স্পোর্টস ডেস্ক :
আট-আটটি ম্যাচের অপেক্ষার পর অবশেষে নবম ম্যাচে এসে হাতে ধরা দিলো সোনার হরিণ। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সামনে ভারত ছিল যেন অজেয় একটি দলের নাম।দুঃস্বপ্নেরও শেষ আছে! অন্ধকার শেষে এক সময় আলো দেখা মিলবেই। মিলেছেও! ভারতের সঙ্গে এত ম্যাচ মানেই ছিল তীরে এসে তরী ডোবার গল্প।
গত কয়েক বছর ধরেই শেষ ওভারের রোমাঞ্চে আক্ষেপ পুড়তে পুড়তে মাঠ ছেড়ে বাংলাদেশ দল। কিন্তু এবার নির্ভার ক্রিকেটের জয়গান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের দিল্লি জয়! যখন কিছু হারানোর নেই, যখন দলের দুই সেরা তারকা সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল মাঠের বাইরে, তখনই রূপকথা জন্ম নিলো। দিল্লির অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে লেখা হলো নতুন এক ইতিহাস!
টানা আটবার হারের পর ভারতের বিপক্ষে ২০ ওভারের ক্রিকেটে ধরা দিলো গৌরবের এক জয়। এ জয়ে টাইগারদের অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশ। সিরিজের প্রথম ম্যাচে টাইগাররা জিতল ৭ উইকেটে! স্বস্তি এটাই আরেকটি দুঃখগাথাঁ আর লিখতে হলো না! অরুন জেটলি স্টেডিয়ামে যেন শ্মশানের নীরবতা! ৩০ হাজার দর্শকের মাঠে কান পাতলে যেন পিন পতনের শব্দটাও শোনা যাবে!
ইতিহাসের এক হাজারতম টি-টোয়েন্টিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারত ২০ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে তুলে ১৪৮ রান। জবাবে নেমে বায়ুদূষণ আর ভারতের পেস-স্পিন উড়িয়ে ১৯.৩ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে স্বপ্নের এক জয়ের দেখা পেয়ে যায় লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
সেই দলটিকে তাদেরই মাটিতে সাকিব-তামিম ছাড়াই হারিয়ে দিলো বাংলাদেশ। দিল্লির অরুন জেটলি (সাবেক ফিরোজ শাহ কোটলা) স্টেডিয়ামে রোহিত শর্মার দলকে ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে জয়ের সূচনা করলো বাংলাদেশ।
দিল্লির ‘ভয়াবহ’ বায়ুদূষণে ভারত ও বাংলাদেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি শঙ্কায় পড়েছিল। বৃষ্টি হওয়ার পর দুপুর থেকে ধোঁয়া ও কুয়াশায় ছেয়ে যায় অরুন জেটলি স্টেডিয়ামের আশপাশের এলাকা। ভারতের ক্রিকেট সমর্থকরা ম্যাচটি বাতিলের দাবি জানান। তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে মাঠে গড়ায় ছেলেদের ক্রিকেটে ১০০০তম আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ।
শেষ দুই ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ২২ রান বোলিংয়ে খলিল আহমেদ। প্রথম বলে মুশফিক নেন ১ রান, পরের বলে রিয়াদ নেন ১। যদিও রানটি ব্যাট থেকে আসেনি। এরপর মুশফিক যা করলেন তা এক কথায় অসাধারণ। পরপর চারটি বাউন্ডারিতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের করে নেয়। এরপর ইনিংসের শেষ ওভারের টাইগারদের দরকার ৪ রান।
অধিনায়ক রোহিত নিয়মিত বোলার দীপক চাহারকে না এনে অভিষিক্ত শিভাম ডুবেকে আনেন। প্রথম বল ডট দিলেও দ্বিতীয় বলে দুই রান নেন মাহমুদউল্লাহ। এর পরের বলটি ওয়াইড। স্কোর লেভেল। তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ভারতের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।
১৪৯ রানের জবাবে ব্যাট করতে নেমেই শুরুতে লিটনকে হারিয়ে ফেলে বাংলাদেশ। ইনিংসের প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে দীপক চাহারকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে রাহুলের হাতে ধরা পরেন বাংলাদেশি ওপেনার। তবে অভিষিক্ত মোহাম্মদ নাইম দারুণ সঙ্গ দেয় সৌম্য সরকারকে। অষ্টম ওভারে যুজবেন্দ চাহালের বলে ফেরার আগে দুই চার ও এক ছক্কায় করেন ২৬ রান। সবচেয়ে মূল্যবান হলো ৪৬ রানের পার্টনারশিপে দলের জয়ের ভিত গড়তে সক্ষম হয়।
এরপর সৌম্যর লড়াইয়ে সঙ্গী মুশফিকুর রহিম। তবে ইনিংসের ১৭তম ওভারের শেষ বলে সৌম্য ফিরে যান। তবে ফেরার আগে করেন ৩৯ রান। ৩৫ বলে দুই ছক্কা ও এক চারে এ রান করেন সৌম্য।
সৌম্যর বিদায়ের ধাক্কা বাংলাদেশ কাটিয়ে ওঠে মুশফিকের ব্যাটিংয়ে। শেষ ৩ ওভারে ৩৫ রান দরকার ছিল তাদের। ১৮তম ওভারের তৃতীয় বলে মুশফিক জীবন পাওয়াই ছিল ম্যাচের মোমেন্টাম। ৩৯ রানে ডিপ মিড উইকেটে ক্রুনাল পান্ডিয়ার হাতে জীবন পান তিনি। চাহালের ওই ওভারে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যানের বল হাতে রাখতে পারেননি পান্ডিয়া, হয় বাউন্ডারি। শেষ বলে মাহমুদউল্লাহ চার মেরে ব্যবধান কমান।
এরপর বাকি কাজটি সারেন মুশফিক-রিয়াদ। জয়সূচক রান রিয়াদের ব্যাট থেকে আসলেও ম্যাচের নায়ক মুশফিক করেন মহামূল্যবান ৬০ রান। ৭ বলে ১টি করে চার ও ছয়ে ১৫ রানে খেলছিলেন মাহমুদউল্লাহ। আট চার ও এক ছক্কায় এ রান করেন মি. ডিপেন্ডেবল। ভারতের হয়ে দীপক চাহার, যুজবেন্দ চাহাল ও খলিল আহমেদ নেন ১টি করে উইকেট।
এর আগে দিল্লিতে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ভারতের বিপক্ষে টস জিতে ফিল্ডিং নেয় বাংলাদেশ। মাহমুদউল্লাহর এই সিদ্ধান্তে সুফল পায় সফরকারীরা। ৬ উইকেটে ১৪৮ রানে ভারতকে থামিয়েছে বাংলাদেশ। ১৪৯ রানের টার্গেট তাদের। এই ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় বাংলাদেশের মোহাম্মদ নাঈম ও ভারতের শিবম দুবে।
প্রথম ওভারে দুটি চারে দারুণ শুরুর ইঙ্গিত দেন রোহিত শর্মা। তবে শেষ বলে তাকে এলবিডাব্লিউ করেন শফিউল ইসলাম। ভারতীয় অধিনায়ক রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি। ৫ বলে ৯ রান করেন তিনি। শফিউলের প্রথম ও পঞ্চম বলে চার মারার পরই আউট হন রোহিত।
পাওয়ার প্লেতে ১ উইকেটে ৩৫ রান করে ভারত। পরের ওভারে বল হাতে নেন আমিনুল ইসলাম। এই ডানহাতি স্পিনার তার তৃতীয় বলে লোকেশ রাহুলের উইকেট তুলে নেন। ১৭ বলে ১৫ রান করে শট কভারে মাহমুদউল্লাহর সহজ ক্যাচ হন রাহুল। আমিনুলের বলে তৃতীয় উইকেটের পতন হয় ভারতের। নিজের দ্বিতীয় শিকার তিনি বানান শ্রেয়াস আইয়ারকে। বাংলাদেশি স্পিনারের আগের ওভারে ছক্কা মারা ভারতীয় ব্যাটসম্যান লম্বা শট খেলেন।
কিন্তু লং অফে মোহাম্মদ নাঈম সহজে ক্যাচ ধরেন তার। ১৩ বলে ১ চার ও ২ ছয়ে ২২ রান করেন আইয়ার। ভারতের টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় প্রতিরোধ গড়েছিলেন শিখর ধাওয়ান। ফিফটি থেকে কয়েকটি রান দূরে ছিলেন তিনি। কিন্তু মাহমুদউল্লাহর প্রথম ওভারে তিনি বিদায় নিলেন রান আউট হয়ে। ৪২ বলে ৩ চার ও ১ ছয়ে ৪১ রান করেন ভারতীয় ওপেনার। ঋষভ পান্ত দ্বিতীয় উইকেট নেয়ার ডাক দিলে ধাওয়ান দৌড় দেন।
কিন্তু পান্ত মন পাল্টানোয় ভারতীয় ওপেনার আবার ব্যাটিং প্রান্তে ফিরে যাওয়ার আগেই মুশফিকুর রহিম তার স্টাম্প ভেঙে দেন। দুবের আন্তর্জাতিক অভিষেক ভালো হয়নি। মাত্র ৪ বল খেলে বিদায় নেন তিনি। ১ রান করে আফিফ হোসেনকে ফিরতি ক্যাচ তুলে দেন দুবে। এক হাতে দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেন বাংলাদেশি বোলার।
শফিউল তার শেষ ওভারে ঋষভ পান্তকে নাঈমের ক্যাচ বানান। ২৬ বলে ৩ চারে ২৭ রান করেন পান্ত। শেষ দিকে ওয়াশিংটন সুন্দরের ২ ছয়ে স্কোর একটু বাড়িয়ে নেয় স্বাগতিকরা। শেষ বলে পান্ডিয়া ৬ মারেন। তাতে ১৪৮ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোর করে ভারত। শফিউল ও আমিনুল সর্বোচ্চ দুটি করে উইকেট নেন।
সংক্ষিপ্ত স্কোর :
ভারত: ২০ ওভারে ১৪৮/৬ (ধাওয়ান ৪১, রোহিত ৯, রাহুল ১৫, শ্রেয়াস ২২, পান্ত ২৭, দুবে ১, পান্ডিয়া ১৫*, সুন্দর ১৪*; শফিউল ৪-০-৩৬-২, আল আমিন ৪-০-২৭-০, মুস্তাফিজ ২-০-১৫-০, আমিনুল ৩-০-২২-২, সৌম্য ২-০-১৬-০, আফিফ ২-০-১৫-০, মোসাদ্দেক ১-০-৮-০, মাহমুদউল্লাহ ১-০-১০-০)
বাংলাদেশ: ১৯.৩ ওভারে ১৫৪/৩ (লিটন ৭, নাঈম ২৬, সৌম্য ৩৯, মুশফিক ৬০*, মাহমুদউল্লাহ ১৫*; চাহার ৩-০-২৪-১, সুন্দর ৪-০-২৫-০, খলিল ৪-০-৩৭-১, চেহেল ৪-০-২৪-১ , পান্ডিয়া ৪-০-৩২-০, দুবে ০.৩-০-৯-০ )।
ম্যাচ সেরা : মুশফিকুর রহিম
ফল : বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী