সোমবার ৯ই মার্চ, ২০২৬ ইং ২৫শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনকালীন সরকারে নজর, শর্তসাপেক্ষে বিএনপিকে ছাড়

আকাশবার্তা ডেস্ক :

নির্বাচনী বছরের প্রথম মাস থেকে দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক বাগযুদ্ধ তীব্র হয়েছে। গত দুই নির্বাচনের মতো দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- এই অবস্থান থেকে এক চুলও নড়বে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর অংশীদারিত্বেই নির্বাচনকালীন সরকার হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার এমন স্পষ্ট বার্তার পর নড়েচড়ে বসেছে দলগুলো। সংসদে থাকা ছোট ছোট দলগুলোও নির্বাচনী সরকারে অংশীদারিত্বের স্বপ্ন দেখছে। আন্দোলন জিইয়ে রাখতে মুখে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের পুরনো দাবিতে গো ধরে থাকলেও ভেতরে ভেতরে নির্বাচনী সরকারে প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছে পোষণ করছে বিএনপিও। তবে তারা কি প্রক্রিয়ায় থাকবে- সেটি এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি দলটি। অবশ্য সবকিছু নির্ভর করছে সরকারি দলের সঙ্গে রাজনৈতিক ‘গিভ এন্ড টেকে’র ওপর।

গণভবনে গত সোমবার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নে নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, বাংলাদেশ ‘ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপ অব ডেমোক্র্যাসি’ অনুসরণ করে। ব্রিটেনে যেভাবে নির্বাচন হয়, বাংলাদেশেও সেভাবেই হবে। এর মধ্যে আমরা এইটুকু উদারতা দেখাতে পারি, পার্লামেন্টে সংসদ সদস্য যারা আছে, তাদের মধ্যে কেউ যদি ইচ্ছা প্রকাশ করে, নির্বাচনকালীন সময়ে তারা সরকারে আসতে চায়, আমরা রাজি আছি। তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় বিএনপিকেও এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তারা আসেনি। এখন যেহেতু তারা পার্লামেন্টেও নেই, তাদের নিয়ে চিন্তারও কারণ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর রাজনৈতিক আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে নির্বাচনকালীন সরকার। কেমন হবে এই সরকার, থাকবেনই বা কারা? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সরকারের পরিসর ছোট করা হবে। সরকার নির্বাচনের সময়ে শুধু রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না। আর সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তার দায়িত্ব পালন করবে।

নির্বাচনকালীন সরকারে কোন কোন দল থাকবে, সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি থাকবে কিনা- এ ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। একাধিক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তে বিএনপি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নির্বাচনে আসবে। এক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে নির্বাচনকালীন সরকারেও থাকতে পারে দলটি। তবে সবকিছু নির্ভর করছে বিএনপির ‘রাজনৈতিক মান্যতা এবং শিষ্টাচারের ওপর।

শর্ত সাপেক্ষে বিএনপিকে ‘ছাড়’ : ক্ষমতাসীন দলের সূত্রমতে, সন্ত্রাসী কার্যক্রম, জ্বালাও-পোড়াও নীতি থেকে বেরিয়ে এলে নির্বাচনকালীন সরকারে বিএনপির প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে ছাড় দেয়া হবে। এক্ষেত্রে আগের মতো পাঁচটি নয় বরং তিনটি পদ বিএনপিকে দেয়া হতে পারে। তবে এখনই কিছু চূড়ান্ত হয়নি। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি (৭ মে) বনানীর সেতু ভবনে এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনে আসার ঘোষণা দিলে দলটিকে নির্বাচনকালীন সরকারে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। বিএনপি নির্বাচনে এলে তখন এক কথা। কিন্তু তারা নির্বাচন করবেই না তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া। তারা এই সংসদকে চায় না। মন্ত্রিসভা, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চায়। এসব শর্তারোপের মধ্যে আমরা কীভাবে বলব- আপনারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিতে আসুন বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয় আপনাদের দিচ্ছি? তাদের তো সম্পূর্ণ উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর অবস্থান।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, সংবিধান মেনেই নির্বাচন হবে। গত নির্বাচনগুলো যেভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে হয়েছে, এবারো ব্যতিক্রম হবে না। আর নির্বাচনকালীন সরকারে কারা থাকবে- এ ব্যাপারে দলীয়প্রধান কথা বলেছেন।

নির্দলীয় ‘রূপরেখা’ চূড়ান্ত করেনি বিএনপি : নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের পুরনো দাবিতেই অনড় বিএনপি। কিন্তু নির্দলীয় সরকারের ধরন কেমন হবে, ওই সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই দলটির। বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলটি আন্দোলনের কথা বললেও নির্দলীয় সরকার কীভাবে গঠিত হবে, কাদের সেখানে দেখতে চান- এই বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত করতে পারেননি তারা।

এদিকে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের জবাবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনই তাদের একমাত্র দাবি। তিনি বলেন, আমরা যে যুদ্ধ করছি, সংগ্রাম-লড়াই করছি, সেই লড়াইটা হচ্ছে- সত্যিকার অর্থেই প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সংসদ তৈরি করার জন্য। এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে এটা হবে না; আমরা বারবার তা বলেছি। নির্বাচনকালীন সরকার- আওয়ামী লীগ কি গঠন করবে না করবে, দ্যাট ইজ ইমমেটারিয়াল। সেটা আমাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। আমরা একটা নিরপেক্ষ সরকার চাই। সেই নিরপেক্ষ সরকার অবশ্যই নির্দলীয়ভাবে চাই, সেখানে কোনো দলীয় ব্যক্তিদের আমরা চাই না।

বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কলিমউদ্দিন আহমেদ মিলন বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার না হলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। সরকারে যারা রয়েছেন, তারা তো বিগত নির্বাচনগুলোতে তাদের পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। তাদের বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করার কারণ নেই। আমরা মোটেই তাদের কথায় মনোযোগ দেব না। গত ৪/৫ মাসে আন্দোলনে আমাদের ১৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দাবি আদায়ে আমাদের আন্দোলন চলছে। ১৯ মে থেকে সারা দেশে আবার আন্দোলন চলবে।

অংশীজনরা যা বলছেন : অগণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা নয়, এমনটি মনে করে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো। দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনে যাবে তারা। জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকুক, এটি কেউ চায় না। পার্লামেন্ট বিদ্যমান রয়েছে। এক দল চায় নির্বাচিত সরকারের অধীনেই নির্বাচন আরেক দল চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার অর্থাৎ অনির্বাচিত সরকার। আমরা জাতীয় পার্টি, সংসদের বিরোধী দল, আমরা চাই না অনির্বাচিত কেউ ক্ষমতায় আসুক। আপনারা কতজনকে নির্বাচনকালীন সরকারে চাইবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দলে অবশ্যই আলোচনা হবে। চেয়ারম্যান রয়েছেন, মহাসচিব রয়েছেন, সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা হবে।

সরকারের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনকালীন সরকার হবে। গত নির্বাচনকালীন সরকারে আমরাও ছিলাম। এবারো দায়িত্ব দিলে আমরা থাকব। তবে নির্বাচন অনির্বাচিত সরকারের অধীনে হতে পারে না।

গণতন্ত্রে অনির্বাচিত সরকারের স্থান নেই : উন্নত দেশের মতো দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হওয়া উচিত বলে মতপ্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গণতন্ত্রে অনির্বাচিত সরকারের কোনো স্থান নেই। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কী হবে, কারা থাকবেন তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।

জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন অর রশিদ বলেন, সাধারণত যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারাই নির্বাচনকালীন সরকারের রুটিন দায়িত্ব পালন করে। আমাদের দেশে এখনো গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি। নানা টানাপড়েন রয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংসদের সব দল নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবেন। ব্রিটেনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সব দল নিয়ে সরকার হয়েছিল। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। ২০১৪ সালে বিএনপিকে পাঁচটি পদের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। বিএনপি এখন সংসদে নেই, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। বিশ্বে একই সিস্টেম। তুরস্কের এরদোয়ান পদে থেকেই নির্বাচন করেছেন। পদত্যাগ করে নির্বাচন করেননি।

এ ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারে শুধু পার্লামেন্টে যারা তারা থাকবেন নাকি সংসদের বাইরের দলগুলোও থাকতে পারবে- এ নিয়ে কোনো সেট ফরমুলা নেই। রাজনৈতিক রফার ওপর এটি নির্ভর করে। কে কতটুকু ছাড় দেবে তার ওপর নির্ভর করে। রাজনৈতিক সহবতের গিভ এন্ড টেকের ওপর নির্ভর করে কারা থাকবে, কারা থাকবে না।

সূত্র : ভোরের কাগজ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১