রবিবার ৩১শে মে, ২০২৬ ইং ১৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভবনের স্থান পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানববন্ধন সেনবাগে ইয়াবাসহ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরে ১২শ’ পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা ঘোষণা : কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা অনুমোদন : লক্ষ্মীপুরে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন চন্দ্রগঞ্জে যুবদলের কর্মী সম্মেলনে নুর হোসেন হারুন সভাপতি পদে এগিয়ে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী সম্মেলন কাল : সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন রিপন চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন কৃষকদলের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা গণমাধ্যম সপ্তাহের স্বীকৃতিসহ সাংবাদিকদের ১৪ দফা দাবি, কর্মসূচি ঘোষণা

বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা

শিক্ষা ডেস্ক :

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং রোধে নেই কোনো ব্যবস্থা
  • মনস্তাত্ত্বিক বুলিংয়ে একাকিত্বে ভোগে তারা
  • বুলিং বন্ধে হাইকোর্টের কঠোর নির্দেশ
  • সচেতনতায় কমিটি গঠন ও সাইকোলজিস্ট নিয়োগ জরুরি

নানাভাবে সহপাঠীদের কাছে বুলিংয়ের (অশ্লীল, মানসিকভাবে হেয় করা, অশালীন, অশ্রাব্য কটুক্তি) শিকার শিক্ষার্থীরা। একেকজন একেকভাবে কটুক্তির শিকার হচ্ছেন। কাউকে ব্যাঙ্গাত্মক নামে ডাকা হচ্ছে। আবার কাউকে মুখের আকার আকৃতি, বডির শেমিং, শরীরের রঙ নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে। এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল বা ক্লাস টেস্ট খারাপ হলে তিরস্কার। ফলাফল কমবেশি হলে শুধু শিক্ষার্থী নয় অভিবাবকরাও নানামুখী প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন পর্যন্ত সবার কাছেই বুলিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরাও এমন পরিস্থিতিতে পড়ছেন।

এছাড়া এলাকাভিত্তিক গড়ে উঠা ক্লাব বা সামাজিক সংগঠনেও একে অপরের সাথে অসদাচরণ করছে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। ফলে সামাজিকভাবে একাকী হয়ে পড়ছে তারা। কর্মক্ষেত্রেও সহকর্মী দ্বারাও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হন অনেকেই। এমন চিত্র রাজধানীর স্কুল-কলেজসহ দেশের বিভাগীয় শহর ও উপজেলা শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। এ ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজসহ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও র্যাগিংয়ের পাশাপাশি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ছাত্রাবাস বা হলেও একই অবস্থা বিরাজমান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বুলিং’ রোধে নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ।

সর্বশেষ প্রকাশিত এক জার্নালে দেখা যায়, বুলিংয়ের মতো ঘটনার শিকার হয়েছেন এমন ৪৪.৪ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তাদের ভেতর নাম নিয়ে ব্যঙ্গাত্মকের বচনের শিকার ৩৮.৯ শতাংশ। শারীরিক গঠন নিয়ে ২৩.১ শতাংশ, শরীরের আকার আকৃতি নিয়ে ৩০.৮ শতাংশ এবং শরীরের ওজন নিয়ে ২৪.৫ শতাংশ। এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে নানান মন্তব্যের শিকার হন ২৩.৯ শতাংশ, বিভিন্ন কথা দিয়ে মজার মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার ৫৫.১ শতাংশ।

পোশাক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার ১৯.৪ শতাংশ। নাম আরিফ (ছদ্মনাম), ঢাকার কবি নজরুল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবেন। শরীরের ওজন বেশি, হাঁটাচলা ধীরস্থির, খাবার গ্রহণে লাগে দীর্ঘ সময়, সাধারণ জীবন যাপনে অন্যদের চেয়ে একটু ব্যতিক্রমী। ফলে প্রায়ই বন্ধুদের কাছে নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হয় তাকে। সহপাঠীদের এমন আচরণে সবসময় তার মন খারাপ থাকে তবে কাউকে কিছু বলতে পারেন না।

এমনকি কখনো বাবা-মাকেও জানাননি। এভাবে বডি শেমিংয়ের শিকারের বিষয়টির কথা বলছিলেন তিনি। শরীরের রঙ হালকা শ্যামবর্ণের। মুখের আকৃতিটাও একটু ভিন্ন। ফলে বান্ধবীরাও খুব বেশি মেশেন না তানজিলার (ছদ্মনাম) সাথে। টিফিন সময়ে একসাথে বান্ধবীরা নাশতা করলেও তার সাথে কেউ করতে চাই না। তাই সে নিজ থেকেই একা একা থাকে। বাসায় আসলেও মন খারাপ করে থাকে। বহু বলার পর বিষয়টি আমাকে জানায়। এভাবেই তার মেয়ের কথা বলছিলেন রাজধানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীর মা।

জানা যায়, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিং ও র্যাগিং বন্ধে ‘শিক্ষা আইন-২০১’ চূড়ান্ত খসড়া করা হয়। এতে বলা হয়— উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজ নিজ নীতিমালা বা নির্দেশিকা জারি করবে। আর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তর নীতিমাল বা নির্দেশিকা জারি করবে। এ ছাড়া গত রোববার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগ ডে উদযাপনের নামে ডিজে পার্টি, উদ্দাম নৃত্য, বুলিং, অশ্লীলতা ও নগ্নতা ৩০ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।

এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ট্রেইনি কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট আশিকুর রহমান আমার সংবাদকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে চার ধরনের বুলিং হয়ে থাকে। ভার্বাল বুলিং, ফিজিক্যাল বুলিং, সাইকোলজিক্যাল বুলিং, সাইবার বা অনলাইন বুলিং। এ ছাড়া সাইকোলজিক্যাল বুলিংয়ের মধ্যে অন্যতম হলো— ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারো সাথে সঠিক আচরণ না করা। সরাসরি কাউকে কষ্ট না দিয়ে পরোক্ষভাবে এমন অযাচিত আচরণ করা যা তাকে পরবর্তিতে কষ্ট দেয়। যেমন— কোনো শিক্ষার্থীকে বন্ধুদের গ্রুপ থেকে আলাদা করে দেয়া, খেলাধুলায় না নেয়া, টিম ওয়ার্ক থেকে তাকে এড়িয়ে চলা ইত্যাদি। সাইকোলজিক্যাল অথবা মনস্তাত্ত্বিক বুলিং একজন শিক্ষার্থীর কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। শিশুর সামাজিক উদ্বিগ্নতা তৈরি করতে পারে। শিশুর ভবিষ্যতে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। শিশু একাকী থাকতে চায় কেন না, সে বুলিং হওয়ার ভয়ে থাকে। এভাবেই তার মনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে। গুরুতর মানসিকভাবে বিষণ্নতার সম্মুখীনও হতে পারে। নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেভাবে বুলিংয়ের শিকার শিশুদের রিকভার করা যায়। শিশুর ইতিবাচক মূল্যবোধ ও প্রতিভাকে স্বীকৃতি দেয়া। এটা শিশুর কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে। সোশ্যাল এংগেজমেন্ট সমস্যার জন্য অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা পালন করে তাদের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করাতে হবে। ছোট ছোট অর্জনগুলোর জন্য তাদের উৎসাহ দেয়া ও মোটিভেট করা। অভিভাবকদের নিজদেরও সাপোর্ট সিস্টেমগুলো শিখে নেয়া। শিশুদের কথাগুলো শোনা, বোঝা ও তাদেরকে যে গুরুত্ব দিচ্ছেন সেটা প্রকাশ করা। বেশি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হলে একজন প্রফেশনালের কাছ থেকে কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপি নেয়া।’

এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহীন মোল্লা বলেন, ‘বুলিং প্রতিরোধে প্রায় ৯৯ শতাংশ স্কুল-কলেজে কোনো ব্যবস্থা বা কোনো কমিটি নেই। তবে সব বিশ্ববিদ্যালয়েও নেই। হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক্ষেত্রে আগের থেকে একটু বেশি সচেতন হচ্ছে। এ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থী মেন্টাল হেরেজমেন্ট বা যৌন হয়রানির শিকার হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অফিস বা প্রশাসনে বিচার দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থাও নিচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তো নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ ব্যাপারে যেভাবে কাজ করছে তাতে আমি সন্তুষ্ট নই।

কারণ শুধু অপরাধের বিচার করলেই হবে না, এটি প্রতিরোধে সচেতনতাও বাড়াতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক শিক্ষার অভাব ও মাদকের প্রভাবে এখন বেশি বুলিং হচ্ছে। আগে যে হতো না তেমনটা নয়। পরিবারে বাবা-মায়ের মাঝে কলহ বিবাদেও সন্তানরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। দেশের মাত্র পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজি বিভাগ রয়েছে। সাইকোলজি বিভাগ থাকলেই যে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোনো উপকার হচ্ছে বিষয়টি এমন নয়। তবে বুলিং বা যেকোনো ধরনের হেরেজমেন্ট প্রতিরোধে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি কমিটি গঠন করতে হবে এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অবশ্যই একজন সাইকোলজিস্ট বা মনোবিদ নিয়োগ দিতে হবে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, ‘কোনো শিক্ষার্থী বা কেউ বুলিংয়ের শিকার হলে তারা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। কারো যদি কোনো আর্থিক সমস্যা থাকে তাহলে তারা লিগ্যাল এইডের সহায়তা নিতে পারবেন।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মে ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« এপ্রিল    
 
১০১১১২১৩১৪১৫
১৬১৭১৮১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
৩০৩১