রবিবার ১৫ই মার্চ, ২০২৬ ইং ১লা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাপিয়ার অঢেল সম্পত্তির সন্ধান

আকাশবার্তা ডেস্ক :

বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট। কোটি টাকার প্লট। নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বিদেশি পিস্তল। নগদ টাকা। কী নেই তার? সবই আছে। আছে বিশেষ ধরনের ব্যবসা। রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বিশেষ নেটওয়ার্ক। তিনি নিজেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুব মহিলা লীগের একটি জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী। তিনি শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক। আর এই পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।

আজ তিনি টক অব দ্য কান্ট্রি। নানা অপকর্মের পর র‌্যাবের জালে বন্দি হয়েছেন তিনি। গত শনিবার নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ ও তার স্বামী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমনকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পেয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব বলছে, আটককৃতদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের নামে বুকিং করা ওয়েস্টিন হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ও ফার্মগেট এলাকার বিলাসবহুল দুটি ফ্ল্যাট থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা, বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ মদ উদ্ধার করা হয়েছে। আরো মিলেছে নরসিংদীতে থাকা কোটি টাকা মূল্যের দুটি প্লট ও বিলাসবহুল গাড়ির সন্ধান।

র‌্যাব জানায়, পাপিয়ার রয়েছে কিউএন্ডসি নামে একটি ক্যাডার বাহিনী। যাদের মাধ্যমে তারা নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, মাসোহারা আদায়, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তারসহ সব ধরনের অন্যায় কাজ করে আসছিল।

পাপিয়া ও তার স্বামীসহ আটক আরো দুজনকে গতকাল রবিবার রাতে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়াও তাদের বিরুদ্ধে শেরেবাংলা নগর থানায় মানিলন্ডারিং আইনে মামলার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

গতকাল রবিবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল শাফি উল্লাহ বুলবুল জানান, গ্রেপ্তারকৃত শামিমা নূর পাপিয়া ও সুমন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজ (গতকাল) রবিবার ভোরে ওয়েস্টিনে তাদের নামে বুকিংকৃত বিলাসবহুল প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ও ফার্মগেট এলাকার ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডের বিলাসবহুল রওশনস ডমিনো রিলিভো ভবনের দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। সে সময় ওইসব জায়গা থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৫ বোতল দামি বিদেশি মদ ও নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা ও এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট পেশা না থাকা সত্ত্বেও তারা স্বল্পসময়ে বিপুল সম্পত্তি ও অর্থ বিত্তের মালিক হয়েছে। তেজগাঁও এফডিসি গেট সংলগ্ন এলাকায় কার একচেঞ্জ নামক গাড়ির শোরুমে প্রায় ১ কোটি টাকা ও নরসিংদী জেলায় কেএমসি কার ওয়াস এন্ড অটো সলিউশন নামের প্রতিষ্ঠানে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ আছে তাদের। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের নামে-বেনামে অনেক একাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত আছে। এ ব্যাপারে র‌্যাবের অনুসন্ধান অব্যাহত আছে।

তিনি বলেন, অনুসন্ধানকালে গ্রেপ্তার হওয়াদের অধিকাংশ সময় রাজধানীর বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করতে দেখা যায়। সবশেষ গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে এ বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তারা বিভিন্ন মেয়াদে মোট ৫৯ দিন হোটেল ওয়েস্টিনের কয়েকটি বিলাসবহুল রুমে অবস্থান করে ও আনুষঙ্গিক খরচসহ সর্বমোট ৮১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ টাকা নগদ পরিশোধ করে। তাদের এই বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রকৃত উৎস জানাতে পারেনি।

তিনি আরো বলেন, পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন চৌধুরী নরসিংদী এলাকায় অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, চাকরি দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণা, জমির দালালি, সিএনজি পাম্পের লাইসেন্স প্রদান, গ্যাস লাইন সংযোগের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে।

তাদের আয়ের আরেকটি উৎস হচ্ছে নারীদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজ করানো। তারা ঢাকার বিভিন্ন বিলাসবহুল হোটেলে অবস্থান করে কম বয়সী মেয়েদের দিয়ে জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে বাধ্য করে। যাদের অধিকাংশকেই নরসিংদী এলাকা থেকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এসব অনৈতিক কাজে কেউ অস্বীকৃতি জানালে তাদের বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। এদের মধ্যে একজনকে পিটিয়ে হাড়ও ভেঙে দেয় পাপিয়া।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাল মুদ্রা রাখা, অর্থ পাচার ও অবৈধ পিস্তল রাখার অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এছাড়া মানিলন্ডারিংয়ের বিষয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ মামলা করবে।

এদিকে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও এলাকাবাসী জানান, ২০০০ সালের দিকে নরসিংদী শহর ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক মফিজুর রহমান চৌধুরী সুমনের উত্থান শুরু। শৈশব থেকেই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ব্লু্কমেইল ছিল সুমনের প্রধান পেশা। দূরদর্শী চতুর ও মাস্টারমাইন্ড সুমন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। ২০০১ সালে পৌরসভার কমিশনার মানিক মিয়াকে যাত্রা প্যান্ডেলে গিয়ে হত্যার পর তিনি আলোচনায় আসেন। এরই মধ্যে পাপিয়া চৌধুরীকে বিয়ে করেন সুমন।

এরপর তার স্ত্রী পাপিয়াকে রাজনীতিতে কাজে লাগান। প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর দুর্বৃত্তায়ন রোধকল্পে বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান সন্ত্রাসী সুমন ও তার স্ত্রী পাপিয়া চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে আসতে নিষেধ করেন। পরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিভাজনকে কেন্দ্র করে পাপিয়া চৌধুরী ও তার স্বামী সুমন সদর আসনের এমপি লে. কর্নেল (অব.) মো. নজরুল ইসলামের (বীর প্রতীক) বলয়ে যোগ দেয়। পাশাপাশি তাদের ঢাকা সংরক্ষিত আসনের মহিলা এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে।

সূত্র : ভোরের কাগজ।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১