বুধবার ৩রা জুন, ২০২৬ ইং ২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্রসহ দুই যুবক আটক চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভবনের স্থান পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানববন্ধন সেনবাগে ইয়াবাসহ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার লক্ষ্মীপুরে ১২শ’ পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা ঘোষণা : কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা অনুমোদন : লক্ষ্মীপুরে আনন্দ মিছিল চন্দ্রগঞ্জে খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন চন্দ্রগঞ্জে যুবদলের কর্মী সম্মেলনে নুর হোসেন হারুন সভাপতি পদে এগিয়ে চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের কর্মী সম্মেলন কাল : সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন রিপন চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়ন কৃষকদলের ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা

নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জাফলংয়ের রূপ দেখে মুগ্ধ পর্যটকরা

ট্যুরিষ্ট গাইডারদের সাথে আলাপ।

মো. আলী হোসেন, জাফলং থেকে ফিরে :

বাংলাদেশে জাফলংয়ের মতো এমন সৌন্দর্য্য খুঁজে পাবেন না। প্রাকৃতিক, নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যে ঘেরা জাফলংয়ের রূপ দেখে বিমোহিত হয়নি এমন মানুষ পাওয়া দুস্কর। এটি পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণীয় স্থান। সৌন্দর্য্য আর আকর্ষণ নিয়ে সিলেটের খাসিয়া পাহাড়ের কোলে জাফলং তার এক নৈসর্গ নিকেতন সাজিয়েছে। পিয়াইন নদী আর জাফলং বা সারি নদীর তীরে গড়ে উঠেছে পাথরের এক সাম্রাজ্য।

চারদিকে বিচিত্র রঙ্গের পাথর, স্বচ্ছ হিমেল পানির উপর হতে দেখা যায় নদীর নীচের বালি পর্যন্ত। পানিতে হাত লাগালে যেন পুরো শরীর জুড়িয়ে যায়। এমন দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। অপরদিকে ভারত সীমান্তে ঝুলন্ত ব্রিজ মিলেছে দুই পাহাড়ের মেলবন্ধনে। এছাড়াও জাফলংয়ে রয়েছে গভীর অরণ্যাঞ্চল। উপজাতি খাসিয়াদের বসবাস এখানে। রয়েছে খাসিয়াদের রাজার বাড়ি। মাচার ওপর ছোট ছোট ঘরগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। জাফলংয়ের এত রূপ দেখার মূল সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ। রাস্তার অবস্থা এতটাই বেহাল যে মানুষকে খুবই কষ্ট দেয়। তবে কষ্ট ভোগ করে যখন মানুষ জাফলংয়ের মূল পয়েন্টে যায় তখন এর রূপ দেখলে কষ্টকে ভুলিয়ে দেয়। অবশ্য ওখানকার স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে সিলেট থেকে জাফলং জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য ১৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছে একনেক।

এখানে খাসিয়াদের পেশা হচ্ছে বাগান থেকে পান সংগ্রহ করে খিলি বানিয়ে দোকানে সরবরাহ করা। এ পেশায় কাজ করেন মূলত নারীরা। পুরুষরা অন্য পেশায়ও কাজ করেন। তবে খাসিয়াদের জীবনযাপন অনেকটা রাজার হালের মত। বসতঘরগুলো পাকা এবং খুবই নান্দনিক।

জাফলংয়ের মানুষ কর্মপাগল। সকাল ৭টায় কাজে নেমে পড়লে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ চলতে থাকে। তবে জাফলংয়ের বেশিরভাগ মানুষের কাজ পাথর উত্তোলন, চা বাগানে শ্রমিকের কাজ বা পর্যটকদের নিয়ে ঘুরে দেখানো, যাদেরকে বলা হয় ট্যুরিষ্ট গাইডার। পাথর সরবরাহ, চা উৎপাদন এবং ট্যুরিষ্ট গাইডারদের দিয়ে এক শ্রেণির প্রভাবশালী লোক কোটি কোটি টাকার মালিক হলেও এসব পেশায় নিযুক্ত শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়না কখনও।

জাফলংয়ে গিয়ে যখন নামি তখন অনেক যুবককে ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতে বা কাদে নিয়ে ঘুরতে দেখি। মাইক্রোবাস থেকে নামতেই তাদের কয়েকজন এসে ঘিরে ধরে বলল স্যার ছবি তুলবেন? সাথে সাথে প্রিন্ট করে দেয়া যাবে। তাদের পেশাই হচ্ছে ট্যুরিষ্টদের পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখানো এবং ছবি তুলে সরবরাহ করা। এ পেশায় এখানে প্রায় ২শ’ জন কাজ করেন। এদেরকে বলা হয় পর্যটক গাইডার বা ফটোগ্রাফার।

পিয়াইন নদীর দৃশ্য।

তাদের মধ্যে কথা হয় আবুল কালাম ও মিঠুন মাল নামে দুইজনের সঙ্গে। তারা জানান, দৈনিক ৫শ’ থেকে ৭শ’ বা সর্বোচ্চ কখনও কখনও ১ হাজার টাকা পর্যন্ত তাদের রোজগার হয়। কিন্তু এর অর্ধেক ক্যামেরার মালিক স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভাগ দিয়ে দিতে হয়। আবার কখনও একেবারে আয় রোজগার হয়না। একেকজনের ৬-৭ জন সদস্যের সংসারে দৈনিক যে আয় হয় তা দিয়ে তাদের চলেনা। জাফলংয়ের জিরো পয়েন্টের কোল ঘেঁষা পাহাড়ের চূড়ায় বিজিবির সীমান্ত ফাঁড়ির গেইটের সামনের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা নিজেদের দুঃখের কথাগুলো বলতে লাগলেন। তারা বলেন, স্যার কষ্ট করে আমরা টাকা কামাই কিন্তু ক্যামেরার মালিকরা তার অর্ধেক ভাগ নিয়ে যায়। নিজেরা ক্যামেরা কিনে কাজ করতে পারনা? জানতে চাইলে তারা বলেন, ক্যামেরা কিনলেও কাজ করতে দিবেনা। ওদের হয়েই এখানে কাজ করতে হবে, না হলে খেদাই দিবে। তবে তারা এমন অবস্থার পরিবর্তন চান। তারা বলেন, স্যার এসব জোরদারদের কবল থেকে আমরা মুক্তি পেলে মোটামুটি যা আয় হয় তা দিয়ে আমাদের সংসার ভালোভাবে চালাতে পারব। তাই বর্তমান সরকারের নবনিযুক্ত বিমান ও পর্যটনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এ পেশার লোকজন।

অন্যদিকে পিয়াইন নদীর ওপাড়ে বিশাল চা বাগান। পিয়াইন নদীর এপাড়-ওপাড়ের মেলবন্ধনে সরকার ব্রীজ নির্মাণ করছে। ব্রীজটির নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। চা বাগানের পথ ধরে হেঁটে চলতে খুবই ভালো লাগে। সারি সারি চা গাছগুলো যখন বাতাসে দোল খায় তখন চোখ ধাঁধানো এক অপরূপ দৃশ্য ধরা দেয়।

এই চা বাগানে নারী শ্রমিক প্রায় ৫ হাজার আর পুরুষ শ্রমিক হাজারখানেক হবে। নারী শ্রমিকরা কাজ করে দৈনিক ২শ’ টাকা পারিশ্রমিক পান, পুরুষ শ্রমিকরা আরো কম পান। এতে তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।

চা বাগানে হাঁটতে হাঁটতে কথা হয় চা শ্রমিক মনোয়ারা ও সুমনের সঙ্গে। তারা জানান, ৬-৭ জনের সংসারে দৈনিক ২শ’ বা তার চেয়ে কম টাকা বেতন পান। এ দিয়ে তাদের চলেনা। সন্তানদের পড়ালেখাও করানো সম্ভব হয়না। তারা বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এমন সময় যেখানে তাদের দু’বেলা পেট পুরিয়ে খাওয়াই সম্ভব নয়, সেখানে তাদের স্বাদ আর স্বপ্ন পূরণের কথা তো ভাবাই যায়না।

পিয়াইন নদীর পাড়ে বালি চেঁকে পাথর সংগ্রহ।

জাফলংয়ের পুরো এলাকার যেদিকে তাকাই শুধু বালি আর পাথরের মরুভূমি। বালিময় বিশাল মাঠে যখন হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল এটি মরুভূমির কোনো এক দেশে বেড়াতে এসেছি। বালি আর পাথরের বিশাল এলাকার বুক চিরে প্রবাহমান নদীর পানি এতটাই স্বচ্ছ পানির নীচে চকচকে বালিরাশি স্পষ্ট দেখা যায়। সূর্যের প্রখর রোদেও প্রবাহমান পানি খুবই ঠান্ডা। পানিতে হাত লাগালেই শীতল অনুভূতি খুবই ভালো লাগে।

তবে জাফলংয়ের অপরূপ সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি দেখতে হলে ২/৩ দিন সময় খুবই নগণ্য। সময় এবং সামর্থের স্বল্পতার কারণে এখানের অনেককিছু দেখার সুযোগ হয়নি আমাদের। সৌন্দর্য্যময় এই অপরূপ জাফলং দেখার আমন্ত্রণ রইল পর্যটকদের।

চা বাগানের শ্রমিক মনোয়ারার সাথে স্বাক্ষাৎকার।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

জুন ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মে    
 
১০১১১২
১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭২৮২৯৩০