শনিবার ১৪ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৩০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জনসেবায় আগ্রহ হারাচ্ছেন এমপিরা

আকাশবার্তা ডেস্ক :

  • জিয়া-এরশাদ মার্কা নয়, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ও গণতান্ত্রিক সরকার —দাবি এমপিদের

নির্বাচনি এলাকায় জনসেবামূলক কাজে আগ্রহ হারাচ্ছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা। করোনায় স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয়ের দায়িত্ব সচিবদের দেয়ায় ক্ষুব্ধ তারা। সাংসদরা বলছেন, বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার। জিয়া-এরশাদ মার্কা সরকার নয় যে, জনপ্রতিনিধিদের থেকে বেশি আমলাদের গুরুত্ব দিতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে সরকারকে এখনই বেরিয়ে আসতে হবে। নইলে জাতীয় কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে বিজয় অর্জন করা কঠিন হবে। একই সাথে জনসেবামূলক কাজে আগ্রহ হারাবেন এমপিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

তথ্যমতে, ত্রাণ তৎপরতা, চলমান করোনার সংকট ও সরকারের সার্বিক কার্যক্রমে ইউএনও, ডিসি ও সচিবদের গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে বর্তমান সরকার। সচিবদের বানানো হয়েছে জেলাওয়ারি কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণে দিন দিন কোণঠাসা হয়ে পড়ছে দেশের অধিকাংশ সাংসদ, জেলা-উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। ফলে স্থানীয় সরকার প্রশাসকদের সাথে দূরত্ব বাড়ছে জনপ্রতিনিধিদের। দীর্ঘদিনের এমন সমস্যার মাঝে বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সংসদে বক্তৃতায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পার্লামেন্টারিয়ান তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা এই জাতীয় সংসদের সদস্য, এমন একজনও নেই যিনি এই করোনাকালে নিজস্ব অর্থায়নে বা যেভাবেই হোক গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াননি। এখন আমাদের জেলায় জেলায় দেয়া হয়েছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা।  মানুষ মনে করে, আমরা যা দিই, এটা প্রশাসনিক কর্মকর্তারাই দেয়। একটা রাজনৈতিক সরকার এবং রাজনীতিবিদদের যে কর্তৃত্ব কাজ, সেটা কিন্তু ম্লান হয়ে যায়। খেয়াল রাখতে হবে, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা সচিবদের ওপরে।’

প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের এমন বক্তব্যের পর ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন স্থানীয় এমপিরা। জানা যায়, বৈশ্বিক মহামারি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাম্প্রতিক সময়ে পাবনা জেলায় দুটি সমন্বয় কমিটির মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৃথক দুটি মিটিংয়ে সমন্বয়ক হিসেবে প্রধান অতিথির চেয়ারে বসেন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব। আর সমন্বয় মিটিংয়ের সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলার চার সংসদ সদস্য।

ওই মিটিং সূত্রে জানা যায়, সমন্বয় মিটিংয়ে সচিবকে প্রধান অতিথি করায় ডিসিকে উদ্দেশ্য করে স্থানীয় একজন সাংসদ  সদস্য বলেন, ‘আপনি সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং এমপিরা উপদেষ্টা। আমরা একসময় দেখেছি, মন্ত্রীরা বিভিন্ন জেলায় প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু আজ যিনি আমাদের মাঝে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে এসেছেন— তিনি নাটোর সম্পর্কে কী জানেন! তিনি কয়টি ইউনিয়ন পরিষদের নাম বলতে পারবেন! তিনি কি বলতে পারবেন নাটোরে মোট কতটি গ্রাম রয়েছে! নাটোরের জনসাধারণের প্রধান প্রধান সমস্যা কি! নাটোরে করোনা সংক্রমণের কী অবস্থা! করোনায় চিকিৎসা ব্যবস্থার কতটুকু প্রস্তুত আছে! তিনি এগুলো বলতে পারবেন না। এগুলো না যেনে তিনি কিভাবে সমন্বয় করবেন। তাহলে কেন তাকে প্রধান সমন্বয়ক করা হয়েছে!’ এ সময় উপস্থিত সচিব ওই সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘সরকার আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে। সেই দায়িত্ব পালনের জন্য আমি এসেছি। এই বিষয়ে আপনাদের (সংসদ সদস্য) কোনো অভিযোগ থাকলে সরকারের কাছে দাবি করতে পারেন।’

এ সময় ওই সংসদ সদস্য দ্রুত সমন্বয় কমিটির মিটিং ত্যাগ করেন। তিনি বের হওয়ার পরপরই আরও তিন সংসদ সদস্য মিটিং ত্যাগ করেন। একই কারণে পরপর দুটি মিটিং পণ্ড হয়েছে। জানতে চাইলে মিটিংয়ে উপস্থিত থাকা এক সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, ‘স্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থাকতে সমন্বয় মিটিংয়ে সচিব প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এটা একজন সংসদ সদস্যের জন্য বিব্রতকর। এখন দেখছি আমাদের মানসম্মান বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি ও জনসেবা করতে হবে। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের গণতান্ত্রিক সরকার। জিয়া-এরশাদ মার্কা সরকারের আমলে হলে এগুলো মেনে নেয়া যেতো। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সরকারের সময় আমলাদের হাতে দায়িত্ব মেনে নেয়া যায় না। তারা আজ প্রতিটি এমপি-মন্ত্রীর ঘাড়ের উপর চেপে বসেছেন।’

প্রায় ২০ জন স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এদের অধিকাংশ সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। অথচ এদের অধিকাংশই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভুগছেন। তারা বলছেন— ইউএনও, ডিসি, সচিব, মুখ্যসচিবসহ সরকারের আমলারা নিজেদের স্বার্থ ঠিক রেখেই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাদের কার্যক্রমে আমাদের (এমপি) সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।  নির্বাচনি এলাকা ও সাধারণ মানুষের যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে নিজ থেকে উদ্যোগ নিয়ে ইউএনও-ডিসিকে বলতে হচ্ছে। এমন অবস্থা আমাদের জন্য বিব্রতকর। এই পরিস্থিতিতে রাজনীতি করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মো. দবিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব না দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। এতে আমাদের নিজ নিজ রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন সিদ্ধান্ত রাজনীতির জন্য খারাপ! জাতির জন্য খারাপ! এই ধারা অব্যাহত থাকলে রাজনীতি অন্ধকারের দিকে চলে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যখন জনগণ দেখবে জনপ্রতিনিধিরা আমাদের জন্য কিছুই করে না, তখন জনপ্রতিনিধিদের উপর থেকে তাদের আস্থা উঠে যাবে।

করোনায় স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব সচিবদের দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে হবে জানিয়ে বগুড়া-২ আসনের সংসদ সদস্য শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে অনেক সিনিয়র সংসদ সদস্য কথা বলেছেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা যথার্থই বলেছেন। এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের বেরিয়ে আসা উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জনপ্রতিনিধি। আমাদের যদি জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ না থাকে তাহলে জনগণ আমাদের থেকে দূরে সরে যাবে। তাদের আর আমাদের উপর আস্থা থাকবে না।’

জানতে চাইলে নওগাঁ-২ আসনের এমপি মো. শহীদুজ্জামান বলেন, ‘আমলারা হচ্ছেন সরকারি কর্মচারী। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাই তাদের দায়িত্ব। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রসাশন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। তবে কিছু কিছু স্থানে ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি হয়।’

রফিকুল ইসলাম, প্রতিবেদক- দৈনিক আমার সংবাদ।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১