আকাশবার্তা ডেস্ক :
প্রতি বছর ঈদ বা বড় ছুটির সময় ঢাকায় বেশির ভাগ বাসা-বাড়িই ফাঁকা হয়ে যায়। ঈদ কিংবা বড় ছুটির সময়গুলোতে ঘরবাড়ি তথা গোটা শহরই অনেকটা ফাঁকা থাকায় চুরি-ডাকাতির সংখ্যাও বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এসব অপরাধে জড়িত চোর-ছিনতাইকারীরা আগে থেকেই রেকি করে বাসা চিহ্নিত করে রাখে। এক্ষেত্রে বিশেষ করে দোতলা বা তিনতলার বাসাগুলোকেই টার্গেট করা হয় বেশি।
অসংখ্য ঘটনায় দেখা গেছে, বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীরাও এসব চক্রের সাথে যোগসাজশ করে থাকে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বড় ধরনের চুরি না হলে ভুক্তভোগীরাও থানায় মামলা করতে চান না। ফলে পুলিশও এসব ক্ষেত্রে কড়া ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হয় না।
যে কারণে প্রতিবারের ন্যায় এবারো এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সুযোগ যাতে না পায় অপরাধীরা সে জন্য পুলিশ সদস্যদের বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি নগরবাসীকেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তারা।
ঈদের ছুটিকালীন সময়ে বাসা-বাড়ির নিরাপত্তায় বাড়তি সতর্কতা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা। ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার সময় রাজধানীতে চুরি-ডাকাতি কতটা হয়, সেই পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে না থাকলেও এমন ঘটনা প্রতি বছরই কমবেশি ঘটছে। তবে মাসওয়ারি পরিসংখ্যান রাখলেও শুধু বিশেষ উৎসবের সময়ের কোনো পরিসংখ্যান পুলিশ সংরক্ষণ করে না।
তাই ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রধানও কয়েকদিন আগে নগরবাসীকে পরামর্শ দিয়েছেন, ঈদের সময় ফাঁকা থাকায় বাসা-বাড়িতে চুরি ডাকাতি বেড়ে যায়। ফলে নগরবাসী যেন গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগে মূল্যবান জিনিসপত্র, স্বর্ণালঙ্কার আত্মীয় স্বজনের বাসায় রেখে যান। সে রকম কোনো স্বজন না থাকলে প্রয়োজনে নিকটস্থ থানায় জমা রাখার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মো. ফারুক হোসেন বলছেন, ছুটিতে বাসা-বাড়ি ফাঁকা থাকার সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে অপরাধীরা। যেহেতু ঈদের মতো বড় উৎসবে অনেকে গ্রামের বাড়িতে যান, এই সুযোগে চোররা ফাঁকা বাসায় চুরি করার চেষ্টা চালাতে পারে।
‘আমরা এই সময় অতিরিক্ত সতর্কতা, প্রহরার ব্যবস্থা করি। সব থানাকে বাড়তি টহল দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ঢাকা শহরের সব বাড়িঘর তো আর সবসময় পাহারা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই নাগরিকদেরও আমরা অনুরোধ করছি, তারাও যেন নিজেরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।’
গত দুই বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বছরের প্রথম চার মাসের তুলনায় ঢাকায় মে মাস ও জুলাই মাসে বাসা-বাড়িতে চুরি, ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় তুলনামূলক বেশি মামলা বা সাধারণ ডায়েরি দায়ের করা হয়েছে।
২০১৯ সালে ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন রাসেল মাহমুদ। ঢাকায় ফিরে দেখতে পান, সাততলা ভবনে তার নিচতলার বাসার পেছনের জানালার গ্রিল কেটে ল্যাপটপ, কাপড়-চোপড়সহ বেশ কিছু দামি জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। বাসার দরজায় তালা থাকলেও পেছন দিক থেকে চুরি হওয়ায় বিষয়টি টেরই পাননি বাসার মালিকও।
বাড়ি থেকে ফিরে বাসার দরজা খুললেই টের পান বাসায় চুরি হয়েছে। সে বছরই বাসা বদল করে ওই ভবনের পাঁচতলায় ওঠে যান। অনেক দিনের পুরোনো ল্যাপটপসহ যা কিছু চুরি হয়েছে তাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আহামরি বেশি না হওয়ায় তিনি থানায় মামলা বা জিডিও করেননি।
এসব ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, কয়েকটি নির্দিষ্ট গ্রুপই ঘুরেফিরে এ ধরনের চুরি ডাকাতিতে জড়িত থাকে। গত বছরের জুলাই মাসে এমন আট জনকে গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। যাদের কাজই ছিল বাসাবাড়ির গ্রিল কেটে চুরি করা।
এই চক্রের বিরুদ্ধে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, পিরোজপুরেও মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধেও কেন পুলিশ আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারে না— এমন প্রশ্ন নগরীর বাসিন্দাদের।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুরি-ডাকাতির অপরাধগুলো জামিনযোগ্য হওয়ায় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তীতে আবার জামিনে বেরিয়ে এসে একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সমস্যা হলো, একবার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর পর আর তাদের ওপর নজরদারি বা ফলোআপ করা হয় না। ফলে সেই অপরাধী ঘুরেফিরে আবার অপরাধ করে, বারবার অপরাধ করার সুযোগ পেয়ে যায়। এ কারণে এসব অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
এসব অপরাধ ঠেকাতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় এখনো পুলিশের সংখ্যা কম। এক্ষেত্রে অপরাধ দমনে কমিউনিটি পুলিশিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সমাজের নানা পেশার মানুষজনকে নিয়ে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা তৈরি হলে, তারাই নিজেদের চারপাশের এলাকায় নজরদারির ব্যবস্থা করবেন। ফলে অপরাধীরা কোনো অপরাধ ঘটানোর সাহস পাবে না। সেখানে প্রয়োজনে নিয়মিত পুলিশ সদস্যরা তাদের সহায়তা করবেন। এই ফোরামগুলোকে স্ট্রং করা গেলে অনেকাংশেই এসব অপরাধ কমে আসবে।
ফাঁকা ঢাকায় চুরি-ছিনতাই ঠেকাতে নগরীর বাসিন্দাদের প্রতি পুলিশের পরামর্শ : বাসাবাড়িতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— আপনার বাসা-অফিসে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ব্যবহার করুন, বাসা-ফ্ল্যাটের মেইন গেটে অটোলক ব্যবহার করুন, বাসা-বাড়ি ত্যাগের আগে রুমের দরজা-জানালা সঠিকভাবে তালাবন্ধ করুন। যে সমস্ত দরজা-জানালা দুর্বল অবস্থায় আছে তা এখনই মেরামত করে নিন এবং যথাসম্ভব সুরক্ষিত করে নিন।
প্রয়োজনে একাধিক তালা ব্যবহার করুন, রাতে আপনার বাসার চারপাশ আলোকিত করে রাখুন, আপনার বাসা বা ফ্ল্যাটে সিসিটিভি স্থাপন করুন, সিসিটিভিসহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় থাকার বিষয়টি নিয়মিত নিশ্চিত করুন, দরজায় নিরাপত্তা এ্যালার্মযুক্ত তালা ব্যবহার করুন, মূল্যবান সামগ্রী ও দলিল নিরাপদ হেফাজতে রাখুন এবং তালাবন্ধ করুন।
প্রয়োজনে ব্যাংক লকারের সহায়তা নিতে পারেন, বাসা-বাড়ি ত্যাগের আগে যে সমস্ত প্রতিবেশী-পাশের ফ্ল্যাটের অধিবাসী ঢাকায় অবস্থান করবেন তাদেরকে আপনার বাসার প্রতি লক্ষ রাখতে অনুরোধ করুন এবং ফোনে তাদের সাথে যোগাযোগ রাখুন, ভাড়াটিয়ারা আগেই বাসার মালিককে ঈদ উপলক্ষে বাসা ত্যাগের বিষয়টি অবহিত করুন, মহল্লা ও বাড়ির সামনে সন্দেহজনক কাউকে-দুষ্কৃতিকারীকে ঘোরাফেরা করতে দেখলে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি ও থানাকে অবহিত করুন, ঈদে আপনার মহল্লা-বাসায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকলে বা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে তা স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশ-থানা-ফাঁড়িকে অবহিত করুন, বাসার গাড়ির গ্যারেজ সুরক্ষিত করুন, বাসার জানালা-দরজার পাশে কোনো গাছ থাকলে শাখা-প্রশাখা কেটে ফেলুন যাতে অপরাধীরা শাখা-প্রশাখা ব্যবহার করে বাসায় প্রবেশ করতে না পারে।