামায়াতও প্রায় সেই একই দাবি করছে। তাহলে নতুন জোটের প্রয়োজনীয়তা কী? এনিয়ে রয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। রয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝেও। বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. এমাজ উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, নির্বাচনমুখী দল ভোটের জন্য কাজ করবে এটাই স্বাভাবিক।
তবে নির্বাচনে কোনো দল নির্বিঘ্নে নির্বাচনি প্রচারণা করবে আর কোনো দল মামলা-হামলায় থাকবে সেটা হয় না। তিনি বলেন, বর্তমানে বিএনপি নেতৃবৃন্দের নামে প্রায় ৮০ হাজার মামলা রয়েছে। যে মামলাগুলোতে প্রায় ২০ লাখ আসামি রয়েছে। এ মুহূর্তে তারা দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন করতে চাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্য ভালো না। তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটি নির্বাচন করে আবারো ক্ষমতায় আসার পাঁয়তারা করছেন বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।
সারাদেশে ৭ দফার নামে তারা নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি যেহেতু নির্বাচনমুখী দল সুতরাং তারাতো নির্বাচনি প্রচারণা করতেই পারে। একাদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে পিছিয়ে থাকতে চান না ইসলমি দল ও বামদলগুলো। তারাও সাধ্যমতো ভোটারদের মন জয় করতে নিজস্ব গতিতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। খোঁজখবর নিচ্ছেন সাধারণ মানুষের। বিপদে পাশেও দাঁড়াচ্ছেন তাদের।
এমনকি নিজস্ব অর্থায়নে রাস্তাঘাট করে দেয়াসহ সামাজিক কার্যক্রমে নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায় মৌলভীবাজার-৩ আসন থেকে ২০ দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী খেলাফত নেতা আহমদ বিলাল নিজ অর্থায়নে রাজনগর উপজেলার উত্তরভাগ ইউনিয়নে বন্যায় ভেঙে যাওয়া খেয়াঘাট বাঁধবাজার রাস্তাটি নির্মাণ করে দেন। লক্ষ্য একটাইÑ সামনে নির্বাচন। জোটের মনোনয়ন ও ভোটারদের মন জয় করা।
অন্যদিকে মনোনয়ন পেতে ইতোমধ্যেই এরশাদের জোটে যোগদান করেছেন ইসলামি ঐক্যজোটের একটি অংশ। তাছাড়াও মহাজোটের শরিক ইসলামি ঐক্যজোট একাংশের চেয়ারম্যান মিসবাহুর রহমান চৌধুরী তার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে একটি নতুন জোট। যার নাম দেয়া হয়েছে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স। যারা মহাজোটের সংগে দরকষাকষি করতে ইতোমধ্যেই নামসর্বস্ব কিছু দল নিয়ে এ জোট করেছেন। তারাও ভোটের মাঠে জানান দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান মিসবাহুর রহমান চৌধুরী। এছাড়াও বাম দলগুলোর মধ্যে কিছু রয়েছে মহাজোটের সাথে আবার কিছু রয়েছে ২০ দলীয় জোটের সাথে।
তারাও নিজ অবস্থান থেকে ভোটারদের মন জয় করতে ইতোমধ্যেই মাঠ-ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে প্রায় সময় এলাকায় যাচ্ছেন। এছাড়াও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশদলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হলেও নির্বাচনি প্রচারণা থেকে পিছিয়ে নেই তারাও।
বিভিন্নভাবে মাঠে জানান দেয়ার চেষ্টা করছে তারা। আগামী নির্বাচনে কে জিতবে বা কে হারবে এনিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। আ.লীগ এবং বিএনপির মধ্যে রয়েছে এনিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা। সাধারণ মানুষের মাঝে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করছে তারা। নিজেদের মধ্যে চলছে বৈঠকের পর বৈঠক। আগামী নির্বাচনকে সহজভাবে নিচ্ছেন না দেশের প্রধান দুই দল।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ