বিশেষ প্রতিবেদন :
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি এখন ভোতা অস্ত্র। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারীর একতরফা নির্বাচনের কথা জনগণ এখনো ভুলেছে বলে আমার মনে হয় না। ওই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্ণেল (অবঃ) ফারুকের দল ‘ফ্রিডম পার্টি’ ছাড়া আর কেউ ভোট করেনি। একই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সারাদেশে আন্দোলন করছে আওয়ামীলীগসহ দেশের সকল রাজনৈতিক দলগুলো। শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাশ করে ওই সংসদ বিলুপ্ত করা হয়। মাত্র ১১ দিন ওই সংসদের স্থায়িত্ব ছিল।
আজকে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনকে বিতর্কিত বলা হচ্ছে। কেন বলা হচ্ছে, ওই নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় এমপি নির্বাচিত হন। বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় ১৯৭৩ সালেও এমপি নির্বাচিত হওয়ার নজির আছে। ওই নির্বাচনে ড. কামাল হোসেন নিজেও বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় এমপি হয়েছিলেন। তাহলে তখন যদি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় এমপি নির্বাচিত হলে অসাংবিধানিক না হয়, এখন হবে কেন? ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে তো ২৫টি দল অংশ নিয়েছিল।
নির্বাচনে হারলে নিরপেক্ষ ভোট হয়নি, জিতলে ঠিক আছে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী বিএনপিকে নির্বাচনে জেতার গ্যারান্টি কে দিবে? বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কুমিল্লা, সিলেট, রংপুরসহ কয়েকটি সিটে যখন আওয়ামীলীগ জিততে পারেনি। তখন আর কারো মুখে ভোট নিয়ে অভিযোগ শোনা যায়নি। এখন অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আওয়ামীলীগকে সব নির্বাচনে নিজে নিজে হেরে গিয়ে বিরোধীদেরকে বোঝাতে হবে আমরা নিরপেক্ষ।
১ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের সাথে সংলাপে প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন ড. কামাল হোসেনের কাছে একজন ব্যক্তির নাম বলুন যিনি নির্দলীয় এবং নিরপেক্ষ। ড. কামাল হোসেন কারো নাম বলতে পারেননি। আগেই বলে রাখি, ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন নিরপেক্ষ কেবল পাগল আর শিশু ছাড়া আর কেউ হতে পারেনা। আসলে তখনকার প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার কথাটি সমর্থনযোগ্য না হলেও আসলে তিনি ঠিকই বলেছিলেন।
আজকের বাস্তবতায় আবারো নিরপেক্ষ সরকারের দাবি তোলা কতটা যৌক্তিক? পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে রানিং সরকারের আন্ডারেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের কাজে সরকারের কোন হস্তক্ষেপ করা হয়না। বিগত ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে যদি বিএনপিসহ তাদের জোট অংশগ্রহণ করতো এবং সে নির্বাচনে আওয়ামীলীগ তাদের প্রার্থী জেতানোর জন্য যদি নগ্নভাবে হস্তক্ষেপ করতো। তাহলে আজকে নিরপেক্ষ বা অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি উত্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হতো এবং জনগণ তা পুরোপুরি সমর্থন করতো। কিন্তু বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিশাল একটি জোট যখন ভোটে অংশ নেয়নি, সেক্ষেত্রে সব আসনে আওয়ামীলীগ দলীয় এমপি বা তাদের জোটের প্রার্থীরা বিনা বাঁধায় জিতবে এটাই স্বাভাবিক। এখানে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক চালে ভুল হয়েছে বলা যাবেনা। কারণ, রাজনীতি মানেই হচ্ছে চালাকি। চালাকিতে যারা এগিয়ে থাকবে, তারা নির্বাচনের ফসল ঘরে তুলবে এটাই বাস্তবতা।
ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির মধ্যে অনেকগুলো দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি দিতে হবে। কথা হচ্ছে, খালেদা জিয়া কী রাজবন্দি। তিনি তো রাজবন্দি নয়। তিনি দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। এবং এই মামলা আওয়ামীলীগ সরকার বা তার দল দেয়নি। তাহলে বেগম জিয়াকে আইনের মাধ্যমেই মুক্তির ফায়সালা করতে হবে।
বিরোধী জোট গতকালকের জনসভায় বর্তমান ৭ দফা না মানলে লংমার্চ, রোডমার্চসহ বিভিন্ন আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। একদিকে সংলাপ অন্যদিকে রাজশাহী অভিমুখে লংমার্চ কতটা যৌক্তিক? অবশ্য একদিকে আন্দোলন অপরদিকে সংলাপ এই রেওয়াজ আগেও ছিল। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতার দাবিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠির সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, এর মাঝে তিনি একদফা দাবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। এটা অবশ্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করে। কারণ, আলোচনা ব্যর্থ হলে আন্দোলনের পথ তো খোলাই রয়েছে।
তবে, স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে পাকিস্তানিদের সাথে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক এই অবস্থান যতটা যৌক্তিক ছিল এখনকার প্রেক্ষাপটে তা কতটা সমুচিন? এই প্রশ্ন তো থেকেই যায়। এখনকার দাবি হচ্ছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এখন কথা হচ্ছে, বিএনপি বা তার জোটকে এই নিশ্চয়তা কে দিবে যে, নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে এবং আপনারা জিতে সরকার গঠন করতে পারবেন। তাহলে বলতে হচ্ছে, বিএনপি জোটকে কী এমন নিশ্চয়তাই দিতে হবে যে আগামী নির্বাচনে আপনাদের জিতিয়ে দেওয়া হবে এবং আপনারাই ক্ষমতায় যাবেন। আন্দোলন বা তাদের দাবি যদি এটাই হয়ে থাকে, তাহলে পৃথিবীর এমন কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি নেই বিএনপিকে এমন নিশ্চয়তা দিতে পারবে। এক্ষেত্রে তাহলে আওয়ামীলীগ বা শেখ হাসিনাকে নিজে নিজে হেরে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে আমরা নিরপেক্ষ।
মো. আলী হোসেন-সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com