আকাশবার্তা ডেস্ক :
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করা ইসির কাজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা। গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুই দিনের সংলাপ শেষে বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে সাংবাদিকদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কথা বলেন। সংলাপে টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিব ও প্রতিষ্ঠানটি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
কেএম নুরুল হুদা বলেন, আমাদের কারও কাছে যাওয়ার দরকার নেই। কেননা ইসি একটি স্বাধীন সত্তা। আমরা শপথ নিয়েছি, কারও চাপে নতি স্বীকার করবো না। কারও কাছে যাবো না। এটাই যথেষ্ট। তাছাড়া আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক অনেক মধ্যস্থতাকারী এসেও সমঝোতা করতে পারেননি। তাই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা আমরা নিতে চাই না, এটা আমাদের কাজও নয়।’
নির্বাচন কমিশন ভবনে সিইসির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় এই সংলাপ। সংলাপের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে সিইসি বলেন, ‘এটি কমিশনের সিদ্ধান্ত। যদি পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে করি সেনাবাহিনী দরকার আছে, তাহলে থাকবে।’
বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূল রয়েছে দাবি করে কে এম নূরুল হুদা বলেন, ‘বর্তমানে আমরা অনূকুল ও আস্থাশীল অবস্থানে আছি। কেউ আমাদের বিরক্ত করেননি। কমিশনে কেউ তার দাবি-দাওয়া নিয়ে আসেননি। আমরা এখনও পর্যন্ত আস্থাশীল আছি এবং থাকবো।’
নির্বাচনের সময় কী ধরনের সরকার থাকবে, সেই ব্যাপারে কমিশনের কোনও ভূমিকা নেই বলে মনে করেন সিইসি। তিনি আরও বলেছেন, ‘ইসি একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান। সরকার যে নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করে দেয়, সেভাবেই আমাদের ভোট কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। একসময় হ্যাঁ বা না ভোট ছিল। সেই সময়কার কমিশন সেই ভোট করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যে পদ্ধতি ছিল তারা সেটাই করেছে। আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে আবেদনটা ছিল, সেই আবেদন সবশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কি আমরা দেখিনি? প্রধান বিচারপতি কে হবে তার হিসাব-নিকাশ করার বিষয়টিও আমরা দেখেছি। কাজেই সবকিছু নির্ভর করে সরকার কোন ধরনের পরিবেশ ঠিক করে দেয়। এখন এই সরকারের অধীনে যে অবস্থা আছে সেভাবে নির্বাচন করতে হলে আমরা সেটি করবো। আর যদি সরকার পরিবর্তন করে তাহলে সেইভাবে হবে। কাজেই নির্বাচনের সময় কোন ধরনের সরকার থাকবে সে ব্যাপারে আমাদের কোনও ভূমিকা থাকার কথা নয়। আমরা তা নির্ধারণ করতে পারিও না।’
নূরুল হুদার ভাষ্য, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। কারও প্রতি আমাদের দুর্বলতা নেই বা কারও প্রতি কোনও শত্রুতা নেই। একইসঙ্গে কারও প্রতি কোনও আর্কষণ নেই, কারও প্রতি বিকর্ষণও নেই। আমাদের আকর্ষণ-বিকর্ষণ যাই বলেন, সেটা রয়েছে নির্বাচনি আইনের প্রতি। এজন্যই আমরা আপনাদের বিরক্ত করছি। ব্যস্ততার মধ্যেও আপনাদের আমন্ত্রণ করেছি। আমরা আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন চাই।’নির্বাচনের মাঠে যে অনেক সমস্যা ও জটিলতা রয়েছে তা স্বীকার করেছেন সিইসি।
তিনি বলেছেন, ‘অন্যান্য দেশের তুলনায় এই সমস্যা আমাদের আরও বেশি। কারণ গণতান্ত্রিক আয়ুষ্কাল আমাদের কম। কখনও হ্যাঁ-না ভোট, কখনও নির্বাচনি সরকারের অধীনে নির্বাচন, একব্যক্তির অধীনে নির্বাচন; এই অবস্থায় চলেছি। টানা তিনটি নির্বাচন একই নিয়মে করতে পারিনি আমরা। কাজেই সমস্যা তো আমাদের আছেই।’
এর আগে সংলাপে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের ঘোর বিরোধীতা করেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের এখনও দেড় বছর বাকি। নির্বাচনে সেনাবাহিনী লাগবে নাকি আনসার বাহিনী দিয়েই হবে, তা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু এত আগে সেনাবাহিনীর প্রসঙ্গ তুলে ধরার মধ্যে কোনও মতলবি আছে কিনা আমাদের ভাবতে হবে। এটি সেনাবাহিনীর গৌরবকে বিতর্ক করার চেষ্টা কিনা চিন্তা করতে হবে।’
ইসির জনসংযোগ শাখার দেয়া তালিকা অনুযায়ী দ্বিতীয় দিনের আমন্ত্রিত হিসেবে ছিলেন, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম এডিটর ইন চিফ আলমগীর হোসেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, এনটিভি প্রধান বার্তা সম্পাদক খায়রুল আনোয়ার মুকুল, এটিএন বাংলা হেড অব নিউজ জ ই মামুন, এটিএন নিউজ হেড অব নিউজ মুন্নী সাহা, চ্যানেল আই পরিচালক শাইখ সিরাজ, আরটিভি সিইও সৈয়দ আশিক রহমান, একুশে টিভি হেড অব নিউজ রাশেদ চৌধুরী, বাংলা ভিশন হেড অব নিউজ মোস্তফা ফিরোজ, সময় টিভি ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জুবায়ের, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভি নির্বাহী সম্পাদক খালেদ মহিউদ্দীন, মাছরাঙা টিভি প্রধান বার্তা সম্পাদক রেজোয়ানুল হক রাজা, গাজী টিভি হেড অব নিউজ মেজবাহ আহমেদ, একাত্তর টিভি প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু, চ্যানেল ২৪ এডিটর ইনপুট তালাত মামুন।
আমন্ত্রিতদের মধ্যে আরও ছিলেন, দেশ টিভির হেড অব নিউজ সুকান্ত গুপ্ত অলোক, যমুনা টিভি প্রধান বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদ, চ্যানেল নাইন হেড অব নিউজ আমিনুর রশীদ, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলাদেশ প্রতিনিধি আমির খসরু, বৈশাখী টিভি’র অশোক চৌধুরী, নিউজ টোয়েন্টিফোর এর হাসনাইন খুরশিদ, ডিবিসি’র মনজুরুল ইসলাম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা, সাধারণ সম্পাদক মুরসালীন নোমানী, বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক এস এম হারুন উর রশিদ এবং বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ। এছাড়াও মাই টিভি, এশিয়ান টিভি, দীপ্ত টিভি, এসএ টিভি, মোহনা টিভি, রেড়িও টুডের বার্তা প্রধানও তালিকায় ছিলেন।
এর আগে বুধবার প্রিন্টমিডিয়ার সম্পাদক, বার্তাপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপে বসে ইসি। এ সময় সব দলের অংশগ্রহণে আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করার পক্ষে মত দেন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যে ক্ষমতা আছে সেটির প্রয়োগ করার ওপরও জোর দেন তারা।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত ৩১ জুলাই থেকে সংলাপ শুরু করে ইসি। প্রথম দিন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচনে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, ‘না’ ভোট প্রবর্তন করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছিলেন।
সাংবাদিকের সঙ্গে বৈঠকের পর ২৪ আগস্ট থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু করবে ইসি। ওই দিন সকালে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফের সংগে সংলাপ হওয়ার কথা রয়েছে। আর বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) সংগে বৈঠক হবে। পরে ২৮ আগস্ট সকাল ১১টায় বাংলাদেশ মুসলীম লীগ-বিএমএল আর বিকাল ৩ টায় খেলাফত মজলিশের সঙ্গে বসবে ইসি। ৩০ আগস্ট সকাল ১১ টায় বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির আর বিকাল ৩ টায় জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপার সঙ্গে বসার কথা রয়েছে নির্বাচন কমিশনের।
সূত্র : আমার সংবাদ।