আকাশবার্তা ডেস্ক :
- দু-একটি দেশের শান্তির প্রেসক্রিপশনে চলছেন মির্জা ফখরুল
- তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান তৃণমূল নেতাকর্মীদের
- তিনি মহাসচিব থাকলে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয় বলে অভিযোগ
- ফখরুলের বিকল্প বিএনপিতে হাজারো ছাত্রনেতা রয়েছেন
- ছাত্রনেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে দলের নেতৃত্ব চায় তৃণমূল
- মুক্তির জন্য শুধু আহ্বান আবেদন ও অনুরোধেই সময়ক্ষেপণ
‘খালেদা জিয়ার জন্য আপনারা কিছুই করছেন না। আপনাদের জন্যই খালেদা জিয়া মুক্ত হচ্ছেন না।’ মঞ্চ থেকে প্রকাশ্যেই মির্জা ফখরুলের উদ্দেশে এসব কথা বলেন কর্মীরা! আক্রোশে ফখরুল বলেন, ‘এই ছেলে, কে তুমি, ইউ ডোন্ট টক। তুমি জানো না, তাই এভাবে কথা বলছো। ওই বেয়াদব, চুপ! চুপ করো। এদিকে এসো… তুমি এদিকে এসো।’ এ কথা বলার পর উপস্থিত কর্মীরা আরো চিৎকার দিয়ে ওঠেন। শুরু হয় হট্টগোল। উত্তেজিত কর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন— ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, নেত্রী মুক্তির কর্মসূচি চাই, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, খালেদা জিয়ার ছাত্রদল— আদর্শিক সংগঠন।’
ফখরুলের মুখের ওপর এমন কথাও বলেন উপস্থিত নেতারা, ‘মুরাদ ছাত্রদল করেনি, ছাত্রলীগই ছিলো; আপনি ভুল বলছেন।’ উত্তরে ফখরুল বলেন, ‘তোমরা জানো না, তাই বলছো…।’ এক পর্যায়ে ফখরুল মঞ্চ থেকে নেমে চলে যান। এমন দৃশ্য দেখা যায় নব্বইয়ের ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য আয়োজিত গত সোমবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের এক অনুষ্ঠানে। উপস্থিত নেতাকর্মীদের সাথে কথা বললে বড় অংশই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার জন্য বিএনপির নীতিনির্ধারক ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিছুই করেননি। খালেদা জিয়া আটকের পর কার্যত কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেনি, সাজা হওয়ার পর রহস্যময় চুপ ছিলেন! দেখাতে পারেননি প্রতিক্রিয়াও। চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারকে এমন কোনো চাপ প্রয়োগও করতে ব্যর্থ খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দায়িত্বে থাকা নেতারা।
সম্প্রতি নেত্রী মুক্তির জন্য যে দোয়া, মিলাদ, অনশন, প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে প্রেস ক্লাবকেন্দ্রিক, এতে করে অনুরোধ বার্তায় সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তির চিন্তা করবে— এমনই মনে করছেন না তৃণমূল নেতারা! তারা কার্যত নির্দেশনা কিংবা কর্মসূচির মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে জীবন্ত পেতে চান, চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চান। এ জন্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়া ব্যক্তিদের হাতে দলের নেতৃত্ব তুলে দেয়ার আহ্বান তৃণমূল নেতাদের।
তারা বলছেন, মির্জা ফখরুলের বিকল্প বিএনপিতে অন্তত এক হাজার ছাত্রনেতা রয়েছেন, অতীতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন আদর্শিক রাজনীতি করতে গিয়ে। তাদের হাতে নেতৃত্ব যাওয়া পর্যন্ত বিএনপি আলোর পথ দেখবে না, জনগণের দলও হয়ে উঠতে পারবে না।
মির্জা ফখরুলের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে তৃণমূল নেতাকর্মীরা আরো বলেন, বিএনপি নির্বাচনে গেলে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাবে, সেনাবাহিনী মাঠে নামলে পরিস্থিতি ভিন্নরকম হয়ে যাবে, জনগণ ভোটকেন্দ্রে ছুটে যাবে। ভোটবিপ্লব হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে— এমন সব ভুল বার্তা দিয়েই মির্জা ফখরুল খালেদা জিয়াকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়েছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য।
বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শুধু এক ফখরুলের ভূমিকার কারণে বিএনপিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে দলের বড় একটি অংশ। দলের একাধিক শীর্ষ নেতার অভিযোগ, ফখরুলের শান্তি-প্রগতির বাম রাজনীতির আদর্শের সাথে জাতীয়তাবাদী আদর্শের অনেক কিছুই এখনো মিলছে না। নেতাকর্মীরা ভরসা করতে পারছেন না তার ওপর। ফখরুলের মাধ্যমে একদিকে মাঠের রাজনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিএনপি জনগণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জাতীয় ইস্যুতে বিএনপির রাজনীতি এখন অধরা।
তাদের অভিযোগ, ২০১৩-১৪ সালের আন্দোলন, বিডিয়ার বিদ্রোহ থেকে ব্যাংক লুট, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, কিশোর আন্দোলন, শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস, করোনায় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের ব্যর্থতা জনগণের ক্ষোভ পুঁজি করেও বিএনপি রাজনীতি করতে পারেনি। আর এ ইস্যুগুলোতে নীরব থাকার নাটের গুরু ছিলেন মির্জা ফখরুল!
২০১৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া দেশ অচল আন্দোলনে নির্দেশ দিলেও মহাসচিবের পরামর্শে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএনপি! বিডিআর বিদ্রোহ, শেয়ারবাজার ও ব্যাংক লুট, করোনায় সরকারের ব্যর্থতায় জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে শক্তিশালী শক্ত ভূমিকা রাখলে আজ বিএনপির এমন পরিস্থিতি হতো না। খালেদা জিয়াকে মৃত ভাবছে বিএনপির একটি অংশ। বিএনপির আজকের এ অবস্থার জন্য জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে নীরব ভূমিকাকেই দায়ী করছেন মাঠ পর্যায়ের নেতারা।
মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, যতদিন মির্জা ফখরুল দলের মহাসচিব থাকবেন, ততদিন খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে না। দলে রহস্যময় আন্দোলনের নাটক চলছে। চলমান আন্দোলন দিয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অনেকে এমনও মনে করছেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারো ইশারায় চলছেন।
শুধু দলীয় নেতাকর্মীরা নন, মির্জা ফখরুলের ওপর ক্ষোভ ২০ দলের নেতাকর্মীদেরও। মির্জা ফখরুল নেতৃত্বে আসার পর বিএনপি থেকে ২০ দলীয় জোট প্রায় আলাদা হয়ে গেছে। ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি পালনসহ বহু রাজনৈতিক ইস্যু থেকে বিচ্ছিন্ন। সংসদ নির্বাচনের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত জোট রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও এখন জোটকে পাশ কাটিয়ে ‘একলা চলো’ নীতিতে চলছে বিএনপি। এতে দলটির নেতাকর্মীরা খুশি হলেও শরিক দলের নেতাদের ক্ষোভ রয়েছে।
২০ দলীয় জোট নেতারা খালেদা জিয়ার জন্য আন্দোলনের কথা বলে অন্তরালে অনেকেই ছিটকে পড়েছেন। এর পেছনে মির্জা ফখরুলের রহস্যময় ভূমিকা রয়েছে বলেও একটি অংশ মনে করছেন।
তারা বলছেন, মির্জা ফখরুল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দিয়ে এসেছেন ঐক্য-শান্তি-প্রগতি নিয়ে বাম রাজনীতির স্লোগান। সেই ফখরুল তারেক রহমানের পরামর্শে ও খালেদা জিয়ার আশীর্বাদে হুট করেই হয়ে যান বিএনপির নীতিনির্ধারক।
তাই অন্তর থেকে এখনো বিএনপির রাজনীতি ধারণ করতে পারেননি তিনি। দু’-একটি দেশের শান্তির প্রেসক্রিপশনে মির্জা ফখরুল চলছেন। যে দেশগুলো কখনোই চায় না দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম হোক। তাদের খুশির জন্যই খালেদা জিয়া ইস্যুতে বিএনপির নীরবতা। মুক্তির জন্য শুধু আহ্বান, আবেদন ও অনুরোধে সময়ক্ষেপণ।
২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেছেন, ‘প্রত্যেক দলই তাদের নিজস্ব কর্মসূচি পালন করতে পারে। কিন্তু আমি চাই ২০ দলীয় জোটকে সক্রিয় করা হোক। জোটের পক্ষ থেকেও কর্মসূচি ঘোষণা করা হোক।’ খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ২০ দলের ব্যানারেই আসুক বড় কর্মসূচি। যে কর্মসূচিতে থাকবে মানুষের অংশগ্রহণ।
বিএনপির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আমরা রাজপথে না নামলে জনগণ নামবে না। রাজনৈতিক দল আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকলেই জনগণ নামবে। তবে অবশ্যই জনগণের দাবি নিয়েই আমাদের আন্দোলন করতে হবে।’
বিএনপির বিশেষ সম্পাদক ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন, ‘পুরান ঢাকার কারাগারে আমাদের নেত্রী হেঁটে গেছেন। পরবর্তীতে পিজি হাসপাতালেও হেঁটে গেছেন। পিজি হাসপাতালে যখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হয়, তখন সরকারের অনুগত চিকিৎসকরা খালেদা জিয়ার লিভারে সমস্যার কোনো রিপোর্ট দেননি। তাহলে কীভাবে তার পরপরই খালেদা জিয়ার লিভার রোগ হয়! আমরা মনে করছি, সরকার তাকে স্লো পয়জনিং করেছে। এ সরকারকে ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া আমাদের এখন আর কোনো অবস্থান নেই।’




























