আকাশবার্তা ডেস্ক :
আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম— কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক আগামী শুক্রবার। বিকেল ৪টায় গণভবনে ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা সংক্রমণ রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হবে বৈঠকটি।
এদিকে অনুষ্ঠেয় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক ও চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের দ্বন্দ্ব, সঙ্ঘাত, সহিংসতা, হামলা-মামলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের খুনোখুনির বিষয়টি বেশ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বিএনপিবিহীন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সঙ্ঘাত-সহিংসতা এড়াতে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্তের ঘোষণাও আসতে পারে।
এছাড়াও আগামী বছর দলের ২২তম জাতীয় সম্মেলন ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলন, তৃণমূলে বিভক্তির রাজনীতি দূরীকরণ, এমপি-মন্ত্রীদের পক্ষপাতিত্ব ও বলয়ের রাজনীতি ভেঙে দিতে বেশ কিছু সাংগঠনিক নির্দেশনা দিতে পারেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কেন্দ্রীয় একাধিক সিনিয়র নেতার সাথে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।
আ.লীগের সিনিয়র নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগামী শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতে পারে দেশব্যাপী চলতি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে। মূলত বিএনপিবিহীন এ নির্বাচনে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগের দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীরা।
দলের বিদ্রোহী ও বিদ্রোহীপন্থিদের দাপটে নৌকার মনোনীত প্রার্থীর ভোট বর্জনের ঘটনাও ঘটেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যেই হামলা-পাল্টা হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। সর্বশেষ দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত সহিংসতায় দলটির মোট ৩৯ জন নেতাকর্মীর মৃত্যু হয়েছে।
দলীয় বিদ্রোহী থাকায় দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন ক্ষমতাসীনদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এমপি-মন্ত্রী ও প্রভাবশালী নেতাদের স্বার্থরক্ষায় খুনোখুনির শিকার হচ্ছেন কর্মীরা! বিএনপিবিহীন নির্বাচনে নৌকার প্রতিপক্ষ এখন আওয়ামী লীগ! অনেক স্থানে সাংসদরা সরাসরি নৌকার বিরোধিতা করছেন!
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, ভোটের মাঠে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের দুর্বলতার প্রকাশ। বিদ্রোহী থাকা দলের নীতি-আদর্শের ওপর আঘাত। ঐক্যবদ্ধ তৃণমূলে ভাঙন সৃষ্টির অপচেষ্টা। যা আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলটির কেউ কেউ। ফলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হতে পারে।
আরেকটি সূত্রে বলছে, বিএনপিবিহীন ইউনিয়ন নির্বাচনে সঙ্ঘাত-সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাকি ধাপগুলোর জন্য দলীয় প্রতীকের প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা যায় কি না— সে বিষয়ে দলীয় সভানেত্রীর সৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন দলটির সিনিয়র নেতারা। যেহেতু নির্বাচনের সহিংসতা রোধে অনেক এমপি-মন্ত্রী ও জেলা-উপজেলার প্রভাবশালী নেতারা নৌকার প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সুপারিশ করেছেন। ফলে বৈঠকে নৌকার প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
আরেকটি সূত্রে বলছে, গত উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনে বেশ কিছু স্থানে সরাসরি বিদ্রোহীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন প্রায় অর্ধশতক এমপি। সেই ধারাবাহিকতায় চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অব্যাহত রেখেছেন এমপিরা। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাঠে বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন নৌকার মনোনীত প্রার্থীরা। যা নিয়ে কেন্দ্রে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত ওই সকল এমপিদের নিয়ে কথা হতে পারে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, ‘কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। সেখানে দলের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।’
চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘সব সময় প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। তবে কী সিদ্ধান্ত আসবে সে জন্য সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।’
সর্বশেষ গত ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক। ওই বৈঠকে নিজ নিজ বিভাগের সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন দলটির বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। ওই প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্তে উঠে আসে তৃণমূলের আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দ্বন্দ্ব, নেতায় নেতায় বিভক্তি, এমপি-মন্ত্রীদের বলয়ভিত্তিক রাজনীতি, ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন ও জামায়াত-বিএনপির নেতাদের কমিটিতে স্থান দেয়ার অভিযোগ। তৃণমূলে দৃশ্যমান এমন অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন দলীয়প্রধান। তবে এ বৈঠকে দলের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে চাইতে পারেন দলীয়প্রধান। মূলত আগামী দুই বছরকে বেশ গুরুত্বেই সাথেই দেখছে আওয়ামী লীগ।
কারণ, আগামী বছর অনুষ্ঠিত হবে দলটির ২২তম জাতীয় সম্মেলন এবং পরের বছর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে এখন থেকে রাজনৈতিক কর্মকৌশল নির্ধারণ করবে দলটি।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করায় বেশ ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেন গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। মেয়রের এমন আচারণে ক্ষুব্ধ দলটির কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতারা। আগামী শুক্রবারের দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে বেশ গুরুত্ব পাবে তার বিষয়টিও।