আকাশবার্তা ডেস্ক :
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস, বয়সের ভারে অসুস্থতা, আন্দোলনে ব্যর্থ, তার ওপর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একের পর এক সাজায় বিব্রত ঐক্য প্রক্রিয়া। নির্বাচনের আগে তারেকের এ কলঙ্কে রাজনৈতিক মহাসংকটে পড়ে বিএনপি। দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য ২১ আগস্ট গ্রেনেডহামলা রায়ের পর তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ‘অন্ধকার’। এ রায়ে বিএনপি চরম হতাশ ও বিব্রত। এ কলঙ্কের বোঝা তাদের দীর্ঘদিন ধরেই বইতে হবে।
তবে গণমাধ্যমে বেঁচে থাকা দু-এক নেতার মত, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান দেশে ফিরে আসলে ক্ষমতার পরিবর্তন হলে দন্ড থাকবে না। এখন এ পরিস্থিতিতে অনেকেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান পদে তারেক রহমানের থাকার নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অনেকেই বলছেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেডহামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রাপ্ত লন্ডনে নির্বাসিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উচিত দলের নেতৃত্ব থেকে এখনই সরে দাঁড়ানো। এটা রাজনীতির নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন।
রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ডের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদে আসীন থাকা মোটেই উচিৎ নয়। নির্বাচনের আগে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যও এ নিয়ে চরম বিব্রত। সন্ত্রাসী স্বীকৃতি পাওয়া দলের প্রধানের কারণে অন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে এখনই দূরত্ব তৈরি করছেন ড. কামাল ও বি.চৌধুরী। নির্বাচনের আগে ফের কোনো সহিংসতা হলে তার দায় এড়ানোরও সুযোগ নেই বিএনপির ঘরে ঐক্যের সংসার হওয়া ব্যক্তিদের। আর বিএনপিও ঐক্যের শর্তের আলোকে জামায়াতকে ছাড়েনি। তবুও নির্বাচনের আগে হামলা-মামলা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যেকোনো উপায়ে নিজেদের পক্ষে কথা বলতে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে নিজেদের সংসারে রাখতে চান বিএনপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মত, এখন বিএনপির সাথে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আর ভালো অবস্থান নেই। তারেকের রায়ের আগে বিএনপির সাথে ড. কামাল হোসেন আর বি.চৌধুরী বসলেও এখন আর বসছেন না। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত দাবি লক্ষ্য গত বৃহস্পতিবার রাতে ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফেরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের বেইলী রোডের বাসায় পূর্বঘোষিত বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়।
জানা যায়, ড. কামাল হোসেন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করায় এরপর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় বৈঠকটি স্থানান্তর করা হয়। রাত ৯টায় রবের বাসায় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের বৈঠকে বসার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই বৈঠকটিও স্থগিত করা হয়। বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার শীর্ষ নেতাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো কারণ দর্শানো হয়নি।
এ বিষয়ে জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ড. কামাল হোসেনের বাসায় তিন পক্ষের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তিনি অসুস্থ থাকায় এটি রাত ৯টায় আ স ম আবদুর রবের বাসায় স্থানান্তর করা হয়। পরে এই বৈঠকটি স্থগিত করা হয়। তবে বৈঠক স্থগিতের কারণ সম্পর্কে আমি এত কিছু বলতে পারব না।’ সেই বৈঠকটি নানা নাটকের পর ফের গতকাল শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবের উত্তরার বাসায় শুরু হয়।
বৈঠকে অংশ নেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, সহ-সভাপতি তানিয়া রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক শহীদুল্লাহ কায়সার, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. জাহিদ, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিকল্প ধারার যুগ্ম-মহাসচিব মাহি বি চৌধুরী, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ প্রমুখ।
এদিকে হঠাৎ আ স ম আবদুর রবের বাসায় মিটিং চলা অবস্থায় বাইরে মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ। এরপর বৈঠক দ্রুত শেষ করে চলে যায় ঐক্যের নেতারা। বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আজ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হবে। তবে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং আসন বণ্টন এই দুই বিষয়ে ‘অনৈক্যে’র মধ্যেই ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য চূড়ান্ত করেছে বিএনপি, যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। এদের সমন্বয়ে আজ থেকে বৃহৎ ঐক্যের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। তার নাম ঠিক করা হয়েছে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি ৭ দফা দাবিতে রাখা নিয়ে এক সময় কয়েকটি দলের অনাগ্রহ থাকলেও এখন তা আর নেই। তার মুক্তির বিষয়টি প্রথম দাবিতে রেখে দফা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য সুষ্ঠু নির্বাচন। এ জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। ক্ষমতায় গেলে কীভাবে সরকার পরিচালিত হবে কিংবা আসন বণ্টনের বিষয়টির সুরাহা কীভাবে হবে তা এখনই মুখ্য নয়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে নামার আগেই শর্তজুড়ে দিলে তা কাক্সিক্ষত গন্তব্যে নাও পৌঁছতে পারে। তাই একসাথে আন্দোলন হবে।
আজ শনিবার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে। ঐক্যের বৈঠক নিয়ে নানা নাটক এবং ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উচিত দলীয় পদ থেকে সরে যাওয়া’ সুশীল সমাজের এমন পরামর্শ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘তারেক রহমানের পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না।’
‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দলীয় তদন্তকারীর চক্রান্তে সাজানো মামলায় তারেক রহমানকে সাজা দেওয়া হয়েছে। এটা জানার পরও কেউ কেউ বিএনপি থেকে তার পদত্যাগের পরামর্শ দিয়েছেন।’ ‘তাদের কাছে জনগণ প্রশ্ন করতে পারে যে, এত গুম, খুন করার জন্য দায়ী সরকারের পদত্যাগ কি তারা দাবি করেছেন?
নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়কে যখন আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রতিফলন ও বিএনপিকে দুর্বল করার অসৎ উদ্দেশ্য বলছি, তখন সেই রায়ের ভিত্তিতে তারেক রহমানের পদত্যাগের প্রশ্ন আসে না’ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমরা আশা করি, ইচ্ছাকৃতভাবে কিম্বা ক্ষমতাবান কারও তুষ্টির জন্য তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো থেকে দায়িত্বশীল মিডিয়া বিরত থাকবে।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারেক রহমানকে জড়ানো হয়েছে। তাকে জড়ানো প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। তারেক রহমানের জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তারপর ২০০৯ সালের পর কী হয়েছে সেটা দেখতে হবে। আগে এফবিআই ও ইন্টারপোলের প্রতিবেদনে তার নাম আসেনি। এ ঘটনার বিচারের জন্য বিএনপি সরকার সব ধরনের চেষ্টা করেছে। সে সময় আওয়ামী লীগ সহযোগিতা করেনি।
তারেকের কলঙ্ক রায়ের পরও বিএনপির সঙ্গে থাকা জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একুশে আগস্ট গ্রেনেডহামলার বিষয়ে আমাদের দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয় নাই। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো এই মামলার রায়ে এখানেই শেষ নয়। সুতরাং এই বিষয়ে এখনই কথা বলার সময় আসে নাই।’ ‘এই মামলায় সবে মাত্র লোয়ার কোর্টের রায় হলো।
এরপর আপিল বিভাগ আছে। সুপ্রিম কোর্টের পর যাদের ফাঁসির আদেশ হয়েছে তারা প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত যাবে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া, তাই আমি মনে করি এটা নিয়ে কথা বলার এখনও সময় হয় নাই।’
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ