বুধবার ১৮ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

৩ কারণে নির্বাচনে যাবে বিএনপি

আকাশবার্তা ডেস্ক : 


একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা ততই বাড়ছে। ইতোমধ্যেই নির্বাচনে যাওয়া, না যাওয়ার প্রশ্নে বিএনপির মধ্যে একাধিক মত দেখা দিয়েছে। কেউ মনে করছেন, নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া উচিত নয়। অন্যদিকে বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং অসুস্থ খালেদাকে কারাগার থেকে বের করার কৌশলে হলেও নির্বাচনে যাওয়া উচিৎ বলে মনে করছেন দলটির অন্য অংশ। খালেদাকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে যাবে না বিএনপি।

ভুঁইফোড় সংগঠনের ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এসে দলের শীর্ষ নেতারা এমন কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের অধীনে ৫০ আসনের ইঙ্গিত পেলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে দলটি! দলের বিশ্বস্ত সূত্রের মত, এ ৫০ আসনের ভাগ-বাঁটোয়ারার দায়িত্বে আছে দলের এক স্থায়ী কমিটির সদস্য ও এক ভাইস চেয়ারম্যান। আসন প্রত্যাশিত ব্যক্তিরা এ দুই ব্যক্তির দরবারে এখন থেকেই ছুটছেন।

এ দিকে নির্বাচনের আগে আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য কৌশলে বিএনপি ছাত্রদল ও যুবদলের কমিটি গঠন করে দেশব্যাপী দলের মধ্যে ভাঙন তৈরি করে দিয়েছে দলের আরেকটি ষড়যন্ত্রকারী অংশ। এছাড়াও বিএনপি ৩ কারণে ক্ষমতাসীনদের অধীনেও নির্বাচনে যাওয়ার দিক স্পষ্ট হচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে রাজনৈতিক ঐক্য, তৃতীয় শক্তির পাশাপাশি আন্দোলনকেও গুরুত্ব দিচ্ছে দলের হাইকমান্ড। রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, অতীতের সব নির্বাচনের চেয়েও এবার একাদশ সংসদ নির্বাচন অনেক বেশি গুরুত্ববহন করবে। দেশের ক্ষমতাধর তিন রাজনৈতিক ব্যক্তিরই হতে পারে একাদশ সংসদ নির্বাচন শেষ নির্বাচন!

আওয়ামী লীগ সভাপতি, জাতীয় পার্টির (জাপা)র চেয়ারম্যান এবং কারাগারে থাকা সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসনের। ধারণা করা হচ্ছে যেহেতু শেখ হাসিনা অনেক বক্তৃতায় শেষ নির্বাচন হিসেবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা বলেছেন। এবং তিনি একটি অনুষ্ঠানে এ-ও বলেছেন ‘এরপর আমি আর নির্বাচন করবো না।’ এটিই তার শেষ নির্বাচন, এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জন্যও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ নির্বাচন বলে মনে করছেন।

এছাড়া বিএনপির নীতিনির্ধারকদেরও ধারণা, বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হতে পারে এবারের একাদশ সংসদ নির্বাচনই বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শেষ নির্বাচন। বিএনপির প্রকৃত আদর্শের অনুসারী শীর্ষ নীতিনির্ধারকের ভাষ্য, শেখ হাসিনার অধীনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও বেগম জিয়াকে মুক্তি ছাড়াই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে বর্তমান সরকারকে শুধুই বৈধতা দেওয়া। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির পক্ষ থেকে হাসিনার অধীনে নির্বাচনকে হালাল সনদের স্বীকৃতি দেয়া।

তবে দলের অন্য একটি মত, খালেদা জিয়ার মুক্তি, জামিন অথবা কারাগারে থেকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারলেই বিএনপির নির্বাচনে যাওয়া উচিত। কিংবা নির্বাচনের আগে আপসের অংশ হিসেবেই সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেবে বা খালেদাকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হতে পারে অথবা কারাগারে থেকেই তিনি নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন এমন ইঙ্গিতেই বেগম জিয়াকে নির্বাচনের সুযোগ দিলেই কেবল তখনই নির্বাচনে যাওয়া উচিত বিএনপির। অন্যদিকে বিএনপিতে সংস্কারবাদী নেতাদের মত, বিএনপি যদি নির্বাচনে যাবেই তাহলে ২০১৪-তে কেন নির্বাচনে গেল না। ওই সময় পরিস্থিতি তো আরও ভালো ছিলো। এখন নির্বাচনে গেলেই এই সরকার বৈধতা পাবে আর বিপন্ন হয়ে পড়বে বিএনপির অস্তিত্ব।

অন্যদিকে বিএনপির সুবিধাভোগী নেতাদের যুক্তি হলো, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আগে যদি খালেদা জিয়ার মুক্তি মেলে কিংবা প্যারোল বা জেলে থেকেও খালেদা যদি নির্বাচন করে তাহলে বিএনপিতে অন্যরকম একটি আমেজ তৈরি হবে। বিএনপির জনপ্রিয়তার বেড়ে যাবে বহুগুণে। আর এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই বিএনপি নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারবে। এর ফলে খালেদা জিয়ার মামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বিএনপির অনুকূলে নিতে সহজ হবে। তাদের মূল ভাষ্যই হচ্ছে, খালেদা জিয়া যদি এই সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে পারেন তাহলে বিএনপির উচিত হবে নির্বাচনে যাওয়া। এদিকে বিএনপির বুদ্ধিজীবী নেতাদের ধারণা, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আপাতত এ সরকারের অধীনে নেই।

ক্ষমতাসীনদের ইঙ্গিতে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস নিশ্চিত হয়ে আছে। তাদের মতে, এই মামলাই তো শেষ নয়, আরও অনেক মামলা আছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে না যেতে পারলে বাকি মামলাগুলোতেও দন্ডিত হতে পারেন বেগম জিয়া। আর ঘটনা যদি এমনই হয় তাহলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে বিএনপি। আর এবার নির্বাচনে অংশ না নিলে নিবন্ধনই বাতিল হতে পারে বিএনপির।

এছাড়া দলের অন্য একটি সূত্রের মত, বিএনপির বিলুপ্ত ৭ ধারা পরিবর্তনের মূল ইঙ্গিতই হলো শেষ পর্যায়ে হলেও বিএনপি অংশগ্রহণ করবে।রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবার হয়তো ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন হবে না। বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও অনেক দলই অংশগ্রহণ করবে। নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আর এ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব। তাই সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি যেমন অংশ নিচ্ছে, তেমনি দেশের যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক না কেন, জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করবে দলটি। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রোগ্রামে বিএনপি মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির বিতর্কিত সদস্য মওদুদ আহমেদও বিএনপি নির্বাচনমুখী দল বলে দাবি করে একাদশ সংসদ নির্বাচনে খালেদার মুক্তির মাধ্যমে নির্বাচনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এ নিয়ে লন্ডনের একটি সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু বিএনপির হাতে আর সব মিলিয়ে দুমাস সময় আছে সেহেতু আন্দোলন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে সমানতালে। এরই মধ্যে লন্ডনে বসেই তারেক রহমান জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা যাচাই-বাছাই করছেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকার ডকুমেন্ট সংগ্রহ এবং দলে ত্যাগী প্রভাবশালী দিকগুলো বিবেচনা করছেন। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মামলা, পত্রিকার কপিও সংগ্রহ করছেন তিনি।

এ ছাড়া জানা গেছে, এখন প্রতিদিনই তারেক রহমান তৃণমূলে নেতাকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন। রাজপথে নামার জন্য নানা কৌশল ও দিক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। ক্ষমতায় আসার মূল হাতিয়ার হিসেবে তৃণমূলকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারেক। তবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বিএনপির হাইকমান্ড নেতাদের ওপর ক্ষেপে আছেন। তাদের বক্তব্য দলের শীর্ষ নেতারা প্রতিদিন ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে এসে রাজনৈতিক ঐক্য, তৃতীয় শক্তির বুলি ছুড়ে তিনবারের রাষ্ট্র পরিচালনা করা রাজনৈতিক দল বিএনপির মেরুদন্ড ভেঙে দিচ্ছে। তারা মনে করছেন, যেসব নেতা এখনো মনে করছেন আন্দোলন ছাড়া অন্যের সাহায্য-সমঝোতায় খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে তাদের রাজনীতিই করা উচিৎ নয়। আওয়ামী লীগ জানে তারা যদি ক্ষমতার আসন থেকে সরে পড়ে তাদের অবস্থা কী হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজেই এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

তা ছাড়া আওয়ামীলীগ দীর্ঘ ক্ষমতায় থেকে দেশের বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, মানবাধিকার, অর্থনৈতিক মেরুদন্ড, মত প্রকাশের অধিকার, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কোটা আন্দোলন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকেও নিজেদের অনুকূলে নিতে সফল হয়েছেন। যতদিন শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকবে ততদিন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে নামবে না। আন্দোলনের বিকল্প হিসেবে বিএনপি নীতিনির্ধারকরা অন্যকিছু চিন্তা করে তাহলে তা হবে দলের সাথে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তবে আন্দোলনের সমীকরণ অন্যকিছু মনে করছেন তৃণমূল। দলের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান মাস দুয়েক পর দলের সব সিদ্ধান্ত নিজে দেবেন।

তৃণমূলকে পরিচালনা করার একাই দায়িত্ব নেবেন তিনি। তখন এ নিয়ে দলে সিনিয়র-জুনিয়র মূল্যায়ণ নিয়ে ভাঙনের আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ নিয়ে তারেকের দুই ছক রয়েছে বলে ধারণা করছে তৃণমূল ও প্রভাবশালী নেতারা। এক. তৃতীয় শক্তিকে উস্কে দেয়া অন্যদিকে সহিংস আন্দোলন। খালেদা জিয়ার মুক্তি ব্যতিত বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা জানতে চাইলে দলের ভাইস চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিএনপিতে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি শতভাগ আছে। ১০ বছর আগেই বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতি তৈরি করে রেখেছে।

২০১৪ সাল থেকেই বিএনপি প্রস্তুতি নিয়ে আছে। কেউ যদি দেশের জনপ্রিয় নেত্রীকে আটক রেখে, পা বেঁধে নির্বাচন করতে চায় অবশ্যই সেই নির্বাচন কেউ মেনে নেবে না। আগে খালেদা জিয়ার মুক্তি তবেই নির্বাচন। তার আগে ক্ষমতাসীনদের অধীনে থাকা সংসদ ভেঙে দিতে হবে, সেনাবাহিনীকে মেজ্যিস্ট্রেসি পাওয়ার দিতে হবে এবং সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিএনপি নির্বাচনমুখি দল। তেমনি বিএনপিও নির্বাচনে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে বলে জানান দলের এই নীতিনির্ধারক।

এ নিয়ে সাবেক এ সেনা প্রধান ও বিএপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান আমার সংবাদকে বলেছেন, দেশে এখন চরম সংকট বিরাজ করছে। আর এ থেকে মুক্তির জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তি ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে দিতে পারে। তবে বিনপিকে ভাঙার জন্য নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও জানান তিনি। যত দিন জিয়ার চেতনা বিএনপির মধ্যে থাকবে, ততদিন এ দলকে কেউ ভাঙতে পারবে না। কারণ এ দল ভেসে আসা কোনো দল নয় বলেও মন্তব্য দলের এই শীর্ষ নীতিনির্ধারকের।

সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১