আকাশবার্তা ডেস্ক :
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বকশিবাজারের বিশেষ কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) নেওয়া হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে শনিবার (০৬অক্টোবর) বিকালে পুরান ঢাকার কারাগার থেকে শাহবাগের হাসপাতালটিতে নেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিএসএমএমইউতে দুটি কেবিন দুপুর থেকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বিকালে খালেদা জিয়াকে আনার আগে দুপুরে তার ব্যবহার্য জিনিসপত্র হাসপাতালে আনা হয়। বেলা সোয়া ৩টার দিকে তাকে নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে পুলিশের একটি গাড়ি। এর সামনে পেছনে ছিল পুলিশ, র্যাবের বেশ কয়েকটি গাড়ি। একটি অ্যাম্বুলেন্সও ছিল গাড়িবহরে।
শনিবারই বিএনপি চেয়ারপারসনকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলে সকালে জানিয়েছিলেন বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হারুন অর রশীদ। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের বাইরে দুপুর থেকে পুলিশের প্রস্তুতি দেখা যায়।
দুপুর থেকে কারা ফটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ফটকের সামনে আনা হয় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। র্যাবের গাড়িকেও দেখা যায় ঘন ঘন টহল দিতে। কারাগার সংলগ্ন মাক্কুশা মাজারের সামনে, বকশীবাজার মোড়ে পুলিশ অবস্থান নিয়ে গাড়ি চলাচলও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।
এর আগে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আনা হয়েছিলো কালো রংয়ের একটি পাজারো। যার নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ- ১৪-২১২৭। কিন্তু খালেদা জিয়া উঁচু গাড়িতে উঠতে পারবেন না বলে পরবর্তীতে প্রাইভেটকারটি আনা হয়।
তার আগে ঢাকা মেট্রো ১৪-১৫৮৬ নম্বরের র্যাবের একটি পিকআপ কারাগারের ভেতর থেকে বের হতে দেখা যায়। তাতে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত ম্যাট্রেস বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে কারাগারের সামনে আসে পুলিশের একটি অ্যাম্বুলেন্স। যার ইঞ্জিন নং ৬৩১১। এই অ্যাম্বুলেন্সে একজন চিকিৎসককে দেখা যায়। তবে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে দুপুর সোয়া ১টার পর চকবাজারের মুখে, সাতরোজা রাস্তার মুখ ও কারাগারের রাস্তার মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় পুলিশ প্রহরা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কারা ফটকের বাইরে বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গাড়ি অবস্থান করতে দেখা গেছে। সেখানে আগে থেকেই রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি।
এর আগে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করে চিকিৎসার পরামর্শ দেয় মেডিকেল বোর্ড। তবে খালেদা জিয়া বিশেষায়িত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। বিএসএমএমইউয়ে চিকিৎসার পরামর্শ তিনি এড়িয়ে গেছেন। পরে বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) রাতে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কারাগারের একটি প্রতিনিধি দল চিকিৎসা সংক্রান্ত আদেশের কপি নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে যান। কারাগারের প্রতিনিধি দলটি বিএসএমএমইউতে ভর্তির ব্যাপারে জানতে চাইলে খালেদা জিয়া নমনীয়তা প্রকাশ করেন।
ওই প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে শুক্রবার (৫ অক্টোবর) বলেন, বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) স্বাচিব ও ড্যাব সদস্য নয়, খালেদা জিয়ার পছন্দসই এমন তিনজন চিকিৎসককে নিয়ে নতুন মেডিকেল বোর্ড গঠন করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। সেই আদেশের কপি গতকাল (৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে কারাগারে পৌঁছায়। উচ্চ আদালতের সেই আদেশের কপি নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। খালেদা জিয়া সেটি পড়ে দেখেন। এসময় খালেদা জিয়া নমনীয়তা প্রকাশ করেন।
কারা চিকিৎসক মাহমুদুল হাসান জানান, চিকিৎসা সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা খালেদা জিয়াকে জানানো হয়েছে। নির্দেশনা মতে তিনি বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা করাতে রাজি হয়েছেন।
ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরী জানান, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে ভর্তির সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে গত ১৫ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড পুরান ঢাকায় নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ আল হারুনের হাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন দাখিল করে ৫ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড।
এর আগে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন তার চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউয়ের পাঁচ চিকিৎসক— মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ জলিল, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক, অর্থপেডিক বিভাগের অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বিরু, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসার সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউয়ে ভর্তি করে চিকিৎসার সুপারিশ করেন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা
পরে বিশেষায়িত মেডিকেলে চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে রিট দায়ের করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। এই রিটে কারা কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশনা চাওয়া হয়। সেই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত মেডিকেল বোর্ডের পাঁচ সদস্যের মধ্যে দু’জনকে রেখে বাকি তিনকে বদলের আদেশ দেন। আদালত বলেন, খালেদা জিয়ার পছন্দের চিকিৎসকদের এই মেডিকেল বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। তবে তারা কেউ স্বাচিপ বা ড্যাবের সদস্য হতে পারবেন না।
প্রসঙ্গত, গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন কশীবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এরপর থেকে নাজিমুদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি আছেন খালেদা জিয়া।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ