বিশেষ প্রতিবেদন :
আবারো ক্ষমতায় যাওয়ার দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আওয়ামীলীগ। গত ৮ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছেন সিইসি কে এম নুরুল হুদা। ২৩ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে এই তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে নির্বাচনী উৎসব মুখর পরিবেশ। এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি দলীয়ভাবে তাদের মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে। মনোনয়নপত্র সংগ্রহে এখন আওয়ামীলীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। একেকটি আসনে অন্ততপক্ষে ১১ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। দলীয় মনোনয়নপত্র ক্রয়ে উৎসব বিরাজ করলেও বাইরে অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
শনিবার রাজধানীর আদাবরে মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলাকালে গাড়ি চাপায় দুই কিশোর নিহত হয়। এ ঘটনায় রোববার স্থানীয় যুবলীগ নেতা আরিফুর রহমান তুহিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সামনের দিনগুলোতে মনোনয়ন প্রাপ্ত এবং মনোনয়ন বঞ্চিতদের মধ্যে আরো সংঘর্ষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামার আশঙ্কা রয়েছে।
এরই মধ্যে রোববার শেখ হাসিনার অধীনেই সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট, ইসলামী ১২টি দল, বাম জোট এবং এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট। এর মানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবশ্যই অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হবে এটা নিশ্চিত বলা যায়।
বিগত ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনে সরকারের স্থায়ীত্ব এবং নানা শঙ্কায় আওয়ামীলীগ বলতে গেলে প্রার্থী সংকটে ভোগে। বিএনপিবিহীন এই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ অনেককেই নমিনেশন দিতে চাইলেও তারা প্রার্থী হতে ইচ্ছা পোষণ করেনি। যার কারণে, বিদ্রোহী প্রার্থী মুক্ত পরিবেশে বিগত নির্বাচন আওয়ামীলীগ সঠিকভাবে সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। শেখ হাসিনার অধীনেই সব দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ এই নির্বাচনে আওয়ামীলীগ নিজেদের ঘর সামাল দিতে না পারলে এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারলে নির্বাচনী ফলাফল নিজেদের অনুকূলে ধরে রাখা হয়তো সম্ভব হবেনা।
এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট একমাস নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছে। এর আগে যুক্তফ্রন্টও নির্বাচন এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। এমন অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচন পেছানোর উদ্যোগ নেয় তাতে আওয়ামীলীগ আপত্তি জানাবেনা। তাতে বোঝা যায়, কোনো ধরণের রাজনৈতিক মতপ্রার্থক্য ছাড়াই আগামী নির্বাচন ভালোভাবে সম্পন্ন হবে। আশার কথা হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণায় সারাদেশে জনগণের মধ্যে যে শঙ্কা ছিল তার দূর হয়েছে। এখন পুরোদমে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ভোটার আমজনতাও তাদের ভোট প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে। জনগণের প্রত্যাশা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার গঠিত হবে, তারা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। তবে, এবারের নির্বাচনী পরিবেশ, রাজনৈতিক সমঝোতা যেদিকে এগুচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সংসদে সরকারি দল এবং বিরোধী দল দুইদিকেই মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল অবস্থান নিবে।
এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিচ্ছেন। তিনি চাচ্ছেন- সরকারি দল, বিরোধী দল উভয় দিকেই থাকবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তির আওয়াজ। কিন্তু শেখ হাসিনার এই চাওয়া পাওয়া নষ্ট করতে পারে দলীয় অতিউৎসাহী কর্মকান্ড। এমনিতেই টানা দশ বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পাওয়ায় আওয়ামীলীগে এখন সুযোগ সন্ধানীদের অভাব নেই। চলতি দুই মেয়াদে অনেক হাইব্রীড জায়গা করে নিয়েছে আওয়ামীলীগে। এক সময় ছাত্রলীগ, যুবলীগ করার জন্য বা কর্মী সৃষ্টি করার জন্য দিনের পর দিন বোঝাতে হতো। এখন তা করতে হয়না। সামাজিক এবং পারিবারিক নানা কারণে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে বা স্বার্থ হাসিল করার জন্য ছাত্রলীগ-যুবলীগে ঢুকে পড়েছে অনুপ্রবেশকারীরা। এরাই আসন্ন নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশৃঙ্খলা করতে পারে। এতে বিপদে পড়বে আওয়ামীলীগ। এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে তা সামাল দিতে অনেক বেগ পেতে হবে।
তবে, আওয়ামীলীগে তৃণমূল পর্যায়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীরও অভাব নেই। তারা যদি এসব বিশৃঙ্খলা এবং বিদ্রোহ দমনে ভূমিকা রাখেন, তাহলে তাদের দমন করা তেমন অসম্ভব কিছু নয়। আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিশাল বটবৃক্ষ। এই বটবৃক্ষের ছায়াতলে অনেকেই আশ্রয় নিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এই আশ্রয় নেওয়ার ক্ষেত্রে ছায়ার স্থানটি যেন আবর্জনায় ভরে না যায় সেদিকেই খেয়াল রাখতে হবে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের। যারা দলের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, তারা যদি নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি শতভাগ আস্থাশীল ও বিশ্বাসী হন। তাহলে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে সন্মান জানিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখবেন, এমনটাই প্রত্যাশা সকলের। না হলে বিদ্রোহী প্রার্থীরা হয়ে ওঠতে পারে আগামী নির্বাচনে আওয়ামীলীগের জয়ের পথে বড় প্রতিবন্ধক।
মো. আলী হোসেন-সাংবাদিক ও লেখক
ahossain640@gmail.com