আকাশবার্তা ডেস্ক :
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি শরিফুল হক ডালিম ওরফে মেজর ডালিমের সঙ্গে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তার শ্বশুরের আপন ভায়রা ভাই হচ্ছেন মেজর ডালিম।
রোববার (২৫ এপ্রিল) এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেন তিনি।
নিজ কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মামুনুল হকের জব্দ করা মোবাইল ফোন থেকে বাবরি মসজিদের নামে কাতার, দুবাই ও পাকিস্তান থেকে টাকা আনার তথ্য-প্রমাণও মিলেছে।
উপ কমিশনার হারুন বলেন, পুলিশ হেফাজতে সাত দিন জিজ্ঞাসাবাদ করে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটির কেন্দ্রীয় এই নেতার ‘রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের’ কথাও জানতে পেরেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
মামুনুল হেফাজতে ইসলামকে ‘পাকিস্তানের একটি সংগঠনের আদলে’ পরিচালনা করতে চাইছিলেন জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তিনি রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী ছিলেন। জামায়াতের সহায়তায় ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা ভাবনা ছিল তার।
জিজ্ঞাসাবাদে ‘জঙ্গিবাদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য’ উঠে এসেছে জানিয়ে উপ কমিশনার হারুন বলেন, মামুনুলের ভগ্নিপতি মাওলানা মুফতি নেয়ামত উদ্দিন, মাওলানা তাজউদ্দীন ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একবার নেয়ামত উদ্দিন গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। তাকে পরে ছাড়িয়ে আনে। এই নেয়ামতের সঙ্গে ২০০৫ সালে পাকিস্তানে গিয়ে ৪৫ দিন ছিলেন মামুননুল। সেখানে বিভিন্ন জঙ্গি ও রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে তখন যোগাযোগ করেন।
পুলিশ কর্মকর্তা হারুন বলেন, মামুনুলকে জিজ্ঞাসাবাদে তার বিদেশ থেকে অর্থ আনার বিষয়েও তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। দেশের বাইরে থেকে মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকা এনে তিনি বিভিন্ন মসজিদে-মাদ্রাসায় জঙ্গি, উগ্রবাদী কাজে ব্যবহার করতেন।
মামুনুলের জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিয়ে তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার বলেন, বিভিন্ন দেশ থেকে যে টাকাটা আসতো এবং তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা কামরুল ইসলাম আনসারীর মাধ্যমে সরকার বিরোধী কাজে ব্যবহার করা হতো। আর বাবরী মসজিদের নাম দিয়ে ইসলামপন্থী মানুষ, ভারতবিদ্বেষী মানুষের কাছ থেকে একটা ফান্ড কালেকশন করে মামুনুল। কওমী মাদ্রাসার ধর্মভীরু উঠতি বয়সী বাচ্চা শিশুদের দিয়ে ভাঙচুর, বিশেষ করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভাঙচুর করে তিনি চেয়েছিলেন ক্ষমতা যাবেন। সারা দেশে নেতাকর্মীদের সম্বন্বয় করতো হেফাজতে ইসলামের সহযোগী সংগঠন ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’। সংগঠনের কাজই ছিল ওয়াজ-মাহফিল নিয়ন্ত্রণ করা। যেখানে আয়োজকদের বাধ্য করা হতো হেফাজতের শীর্ষ নেতা মামুনুলকে প্রধান বক্তা হিসেবে রাখার জন্য। এখানে ওয়াজের নামে ইসলাম বা রাষ্ট্রবিরোধী নানা ধরনের বক্তব্য দিতেন মামুনুল হক।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বলেন, আমরা জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কানেকশন খোঁজার চেষ্টা করেছি। একটা জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি তিনি জড়িত। তাদের সঙ্গে লিয়াজোঁ মেইন্টেন করতেন তার বোনজামাই নেয়ামতউল্লাহ। বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিম হচ্ছেন মামুনুল হকের প্রথম স্ত্রীর বাবার ভায়রা ভাই।
বঙ্গবন্ধুর খুনির পরিবারের সঙ্গে মামুনুল হকের শ্বশুর পক্ষের সম্পর্কের বিষটি নিশ্চিত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি হারুন বলেন, আমরা তথ্য পেয়েছি। মামুনুল হককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন, ‘আমি জানি না।’ তবে পুলিশ তথ্য পেয়েছে।
তেজগাঁও জোনের ডিসি আরও বলেন, আমরা মাত্র সাত দিন সময় পেয়েছি তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। তার যে বক্তব্যগুলো এর প্রত্যেকটি আমরা পড়েছি ও শুনেছি। এই সকল বক্তব্যের সঠিক কোনো জবাব দিতে পারেননি।
২০২০ সালে মোহাম্মদপুরে দায়ের হওয়া একটি মামলার সাত নম্বর আসামি মামুনুল হক। তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার ভাই মাহফুজুল হক একই মামলার ৬ নম্বর আসামি, তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দায়ীদের গ্রেপ্তার করতে। আমরা বলেছি অবশ্যই যেন ব্যবস্থা নেয় এবং সে (তদন্ত কর্মকর্তা) ব্যবস্থা নিচ্ছে। যারা প্রকৃত অপরাধী যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
যে মামলায় মামুনুল হক গ্রেপ্তার হয়েছেন একই মামলার আসামি হয়ে তার ভাই কীভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, তিনি কারো সঙ্গে দেখা করেছেন কি না আমাদের জানা নেই। তবে আমরা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বলেছি, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তারা প্রত্যেকে গ্রেপ্তার করা হবে।
এদিকে নাশকতার অভিযোগে ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিল থানায় দায়ের করা একটি মামলায় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হককে গ্রেপ্তার দেখানোসহ রোববার তার আরো ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) এ আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।
এছাড়াও মামুনুল হকের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় আরো দুটি মামলা করা হয়েছে। মামলা দুটি করেছেন আহমেদ রজবী ও মো. রুমান শেখ।
মামলার বিবরণীতে লিখেছেন- স্বাধীনতা সুবর্ণজন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিীক উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতের আন্দোলনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে মোটরসাইকেল পোড়ানোর দায়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবে বিরুদ্ধে মামলা দুটি করেছেন।
পল্টন মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক বলেন, মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে- হেফাজতে ইসলামের লোকজন তাদের দুজনের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের নির্দেশদাতা হিসেবে মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা দুটি করেছেন তারা।
এই মামলায় হেফাজতের আরও তিন নেতাকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- সংঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা লোকমান হাকিম, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব ও নাছির উদ্দিন মনির। তাদের বিরুদ্ধেও মামলায় অভিযোগ আনা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, বেআইনি সমাবেশ, হত্যাচেষ্টা, চুরির অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা মামলায় গত ১৯ এপ্রিল মামুনুল হকের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এ মামলায় তাকে বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আগামীকাল সোমবার (২৬ এপ্রিল) সাত দিনের রিমান্ড শেষ হবে। মঙ্গলবার রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হবে। এরপরেই মতিঝিল থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোসহ তার ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের ওপর শুনানি হবে।
প্রসঙ্গত, গত মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের বিরোধিতায় হেফাজতের বিক্ষোভ কর্মসূচি ও হরতালকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক তাণ্ডব চলে, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানিও হয়।
এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার একটি রিসোর্টে ৩ এপ্রিল এক নারীসহ আটকের পর একাধিক বিয়ের ঘটনায় আলোচনায় আসেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল।
গত ১৮ এপ্রিল দুপুরে ঢাকার মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার করার পর মোহাম্মদপুর থানার নাশকতার এক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মামুনুলকে সাত দিন রিমান্ডে নেয় পুলিশ।