মঙ্গলবার ১৭ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৩রা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ফখরুলে খুশি ক্ষমতাসীনরা!

*নির্বাচনে অংশ নেয়া, ড. কামালকে নিয়ে ঐক্য গঠনে খালেদা-তারেককে ম্যানেজ 
*খালেদার কারা ভোগের এক বছরেও মুক্তি আন্দোলনে ব্যর্থ 
*২০১৩-১৪ সালে আন্দোলনের বিভিন্ন ইস্যুতে নীরব নাটের গুরু!
*কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দিয়ে এসেছেন বাম রাজনীতির স্লোগান
*এখনো ফিরতে পারেননি জাতীয়তাবাদে
*নরম সুরের রাজনীতিতে অনন্য! এ আচরণ বিএনপির জন্য হুমকি

আকাশবার্তা ডেস্ক :

বিএনপিতে এখন মির্জা আব্বাস-সাদেক হোসেন খোকাদের দৃশ্যত রাজনৈতিক ভূমিকা নেই! রাজনীতিতে আর বিচক্ষণতা নেই মওদুদ আহমদের। শেষ রাতে গয়েশ্বরদের কূটনৈতিক সফলতা নেই। স্থায়ী কমিটির নেতা মোশাররফ হোসেন-নজরুল ইসলামদের ভূমিকা অদৃশ্য! আবাসিক নেতা রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে নেই শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়। খায়রুল কবীর খোকন, আসাদুজ্জামান রিপন, আমান উল্লাহ আমান, ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, শফিউল বারী বাবু, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, জয়নুল আবেদীন, হাবিব-উন-নবী সোহেলরাও দীর্ঘ সময় মাঠের খেলায় দক্ষতা দেখাতে পারেননি। তৃণমূলেও মরিচা ধরেছে। বিএনপির ঘরে-বাইরে অশান্তি।

নেতৃত্বের অভাব, বিশ্বাসের ঘরে চলছে মীরজাফরী চরিত্র। এর পেছনে একজন সরল মির্জা ফখরুল ইসলামের ভূমিকা রয়েছে বলে দাবি উঠেছে বিএনপির বড় একটি অংশ থেকে। তাদের দাবি, দলের মহাসচিব ছাত্রজীবন থেকেই করে এসেছে বাম রাজনীতি। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দিয়ে এসেছে ঐক্য-শান্তি-প্রগতি নিয়ে বাম রাজনীতির স্লোগান। সেই ফখরুল তারেক জিয়ার পরামর্শে ও খালেদা জিয়ার আশীর্বাদে হুট করেই হয়ে যান বিএনপির নীতিনির্ধারক। বিএনপির আদর্শ সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে জনগণের আর্থ-সামজিক উন্নয়ন। জনগণের কল্যাণে সরকারের কাছে যৌক্তিক দাবি তুলে ধরে এবং সেই দাবির বাস্তবায়নে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করে বিরোধীদলের ভূমিকা পালনে বিএনপি যে অনেকটাই ব্যর্থ তা এখন স্পষ্ট।

দলের মহাসচিব হিসেবে মির্জা আলমগীর তা বাস্তবায়নে কী ভূমিকা পালন করেছেন সে প্রশ্ন ইতোমধ্যেই উঠেছে। নানা কারণে দলটি কার্যত অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। তবে মির্জা আলমগীরের মার্জিত কথাবার্তা তাকে জনগণের একটি অংশের কাছে অনন্য গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের কাছেও তিনি পছন্দের মানুষ। এটা ব্যক্তি ফখরুলের জন্য গৌরব হলেও দলের জন্য হুমকি বলেও মনে করছেন বিএনপির একটি অংশ।

বিএনপি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, বরকত উল্লাহ বুলু, যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বড় একটি অংশ নির্বাচনে যেতে ইচ্ছুক ছিলেন না। শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এবার শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া মানে এই সরকারকে বৈধতা দেয়া। কিন্তু নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

ড. কামালদের বিএনপির সংসারে এনে করা হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আর এর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল বিএনপি মহাসচিবের। অবশ্য তখনই বিএনপির বড় একটি অংশ দাবি করেছিল ঐক্য গঠন না করে ২০ দলকে সক্রিয় করার জন্য। কিন্তু সে দাবি বিএনপি মহাসচিব কানে নেননি। নির্বাচন ও খালেদার মুক্তি ইস্যু নিয়ে যখন সরকারকে দমিয়ে দেয়ার সুযোগ এসেছিল, ঠিক তখন শুরু হয় ড. কামালকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপির সমাবেশে সুলতান মনসুর এক হাতে ধানের শীষ আর গাঁয়ে মুজিব কোট পরে জয় বাংলা স্লোগান দিচ্ছেন, ড. কামাল বঙ্গবন্ধুর গুণগান করছেন, কাদের সিদ্দিকী নির্দেশ দেন যাতে নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা মহাসচিবকে মানেন! আর যদি না মানেন তাহলে বিএনপির কপালে আরও দুর্গতি আছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে যখন একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা চলছে অথচ বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে নামতে পারছে না, দেশব্যাপী প্রার্থীদের ওপর হামলা চলছে, রক্তাক্ত হচ্ছেন গয়েশ্বররা, তখন মহাসচিব বারবার ছুটে যাচ্ছেন কারাগারে! বন্দি খালেদা জিয়াকে বোঝাতে।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে গেলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাবে, সেনাবাহিনী মাঠে নামলে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হয়ে যাবে, জনগণ ভোটকেন্দ্রে ছুটে যাবে। ভোট বিপ্লব হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে।

অবশেষে ফখরুল খালেদা জিয়াকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শুধু এক ফখরুলের ভূমিকার কারণে বিএনপিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে দলের বড় একটি অংশ। দলের একাধিক শীর্ষ নেতার অভিযোগ- ফখরুলের শান্তি-প্রগতির বাম রাজনীতির আদর্শের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনেক কিছুই মিলছে না। নেতাকর্মীরা ভরসা করতে পারছেন না তার তার ওপর।

তাদের অভিযোগ, ২০১৩-১৪-র আন্দোলন, বিডিয়ার বিদ্রোহ থেকে ব্যাংক লুট, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কিশোর আন্দোলন, এমন ইস্যুগুলোতে নীরব থাকার নাটেরগুরু ছিলেন ফখরুল! ২০১৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া দেশ অচল আন্দোলনে নির্দেশ দিলেও মহাসচিবের পরামর্শে পিছু হটতে বাধ্য হন! বিডিআর বিদ্রোহ, শেয়ার বাজার ও ব্যাংক লুটসহ বিভিন্ন জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে শক্তিশালী শক্ত ভূমিকা রাখলে আজ বিএনপির এমন পরিস্থিতি হতো না বলে মনে করছে বিএনপির একটি অংশ।

বিএনপির আজকের এই অবস্থার জন্য জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে নীরব ভূমিকাকেই দায়ী করছেন মাঠপর্যায়ের নেতারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে পুরান ঢাকার বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকলেও আন্দোলনের মাঠ ছাড়েনি। নদীর ওপারের হাজার হাজার লোক এই পুরান ঢাকায় অবস্থান করে আন্দোলন করেছে। বিরোধী দলে থাকলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তখন চাঙ্গা ছিল। কিন্তু এখন বিএনপি নীরব। খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুতেও বিএনপি কোনো আন্দোলনের ডাক দেয় না।

শুধু প্রেসক্লাবের সামনে কয়েকজন নেতাকর্মী মিলে মানববন্ধন করে দায়সারা কর্মসূচি পালন করেন। তবে সমপ্রতি ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। দলের মহাসচিবের কাছে বিএনপির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যে আন্দোলনের জন্য কথা বলছেন। জবাব চাইছেন।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ, গয়েশ্বর, মঈন খান, আমির খসরু, আব্বাসরা আন্দোলন চাচ্ছেন। কিন্তু এখনো ফখরুলের ভিন্ন সূর।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আমরা খালেদা জিয়াকে আইনিভাবে মুক্ত করতে চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। আন্দোলন ছাড়া অন্য আর কোনো মাধ্যম নেই তাকে মুক্ত করার। তিনি বলেন, সরকার চাচ্ছে খালেদা জিয়া যাতে বিএনপির নেতৃত্ব না দিতে পারে। আন্দোলন ছাড়া খালেদা জিয়া মুক্ত হবে- বিশ্বাস করেন না মওদুদ। এ জন্য রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, খালেদা আর ওবায়দুল কাদের এক নয়। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে মেরে ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তার চিকিৎসার দাবিতে আজকাল আমাদের মানববন্ধন করতে হচ্ছে, এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু হতে পারে না। এখন তার মুক্তির আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ নেই। মঈন খান বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, অধিকার কেউ দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হবে। জেলের তালা ভেঙে খালেদাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা রাজপথে না নামলে জনগণ নামবে না। রাজনৈতিক দল আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকলেই জনগণ নামবে।

তবে অবশ্যই জনগণের দাবি নিয়েই আমাদের আন্দোলন করতে হবে। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে বিএনপির নেতাকর্মী নেই। এসব নেতাকর্মীকে উজ্জীবিত রাখতে আন্দোলন প্রয়োজন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম হাবিব সেলিম বলেন, বিএনপির এখন একমাত্র কর্মসূচি খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক জিয়াকে পূর্ণ মর্যাদায় দেশে ফিরিয়ে আনা। দলের শীর্ষ ব্যক্তিদের এমন দাবির প্রেক্ষিতেও বিএনপি মহাসচিবের ভিন্ন সুর।

সম্প্রতি দুটি অনুষ্ঠানে মহাসচিব বলেন, বিএনপি আবার জেগে উঠবে! দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হলে আগে সংগঠনকে শক্তিশালী করে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মির্জা ফখরুলের নরম সুরে দলের মধ্য থেকে প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপি জাগবে কেন? তাহলে কী বিএনপি এখন ঘুমিয়ে আছে?

আর বিএনপিকে নতুন করে শক্তিশালী করতে হবে কেন? বিএনপি বাংলাদেশের পুরনো রাজনৈতিক দল, এ দলকে জাগানো বা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার কোনো বিষয় আছে বলে মনে করছেন না অনেকে।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১