আকাশবার্তা ডেস্ক :
রাজধানী ঢাকা। দেশের অর্থনৈতিক চালিকার মূলকেন্দ্র। অর্থনীতির সঙ্গে রাজনীতিরও মূলকেন্দ্র ঢাকা। রাষ্ট্রের ক্ষমতাবদলে ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ বা নিজেদের আয়ত্তে আনা গেলেই ক্ষমতা খুব কাছে চলে আসে। আর এ কারণে সব রাজনৈতিক দলের মূল টার্গেট থাকে রাজধানী ঢাকা।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রতিটি ঘরের দোরগোড়ায় নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করে দুটি আলাদা কর্পোরেশন গঠন করে।
এরপর ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশন দুটিতেই জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। জয়ের এ ধারাবাহিকতা আগামী ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনেও নিশ্চিত করতে চায় দলটির হাইকমান্ড।
তথ্য মতে, দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় দুই সিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়েছে দলটি। বিএনপির প্রার্থীদের নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ তাদের মিত্ররা।
এছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও বিএনপির প্রার্থীদের গোপনে সমর্থন দিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র মতে, সিটি ভোটে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর তৎপরতা মাথায় রেখেই নির্বাচনি হিসাব কষছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন দলটি। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর দুই সিটির নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে চায় দলটি। এ জন্যই দলের সব স্তরের নেতা-কর্মীদের এই নির্বাচনে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইতোমধ্যে দুই সিটিতেই মেয়র পদে একক প্রার্থী নিশ্চিত করেছে দলটি। এর মধ্যে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে আ.লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম আর দক্ষিণে পেয়েছেন ঢাকা-১০ আসনের সাংসদ ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। মেয়র পদে কেউ বিদ্রোহী না হলেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাউন্সিলর পদ।
দলীয়ভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক প্রার্থী মাঠে রয়েছে। এসব প্রার্থী প্রতিপক্ষকে বাদ রেখে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু করেছে। যার প্রভাব কাউন্সিলরসহ মেয়র পদের প্রার্থীর ভোটের হিসাবে পড়বে বলে মনে করছে সিনিয়র নেতারা।
সূত্র আরও জানান, গত শনিবার রাতে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ঐ বৈঠকে দায়িত্বশীল নেতাদের প্রতিটি ওয়ার্ডে দলীয় একক প্রার্থী নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এরপরও যারা দলের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বিদ্রোহী হিসেবে যারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের সরে দাঁড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা পরামর্শ দিতে শুরু করেছেন। আগামী ৯ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনের মধ্যেই বিদ্রোহীদের সরে যেতে বলা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য জানান, দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে দলের নেতাকর্মীদের ভোটারের ঘরে ঘরে যাবার নির্দেশ সভানেত্রী। প্রতিটি ওয়ার্ড, মহল্লায় পথসভা করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে জনমত গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ৩ জানুয়ারি দলের নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ঘিরে দলের সিনিয়র নেতাদের সমন্বয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়।
এর মধ্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) জন্য উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্ব দুটি আলাদ টিম গঠন করা হয়।
গতকাল রোববার গুলিস্তান ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন মেয়র প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসকে জয়ী করতে দলের সহযোগী সংগঠন ও মহানগর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলসহ মহানগরের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে সব সংগঠনের ইউনিট নেতাদের মাঠে নামার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রচারণায় সরকারের গত ১১ বছরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের হিংসাত্মক রাজনীতি, বিশেষ করে- ২০০১ পরবর্তী এবং ২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালের সময়কার আগুনসন্ত্রাসের চিত্র প্রতিটি ভোটারের কাছে তুলে ধরতে বলা হয়েছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, দল কোনো বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন বা নির্বাচন করার সুযোগ দেবে না। দলীয় নেতাকর্মীদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এরপরও যারা বিদ্রোহ করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিকালে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ডিএসসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পৃথক আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভার সভাপতি আমির হোসেন আমু বলেন, প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড এবং পাড়া-মহল্লায় কমিটি করে কাজ করতে হবে। প্রতিটি কমিটিকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তাপস একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ। তিনি ঢাকা-১০ আসনের মানুষের ভালোবাসায় তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। আমাদের ঢাকাকে আধুনিক রূপে সাজাতে হলে তাকেই প্রয়োজন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে ছোট মনে করা যাবে না।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন ৯ জানুয়ারি। প্রতীক বরাদ্দ হবে ১০ জানুয়ারি। ভোটগ্রহণ হবে ৩০ জানুয়ারি।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দুই সিটিতে ৭ জন করে ১৪ জন মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর সবমিলিয়ে ১ হাজার ৩০টি মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে।