বৃহস্পতিবার ১২ই মার্চ, ২০২৬ ইং ২৮শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

লাগামহীন অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম

আকাশবার্তা ডেস্ক :

*শরীরে অক্সিজেন ৯০ শতাংশের নিচে থাকলে বাড়তি অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে
*নেই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও র্যাবের অভিযান
*চাহিদা বাড়ায় অক্সিজেনের দাম দ্বিগুণ থেকে পাঁচগুণ

করোনা পরিস্থিতিতে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি— দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। নানা অজুহাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম।

ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছেন দোকানিরা। এতে অনেকটাই দিশাহারা মানুষ। গত দুই মাস ধরেই অক্সিজেন সিলিন্ডারের বাজার ঊর্ধ্বমুখী।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র্যাবের অভিযান নেই তেমন একটা। চাহিদা থাকার কারণে সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ-চারগুণ দাম আদায় করছে অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

মানবদেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ তখনই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যখন তা শ্বাসতন্ত্রে করোনা জীবাণু ঢোকে। এতে শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় অনেকেরই দরকার হয় কৃত্রিম অক্সিজেনের।

বেশির ভাগ হাসপাতালেই নেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা। তাই নির্ভর করতে হচ্ছে সিলিন্ডারের ওপর। অনেকেই পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবেও তা মজুদ করছেন বাসাবাড়িতে।

ফলে বাড়তি চাহিদার সুযোগে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দামও বাড়াতে ভুল করেননি ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর মেডিকেল সরঞ্জামাদির বাজারে দেখা গেলো, করোনা সংক্রমণের আগে যে সিলিন্ডার বিক্রি হতো ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়; তার দাম এখন তিনগুণ বেশি। অক্সিমিটার, নল— এসবের দামও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে।

প্রায় পাঁচগুণ দাম বেড়ে মাঝারি মানের একটি অক্সিজেনের সিলিন্ডার এবং বেড়েছে আনুষঙ্গিক সরঞ্জামের দামও। করোনা ভাইরাসের আগে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সেট পাওয়া যেতো ছয় হাজার টাকায়।

সাধারণ রোগীর শরীরে অক্সিজেনের উপস্থিতি ৯০ শতাংশের নিচে নামতে শুরু করলেই অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ে। পালস অক্সিমিটার নামে একটি সহজ ডিভাইসের মাধ্যমে অক্সিজেনের শতকরা উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়।

অক্সিজেন যদি ৮০ শতাংশ বা এর আশপাশে থাকে তখন বাসায় রেখে অক্সিজেন দিয়েও সংকট মোকাবিলা করা হয়। আর এর চেয়েও কমে গেলে তখন হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়।

জানা গেছে, অনলাইনেও শতাধিক পেজ ও ওয়েবসাইটে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডারসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। সাধারণ বাজারের চেয়ে এখানে নৈরাজ্য আরও বেশি।

করোনায় অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সিলিন্ডার সংকটে পড়েছেন তারা। কেউ কেউ শুধু খালি সিলিন্ডার বিক্রয় করছে ২০-২৫ হাজার টাকায়।

আবার অনেকেই আগাম অক্সিজেন সিলিন্ডার ঘরে তুলে রাখছেন। যে কারণে সিলিন্ডারের সংকট দেখা দিয়েছে। বাজারে কয়েক ধরনের সিলিন্ডার থাকলেও লিনডে চায়না এবং প্রাইভেট এই দুই ধরনের সিলিন্ডারের চাহিদা বেশি। মেডিকেল গ্যাসের চাহিদার দিক থেকে লিনডের চাহিদা বেশি।

কিন্তু তেজগাঁওয়ে ওই কোম্পানির সিলিন্ডার বাইরে বিক্রি হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত দামে। এক হাজার ৪০০ লিটারের (১ দশমিক ৪ কিউবিক মিটার) অক্সিজেন সিলিন্ডারের সেট ভ্যাট-ট্যাক্সসহ প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার টাকা।

আবার কোথাও দাম নেয়া হচ্ছে এক হাজার ৪০০ লিটারের (১ দশমিক ৪ কিউবিক মিটার) সিলিন্ডার পড়বে ৪৫-৪৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে যা বিক্রি হয়েছে তার মধ্যে লিনডে বিক্রি হয়েছে ৪৭ হাজার টাকায় এবং প্রাইভেট গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার টাকায়।

কিন্তু বর্তমানে স্টকে কোনো সিলিন্ডার নেই। লিনডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, সিলিন্ডারের প্রচণ্ড ক্রাইসিস। গ্যাস উৎপাদন পর্যাপ্ত আছে। আমাদের সিলিন্ডারগুলো বাইরে বেশি দামে বিক্রি হয়।

অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহকারী শাহানা মেডিকাসের চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির বলেন, হাসপাতাল ও ব্যক্তি পর্যায়ে চাহিদা বেড়েছে অনেক।

তবে চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ করতে হিমশিম খেলেও কৃত্রিম অক্সিজেন সিলিন্ডার আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে কেউ কিনে মজুদ করে নানাভাবে বাজারে বিক্রি করে, এর জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী নয়। অক্সিজেনের উৎপাদন পর্যাপ্ত হলেও সিলিন্ডারের অভাবে সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।

অক্সিজেন উৎপাদনে আগে যে খরচ হতো এখনো তা একই রয়েছে। প্রতি ঘনমিটার অক্সিজেন হাসপাতালে দেয়া হয় ৪৫ টাকা দামে। খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিক্রি করা হয় প্রতি ঘনমিটার ৩৫ টাকায়।

বিএমএ ভবন সার্জিক্যাল মার্কেটের ব্যবসায়ী শামিম আহমেদ বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারি না থাকাতে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটা নিয়েছে। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী রাতারাতি এই অক্সিজেন সিলেন্ডার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে।

শুধু অক্সিজেন সিলিন্ডার বা অক্সিমিটারের দামই নয়, সিলিন্ডার পুনরায় ভর্তিতেও করতে হচ্ছে বাড়তি খরচ। ৪৫ টাকার রিফিল এখন ১০০ টাকারও বেশি। সাধারণ মানুষের দাবি দ্রুত এই বিষয়ে সরকারের নজর দেয়া উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। যারা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য অক্সিজেন কিনে মজুত করছেন তাদের উদ্দেশে বলেন, অপ্রয়োজনে অক্সিজেন মজুদ করবেন না। মানুষের জীবন বাঁচাতে অক্সিজেন দরকার হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, করোনা চিকিৎসায় অক্সিজেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমানে খো যাচ্ছে অনেকেই বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনে মজুদ করছেন করোনা চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য।

যা ঠিক নয়। কারণ অক্সিজেন থেরাপি একটি কারিগরি বিষয়। দক্ষ চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কেউ অক্সিজেন রোগীকে প্রয়োগ করলে তা রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তিনি বলেন, করোনা চিকিৎসার অনেক ক্ষেত্রে হাই ফ্লো অক্সিজেন দিতে হয়। যা বাসায় দেয়া সম্ভব নয়। তাই জনসাধারণের জন্য অনুরোধ, আপনারা অযথা বাসায় অক্সিজেন কিনে মজুদ করবেন না।

কারণ তা বাজারে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করবে এবং হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগী অক্সিজেন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে, যা কাম্য নয়।

তিনি আরো বলেন, বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যু। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ করাটা অত্যন্ত জরুরি। বাস্তবতা হচ্ছে দাম বাড়ার পর বেশি টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে না অক্সিজেন সিলিন্ডার। দেশীয় কিছু প্রতিষ্ঠান অক্সিজেন উৎপাদন করলেও বোতল আমদানি করতে হয়। সুযোগ বুঝে রপ্তানিকারক দেশও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

এতে মানুষজনের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এবং প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, কিছু অসাধু লোক দ্বিগুণ-তিনগুণ করে অক্সিজেন সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি শক্তভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। তাহলে আর সমস্য থাকবে না।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১