আকাশবার্তা ডেস্ক :
*বিদেশিদের কথায় নির্বাচনে গিয়ে সংকটে বিএনপি *তারেকের ভুল নির্দেশনা পালন করেছে মিন্টু *আজ ঢাকায় আসছে ধানের শীষের প্রার্থীরা *নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপির ভিডিও নিয়ে ডকুমেন্ট *আন্দোলনে থাকবে তবে হরতাল-অবরোধ আপাতত নয় *পুনরায় নির্বাচন না হলে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব
নির্বাচনে বিএনপির লজ্জার হার। এর পেছনে দুটি কারণ চিহ্নিত করেছে দলটি। প্রথমত, ক্ষমতাসীনদের দখলে আনুষ্ঠানিকতার একটি নির্বাচন। দ্বিতীয়ত ঘরের শত্রু! বিএনপির নীতিনির্ধারকদের দাবি, ঘরের শত্রুর মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্টের মাস্টার প্ল্যান ফাঁস না হলে ৬০-৭০টি আসন পেয়ে শক্তিশালী বিরোধী দল হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেটিও মুজিব কন্যার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে ঐক্যফ্রন্টের স্বপ্ন নষ্ট হয়ে গেছে। এ জন্য কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে বিএনপিকে ভাবতে হচ্ছে। এখন ভুলগুলো পর্যবেক্ষণ করা এবং ঘরের শত্রুকে চিহ্নিত করা। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট সূত্র মতে, এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি হেরে গেলে ওই দিন থেকে টানা আন্দোলনে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত থেকেও হঠাৎ করে পিছু হটতে হয়েছে। এর পেছনে লন্ডনে থাকা তারেক জিয়ার ভূমিকাকে দোষারোপ করছে বিএনপির বড় একটি অংশ। বিদেশিদের কথায় নির্বাচনে অংশ নেয়ার মূল পরিকল্পনায় ছিলো তারেক জিয়া।
অবশেষে সেই বিদেশিরাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে দাবি করে এই সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পেছনে তারেকের নষ্ট চিন্তা ছিলো বলেও বিএনপির সিনিয়র নেতারা ধারণা করছেন। এ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে কিংবা প্রধান বিরোধী দল হলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্ব নিয়ে স্বচ্ছ রাজনীতির যে আওয়াজ উঠেছিলো সেটিকে অপছন্দের তালিকায় রেখেছিলেন তারেক জিয়া। কিংবা খালেদা জিয়া জেল থেকে বের হলে তারেকের নীতিনির্ধারণী জায়গাটাও নড়বড়ে হয়ে যেতো।
তাই সেই আশঙ্কা থেকে এই নির্বাচনের মূল প্ল্যান কি ছিলো, তা শুধুমাত্র তারেক জিয়া ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যন আবদুল আউয়াল মিন্টুই জানতেন বলে ঐক্যফ্রন্টের এক নীতিনির্ধারকের দাবি। তারেকের হয়ে মিন্টু বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ডিঙিয়ে অনেক কাজই করেছেন। যার ফলে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এছাড়াও ঐক্যফ্রন্ট গঠন, নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত কর্মকেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
ঐক্যফ্রন্ট গঠনের শুরুতে বাপ-বেটাকে অর্থাৎ বি. চৌধুরী ও মাহি বি. চৌধুরীকে বাদ দেয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিলো কিনা। এর কারণে পরাজয়ের প্রভাব ছিলো তার কোনো কারণ আছে কিনা। কিংবা এ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির আগ থেকেই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরীসহ অনেকেই মনোনয়ন বাণিজ্যের বড় চিন্তা ছিলো এমন অভিযোগের খবর গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু মির্জা ফখরুলের হস্তক্ষেপে ওঁতপেতে থাকা এই সিন্ডিকেট এবার বাণিজ্য করতে পারেনি। তাদের মাধ্যমে বিএনপির কোনো গোপন তথ্য ফাঁস হয়েছে কিনা তাও খোঁজা হচ্ছে।
এছাড়াও দীর্ঘদিন থেকে বিএনপিতে একটি কানাঘুষা রয়েছে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. মাহবুবুর রহমান, ভাইস চেয়ারম্যন ড. এমাজউদ্দিন আহমদসহ বহু সিনিয়রদের কার্যত মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। এদের নেতৃত্বের কারণে কোনো শূন্যতা ছিলো কিনা। এছাড়াও দলের প্রধান নেতা হিসেবে তারেক জিয়া তৃণমূল থেকে বিচ্ছিন্ন। এর কোনো কারণ থাকতে পারে কিনা পরাজয়ের পেছনে। আন্দোলন ঘোষণার আগে বিএনপি এ বিষয়গুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে এবং সামনের দিকে আগানোর পথ তৈরি করছে। বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচনের ৩-৪ দিন আগে নানান দিক বিচার-বিশ্লেষণ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ, মাহবুবুর রহমান, মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ বেশকিছু ভাইস চেয়ারম্যন ও কার্যনির্বাহী অনেক সদস্যই শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবে লন্ডন থেকে তারেক জিয়ার ভাষ্য ছিল ভোটবিপ্লব হলে কোনো অনিয়মই ধানের শীষের বিজয়কে ঠেকাতে পারবে না। অবশেষে কলঙ্কের নির্বাচনের পর তৃণমূল নেতাদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।
খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে কারাগারে যাওয়ার পর গভীর এ সংকটে ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে সুদিনে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিলো বিএনপি। একটা আন্দোলনের শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে সরকারের পতন হবে। কিন্তু সেটি না হয়ে বিএনপির চলমান গতিও নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হাইকমান্ডের ওপর। এ বিষয়ে যুবদল নেতা সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এ নির্বাচনে অংশ নেয়া উচিত হয়নি। নির্বাচনের তিন দিন আগেই কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচন বর্জনের ডাক দেয়া উচিত ছিল। তাহলে বিএনপিকে এ নাজুক পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। দলের এমন পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা চলছে বলে দাবি বিএনপির।
জানা যায়, তরুণ-প্রবীণদের সমন্বয়ে দল পুনর্গঠন করা হচ্ছে। যে সব ছাত্র নেতারা চৌকস আন্দোলন ও নেতৃত্বে যোগ্যতাসম্পন্ন তাদের বিএনপিতে খুব দ্রুতই সম্পৃক্ত করা হবে। যারা বয়সের ভারে নেতৃত্বে অক্ষম তাদের সম্মানের সঙ্গে পদ ছাড়তে উৎসাহ জোগানো হবে। আপাতত ধস হলেও হরতাল-অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচিতে যাবে না। তবে এ নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, অনিয়ম, কারচুপি, পোলিং এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, নির্বাচনি সহিংসতায় আহত ও নিহতদের তালিকা, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাবসহ তথ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রতিবেদক ও ডকুমেন্ট তৈরি করে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বরাবর জমা দেয়ার জন্য প্রার্থীদের কাছে জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় ধানের শীষের প্রার্থীদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে বলেও বিএনপি থেকে জানানো হয়েছে। সকাল ১০টায় গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বিএনপির একটি সূত্রের দাবি ধানের শীষ প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচন অভিমুখে ঘেরাও কর্মসূচিও হাতে রাখা হয়েছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে আমাদের নির্বাচনে নিয়ে ভোটের নামে নিষ্ঠুর প্রহসন করা হয়েছে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, একেবারে বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নজিরবিহীনভাবে একটা যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে ত্রাস-ভীতি সৃষ্টি করে এই নির্বাচনটি করা হয়েছে। ভোটের আগের দিন রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে জোটের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি দেবেন। এরপর নতুন কর্মসূচি দেয়া হবে। কোনোভাবেই ভোট ডাকাতির নির্বাচন মেনে নেয়া হবে না বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এবারের একতরফা নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে। নির্বাচনে প্রশাসনকে ক্ষমতায় আসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষ এই দুর্বিষহ পরিস্থিতির অবসান চায়। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে জনগণের প্রত্যাশাকে মূল্য দিতে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলব।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘নির্বাচনে বিএনপি মাত্র পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছে- এটা অবিশ্বাস্য।’ বিএনপি নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন,
‘এ মুহূর্তে কোনো হটকারী চিন্তাভাবনা ও কর্মসূচি গ্রহণ না করাই ভালো। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ মুহূর্তে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ‘বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন’ গঠনের দাবি তোলা যেতে পারে। নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছে, তা খতিয়ে দেখবে ওই কমিশন; যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। নির্বাচন নিয়ে যাতে কারো মনে কোনো প্রশ্ন না থাকে।’ বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিএনপির উচিত হবে তাদের কোনো ভুলত্রুটি থাকলে তা খুঁজে বের করে সংশোধন করা।
কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, ‘যখন স্বাভাবিক পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ হয় তখনই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। তাই দেশের ও মানুষের স্বার্থে এই নির্লজ্জ ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’