‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রাখতে ভারতকে অনুরোধ করেছি’, এমন বক্তব্যে দিয়ে ফের বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। তার অতিকথন ও বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে বিব্রত সরকার ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, ভারত বাংলাদেশের দুঃসময়ের বন্ধু। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে ভারতকে কখনোই আওয়ামী লীগ অনুরোধ করে না।
দলটি মনে করে, ক্ষমতার উৎস দেশের জনগণ। দায়িত্বশীল পদে বসে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথাবার্তা ব্যক্তিগত অভিমত। এ ধরনের বক্তব্য আওয়ামী লীগ কখনোই অনুমোদন করে না। এগুলো অবিবেচনামূলক মন্তব্য। তবে নিজের বেফাঁস মন্তব্যের জন্য দুষ্ট লোকদের দায়ী করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।
তিনি বলেন, কিছু দুষ্ট লোক তিলকে তাল করে।
তথ্য মতে, বেফাঁস মন্তব্যের জন্য বেশ কয়েকদিন ধরেই দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনা সৃষ্টি করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। এক সপ্তাহ আগেই নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী নিয়ে ‘অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষের বেহেশতে আছে’ বলে মন্তব্য করে তুমুল সমালোচনার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরস তৈরি হয়েছিল।
সেই রেশ কাটতে না কাটতেই গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম শহরের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমী উৎসবের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি ভারতে গিয়ে বলেছি, শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। দুই দেশেরই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। এটি সম্ভব যদি শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দেয় ভারত।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, সেগুলো করতে ভারত সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছেন বলে দাবি করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার এমন বক্তব্যের কারণে ফের সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার ও আওয়ামী লীগ। দলের অভ্যন্তরে তোলপাড় চলছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা রীতিমতো বিব্রত। মন্ত্রীদের লাগামহীন বক্তব্য দল ও সরকারের ভাবমর্যাদাকে নষ্ট করছে। সরকারপ্রধানের অর্জন নষ্ট করছে।
কেউ কেউ বলছেন, সরকারের দায়িত্বশীল পদে বসে দায়িত্বহীন কথাবার্তা দলের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো অবিবেচনামূলক মন্তব্য। এ ধরনের বক্তব্য আওয়ামী লীগ কখনোই অনুমোদন ও সমর্থন করে না। ক্ষমতাসীন দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করেন, বহির্বিশ্ব নয়, বাংলাদেশে ক্ষমতার উৎস শুধু দেশের জনগণ। ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার একমাত্র মালিক তারা। এ ধরনের বক্তব্য বিরোধী দলের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার শামিল। এ ধরনের বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে যে আন্তর্জাতিক চাপ আছে, সেই চাপকেই বাড়িয়ে দেবে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, ‘দায়িত্বশীল পদে বসে উনি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন) যদি এ ধরনের কথাবার্তা বলেন তাহলে এটি খুবই দুঃখজনক। এ ধরনের বক্তব্য আওয়ামী লীগ কখনোই অনুমোদন করে না। এগুলো অবিবেচনামূলক মন্তব্য।’ তার মন্তব্য ভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে কি-না সেটিও দেখার বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘দুই পত্রিকায় দুইভাবে নিউজ দেখলাম। তাতে তার মন্তব্যে ভিন্নভাবে প্রচার করা হচ্ছে কি-না। সেদিও দেখার বিষয়। তবে সত্যিই যদি তিনি এমন মন্তব্যে করে থাকেন তার মন্তব্যের কারণে অবশ্যই আওয়ামী লীগ বিব্রত। এমন মন্তব্যে আওয়ামী লীগ কখনো সমর্থন করে না।’
তবে নিজের বেফাঁস মন্তব্যের জন্য দুষ্ট লোকদের দায়ী করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গতকাল গোপালগঞ্জে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে কিছু লোক আছে, যারা তিলকে তাল বানায়। আমি গতকাল ভারতের সাথে আলোচনায় তাদের বলেছি যে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনা আছেন বলেই বাংলাদেশ স্থিতিশীল আছে। আমরা কোনো ধরনের উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ চাই না। আপনার ও আমাদের দেশে কিছু দুষ্ট লোক আছে, যারা তিলকে তাল করে। আপনাদের কিছু সাংবাদিক দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় বলেই এসব সংবাদ প্রচার করছে।’
ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতকে কোনো অনুরোধ আওয়ামী লীগ করে না, করেনি। শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকেও কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘যিনি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এ কথা বলেছেন, তার ব্যক্তিগত অভিমত হতে পারে। এটি আমাদের সরকারের বক্তব্য নয়। দলেরও বক্তব্য নয়।’
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, ‘ভারত আমাদের দুঃসময়ের বন্ধু। একাত্তরের রক্তের বন্ধনে আমরা আবদ্ধ। কিন্তু তাই বলে আমরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতকে কোনো অনুরোধ আওয়ামী লীগ করে না, করেনি। শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষ থেকেও কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। আমাদের ক্ষমতার উৎস বাংলাদেশের জনগণ। বাইরের কেউ আমাদের ক্ষমতায় ঠিকিয়ে রাখতে পারবে না।’
দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের দায়িত্বশীল কয়েকজন মন্ত্রী বেফাঁস কথাবার্তা বলেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, ‘সবার গায়ে জামা কাপড়, খুব খারাপ আছি মনে করি না’ দাম বাড়ায় কেউ না খেয়ে মারা যায়নি, আশা করি যাবেও না। বৈশ্বিক মন্দায় অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে।’ জ্বালানি তেলসহ দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অবস্থা। সংকট মোকাবিলায় সবাইকে পাশে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ সংকট মোকাবিলা করার পরিবর্তে কিছু কিছু মন্ত্রীর অতিকথন সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘মন্ত্রীদের লাগামহীন কথবার্তা আওয়ামী লীগের জন্য দিন দিন বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে। বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে। সরকারবিরোধীরা কঠোর সমালোচনা করছে। নিজেদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। দায়িত্বশীলদের এমন কথাবার্তা থামানো না গেলে দলের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হবে। তাই সময় থাকতে এদের লাগাম টানা জরুরি।’
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ।




























