অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক :
চিকন চালের নাম এলে প্রথমেই যার নাম আসে তা হচ্ছে মিনিকেট। বাজারেও চলছে দেদার। বিক্রি দেখে মনে হয় সবচেয়ে বেশি উৎপাদন এ ধানেরই। সাধারণ মানুষ বাজার থেকে কিনছেও এ চাল। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশে মিনিকেট নামক কোনো ধানই চাষ হয় না। তাহলে কোথা থেকে আসে এ চাল। খোঁজ নিয়ে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। চালের বাজারে যে কয়েকটি আকর্ষণীয় চালের নাম রয়েছে তার মধ্যে মিনিকেট অন্যতম। উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের প্রথম পছন্দের তালিকায় রয়েছে এ চাল।
কিন্তু মিনিকেট নামে কি খাচ্ছে তারা নিজেরাও জানে না। হয়তো বা জানতে পারলে আর কোনোদিন কিনবেও না। যে ধান বাংলাদেশে চাষই হয় না তাহলে কোথা থেকে আসে এটাই এখন দেখার বিষয়। বাজারের এ চাল নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের বাজারে বিদ্যমান চালের মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থাৎ ৬ থেকে ৭.৫ পিপিএম জিংক মিলেছে মিনিকেট চালে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
অন্যদিকে শরীরের জন্য দরকারি পুষ্টি উপাদান জিংক ঘাটতিতে ভুগছে দেশের ৭৩ ভাগ নারী ও ৪১ ভাগ শিশু। হারভেস্ট প্লাস নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, তারা বাজারে বিভিন্ন প্রকার চালের জিং পরীক্ষা করতে গিয়ে মিনিকেট নামক চালে তারা ৬.৫ থেকে ৭.৫ পিপিএম পর্যন্ত জিংক পেয়েছেন।
মিনিকেট চাল কোথা থেকে উৎপাদন হয় এই অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, মিল মালিকরা মোটা চাল ছাঁটাই করে বানায় মিনিকেট চাল। আর ছাঁটাইয়ের সাথে সাথে কমতে থাকে জিংকের পরিমাণও। মিনিকেট চালের এক ছটাকও বাণিজ্যিক চাষ নেই এ দেশে। অথচ চিকন এই চালেই আগ্রহ বেশিরভাগ ভোক্তার। তাই জোগান ঠিক রাখতে ব্যবসায়ীদের ভরসা স্বয়ংক্রিয় চালকলে। যেখানে বিভিন্ন জাতের মোটা চাল ১৮-২০ ভাগ পর্যন্ত ছেঁটে বাজারে ছাড়া হয় মিনিকেট নামে। এতে নষ্ট হয় খনিজ উপাদান জিংক।
স্মৃতিশক্তি কমা, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগের কারণ জিংকের ঘাটতি। গবেষণার তথ্য বলছে, পুষ্টিচাহিদা পূরণে প্রতিকেজি চালে কমপক্ষে ১২ পিপিএম জিংক থাকার কথা হলেও মিনিকেটে আছে মাত্র ৬ দশমিক ৩৬ থেকে ৭.৫ পিপিএম। সবচেয়ে বেশি ১২ দশমিক ৯২ রয়েছে নাজিরশাইলে। কাটারিভোগে ১১ দশমিক ৩৯, ২৮ চালে ৯ দশমিক ৬৮, স্বর্ণায় ৮ দশমিক ৯, বাংলামতিতে ৭ দশমিক ৬২ আর অন্যান্য চালে জিংক রয়েছে গড়ে ১০ পিপিএম।
এ বিষয়ে হারভেস্ট প্লাসের কান্ট্রি ম্যানেজার ড. খায়রুল বাসার আমার সংবাদকে বলেন, আমরা জিংক নিয়ে গবেষণা করেছিলাম। তাই বাজার থেকে চালের স্যাম্পলিং সংগ্রহ করে আমরা দেখেছি যে, মিনিকেট নামক চালে ৭-৭.৫ পিপিএমের বেশি আমরা পায়নি। তিনি আরও বলেন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করলে গবেষণা করে কোনো লাভ নেই। তিনি বলেন, চালকে যত বেশি ছাঁটা হয় ততই জিংক কমতে থাকে, সুতরাং অতিরিক্ত পলিশ করা চাল খাওয়া ঠিক নয়। তবে এ ব্যাপারে কল মালিকদের সাথে কথা বললে তারা ভিন্ন কথা জানান।
তারা বলেন, এই ধান দেশের বগুড়া, নাটোর, নওগাঁ এলাকায় চাষ হয়। তারা সেখান থেকে এনে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেন। তবে কৃষিবিদরা তাদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করেননি। তারা বলেন, বাংলাদেশে এর চাষ হয় না। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, দেশের পাঁচ বছর বয়সি ৪১ শতাংশ শিশু আর বিভিন্ন বয়সি ৭৩ শতাংশ নারী এখনো ভুগছে জিংক স্বল্পতায়। এ ঘাটতি মেটাতে চাষ হচ্ছে উচ্চ জিংক সমৃদ্ধ ধান। কিন্তু সচেতনতার অভাবে প্রতিদিনের খাবার টেবিল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে জিংক। তাই চাল ছাঁটাইয়ে নীতিমালা চান সাধারণ মানুষ।
বিষয়টি সম্পর্কে মেসার্স স্বর্ণা রাইস মিলের মালিক আবদুস সামাদের সাথে কথা বললে তিনি জানান, নাটোর, নওগাঁ থেকে এ ধান কিনে প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করেন বলে জানান তারা। পরে তাকে বাংলাদেশে এ ধান চাষ হয়নি বলে জানিয়েছেন কৃষিবিদরা, এটা বলার পর উচ্চ বাক্যবিনিময় করে ফোন কেটে দেন।
অন্যদিকে এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললে তারা বিষয়টির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল আছেন জানিয়ে তারা বলেন, কিছু কুচক্রীমহল আছে তা করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে। তবে তারা জনসচেতনতা কামনা করেছেন। তারা মনে করেন, জনগণ না কিনলে মালিকরা কষ্ট ও খরচ করে প্রক্রিয়াজাত করবে না। ভবিষ্যতে এসব কুচক্রীমহল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তারা আশ্বাস দেন।
বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের দৈনিক ৮ পিপিএম জিংক দরকার। তাই কেবল চালের ওপর নির্ভর না করে, পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ পুষ্টিবিজ্ঞানীদের। তবে সাধারণ মানুষ মনে করেন, তারা এ সমস্ত ব্যাপারে খুব ভালো জানেন না। না জেনেই খাদ্য-অখাদ্য সব গ্রহণ করছেন। তারা মনে করেন, সরকার সক্রিয় ভূমিকা পালন করলে অসাধু ব্যবসায়ীরা কখনই খারাপ করার চিন্তা করবে না। সরকার জোরালোভাবে খাদ্যের ব্যাপারে ভূমিকা রাখবেন বলেও তারা আশা প্রকাশ করেন।