আকাশবার্তা ডেস্ক :
তফসিল ঘোষণার আগেই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক মাঠ। গতকাল ড. কামালের চ্যালেঞ্জ দেয়া বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মাঠের পরিবেশ নতুন মোড় নিয়েছে। আওয়ামী লীগকেও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি মহাসচিবের ভাষ্য এ মুহূর্তে সবাইকেই দলে দরকার। এদিকে বিএনপিও তাদের অঙ্কিত ছকে এগোচ্ছে। এখন থেকেই সরকারকে চাপের মধ্যে রাখবে।
যদিও ড. কামালকে নিজেদের ঘরে আনার পরও এখনো তিনি বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে স্ব ইচ্ছায় মুখ খুলছেন না। সিলেটে ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে খালেদা জিয়ার মুক্তি চাইতে ভুলে যান! গতকাল সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে জাতীয় আইনজীবী ঐক্যফ্রন্টের অনুষ্ঠানেও একই গল্প তৈরি হয়।
বক্তব্য শেষ করার পর খালেদা জিয়ার মুক্তির স্লোগান উঠলে অবশেষে বলে উঠলেন খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই চাই! এদিকে সিলেটে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা দেশের মালিক হবো এমন বার্তা দিয়ে আসার পর গতকাল চট্টগ্রামের সমাবেশেও অনুমতি পেলেন। গতকালই দলের অনেক শীর্ষ নেতা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছে যান। সিলেটের ন্যায় চট্টগ্রামেও ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে জনস্রোতের মিলন হবে বলে মনে করছেন নেতারা। তবে শিগগিরই ‘চূড়ান্ত আন্দোলনে’ যাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এখন ধাপে ধাপে হার্ডলাইনের পথেই হাঁটছে তারা। বিভাগীয় শহরে শুরু হওয়া সভা-সমাবেশের ‘জনমত’ দেখে আন্দোলনের ‘চূড়ান্ত কর্মসূচি’ নির্ধারণ করছে জোটটি।
বিভাগীয় সমাবেশের পর ঢাকায় সমাবেশে আসবে অবরোধসহ ঐক্যফ্রন্টের চূড়ান্ত কর্মসূচি। এছাড়াও আরও বৃহত্তর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। যোগ দিতে পারেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। গতকাল রাতে ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। সাত দফাকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন। বললেন এখনই ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিচ্ছেন না। ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারেন বলে আভাস দিয়েছেন। এদিকে ড. কামালের হুঙ্কারে আওয়ামী লীগের ঘরেও ভাবনা জাগছে। গতকাল একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমরা একটা সভ্য দেশকে সুন্দরবন বানাতে চাচ্ছে নাকি?’ ‘না, সুন্দরবনকেও অপমান করা হয়। এটা জঙ্গল বানানো হচ্ছে।
যা এই সরকার করছে তা তো জানোয়াররাও করে না। বিনা কারণে কেন সরকার এসব করছে? মাথা খারাপ হয়ে গেছে এদের। আমি মনে করি সরকারের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ‘এ সরকারের নাকি তথাকথিত একটা আইনমন্ত্রী আছে। তোমার (আইমন্ত্রী আনিসুল হক) কাছে আমি উত্তর চাই। তুমি আমাদের একজন জুনিয়র ল’ ইয়ার। তোমার বাবা আমার সহকর্মী ছিলেন, সিরাজুল হক বাচ্চু ভাই, উনি আইনজীবী ছিলেন। তুমি কী হয়ে গেছো? তুমি আইন সব ভুলে গেছো? এসো তোমার সাথে আমরা আইনের বই দেখবো। কোন গ্রাউন্ডে মইনুল হোসেনকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে, কৈফিয়ত চাই। গণতন্ত্র যখন দাবি করে জনগণকে কৈফিয়ত দিতে হবে। দায়িত্ব আছে তোমার (আইনমন্ত্রী)। বলতে হবে তোমার। ইংরেজিতে একটি ধারা উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ১০ বছর পর হলেও তোমার দ্রুত বিচার হবে। আমাকে কী করবা? সর্বোচ্চ মেরে ফেলতে পারো, তাই তো? তোমার বিচার হবেই। কাউকে আটকের বিষয়ে সংবিধানে কী আছে উপস্থিত সংবিধানের ৩৭ এবং ৩৯ ধারাও পড়ে শোনান তিনি।
এর আগে সিলেটে সমাবেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়ে ড. কামাল হোসেন প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, স্বৈরাচার থেকে মুক্ত হতে হলে, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হতে হলে, জনগণের ক্ষমতার মালিকানা ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সবাইকে মাঠে নামতে হবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাইÑ ঐক্যফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ হন; বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। বাংলাদেশের জনগণের জয় হবেই। আসুন, ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা আবার দেশের মালিক হবো, এই রাষ্ট্র আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনব।
এদিকে এ নিয়ে আজ একটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার এক দফাও মানা হবে না। তাদের দাবি করা সব দফা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। তবে এ বিষয়টাকে গুরুত্বর সঙ্গে দেখছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘বিরোধী দল (বিএনপি) সাথে আছে বলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট দেশের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। তবে নির্বাচনে আওয়ামী লীগই জিতবে। এ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে সবাইকেই আমাদের দরকার আছে। সবাই আসছে, আরও আসবে। এছাড়া সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নেতাদের দলে ফিরিয়ে আনা নিয়েও কথা বলেন ফখরুল। তিনি আরও বলেন, ‘আজ শুধু বিএনপির নেতৃবৃন্দ নয়, যারাই এদেশে গণতন্ত্রের কথা বলছে তাদেরই কারাগারে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা দিয়ে।
এখন দেশে একটা পুরোপুরি ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন তাদের লক্ষ্যই হচ্ছে একটা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেটার লক্ষেই তারা চলেছে। কিন্তু এদেশের জনগণ কখনই এটা মেনে নেবে না এবং তাদের এই গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে তারা কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়েই এই স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে বিদায় করবে।’ ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ মুহূর্তে ঐক্যফ্রন্টের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ঐক্যকে আরও শক্তিশালী ও জোরদার করা, যেভাবেই হোক ঐক্য ধরে রাখা। ঘোষিত ৭ দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্যের সপক্ষে সারাদেশে জনমত তৈরি করা। সিলেটের পর আজ চট্টগ্রামে জনসভা করবে ঐক্যফ্রন্টে। এরই মধ্যে অনুমতিও দেয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামে সমাবেশ করার জন্য লালদীঘির মাঠ চেয়ে আবেদন করার পর নগর বিএনপির দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে সমাবেশ করার অনুমতি পেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পক্ষ থেকে নগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি আবু সুফিয়ানকে গতকাল শুক্রবার সকালে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছে। আবু সুফিয়ান বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে লালদীঘি মাঠে সমাবেশের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ সকালে সিএমপির পক্ষ থেকে নাসিমন ভবনে আমাদের পার্টি অফিসের সামনে সমাবেশ করতে পারবো বলে জানিয়েছে তারা। লাখো মানুষের জনস্রোত হবে বলেও জানান তিনি। এরপর রাজশাহীতে ২ নভেম্বর জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি বিভাগীয় শহরগুলোতেও জনসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সব শেষে ঢাকায় জনসভা করবে ঐক্যফ্রন্ট। এর মধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাও হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার আগে তাদের দাবি পূরণ না হলে ঢাকার জনসভা থেকেই ‘চূড়ান্ত আন্দোলনে’র কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে ঐক্যফ্রন্ট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মত, এরই মধ্যে ঐক্যফ্রন্ট আরও শক্তিশালী হচ্ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বৈঠক করেছেন। একইসঙ্গে কয়েকটি ইসলামী দলের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে জোট নেতাদের। বাম দলগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করছেন তারা। তফসিল ঘোষণার পরপর আরও বেশ কয়েক আওয়ামী সমর্থন দলও ড. কামালের জোটে চলে আসবে। সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমরা গণতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন করছি। প্রয়োজনে অবরোধসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সব কর্মসূচিই দেব। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঐক্য ফ্রন্টের নেতা মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত দফা দাবি না মানলে আন্দোলনের ঝড় তোলা হবে।
ঐক্যফ্রন্টের দাবিগুলো না মেনে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করলে বাংলাদেশে কঠোর আন্দোলনের ঝড় উঠবে। আর এই ঝড়ের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে সরকার বাধ্য হবে।’ সরকার নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু দেশের মানুষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন হতে দেবে না।’ ‘স্বৈরাচারী সরকার সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারকে অপসারণ করা হবে।’
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ