সোমবার ২০শে এপ্রিল, ২০২৬ ইং ৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল :   বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জুলাই যোদ্ধা ফোর্সের সংঘর্ষ : পুলিশসহ আহত ১০ চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রমিক দলের সদস্য হলেন মনির আহম্মদ রাজন কফিলউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ঈদের আগে অস্থির মুরগির বাজার, সবজিতে স্বস্তি আজ যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা ফ্লাইট বাতিলে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে সহায়তা করবে সরকার চন্দ্রগঞ্জে অস্ত্র-গুলিসহ ৩ ডাকাত গ্রেপ্তার চন্দ্রগঞ্জ প্রেসক্লাবের উদ্যোগে ইফতার ও দোয়ার মাহফিল ভূমিকম্প মোকাবিলায় ঢাকায় ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের নির্দেশ ইসরায়েলে ও যুক্তরাষ্ট্রে এমন হামলা হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি

পাকিস্তানের নেতৃত্বে ইমরান, জিন্নাহর স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : 


জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে চমক দেখালেন পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফের (পিটিআই) প্রধান ইমরান খান। সর্বশেষ খবর অনুয়ায়ী তার দল ১১৯ আসন পেয়ে এগিয়ে রয়েছে। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পর এক ভাষণে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতেন; তিনি ও তার রাজনৈতিক দল পিটিআই সেই পাকিস্তান গড়তে চায়। সূত্র- ডন

গত বুধবার নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হওয়ার পর এক ভাষণে দীর্ঘ ২২ বছরের সংগ্রামের কথা উল্লেখ করে ইমরান খান বলেন, গত দুই দশক ধরে তিনি যে অঙ্গীকার বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখতেন, অবশেষে সেই সুযোগ তাকে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমি রাজনীতিতে কেন এসেছি সেটি পরিষ্কার করতে চাই। রাজনীতি আমাকে কিছুই দিতে পারবে না। কিন্তু পাকিস্তানকে এমন একটি দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছি, যা আমার নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বপ্ন দেখতেন। ইমরান বলেন, আমি বেলুচিস্তানের মানুষের প্রশংসা করতে চাই। তারা যে ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে এবং ভোট দেয়ার জন্য বেরিয়ে এসেছে; এজন্য পুরো জাতির পক্ষ থেকে আমি তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। অনেক মানুষ এই নির্বাচনের জন্য অনেক কিছু উৎসর্গ করেছেন। আমি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করতে চাই। আমি যে ধরনের পাকিস্তান গড়ার স্বপ্ন দেখছি তা সবাইকে জানাতে চাই। এমন একটি দেশ গড়তে চাই, যা মদিনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; যেখানে কর্তৃপক্ষ বিধবা এবং গরিব মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করতো। এখন থেকে আমাদের সব নীতিমালা হবে দরিদ্র-অসহায় মানুষের ভাগ্য গড়তে কাজ করা।

জাতীয় পরিষদের ২৭২টির মধ্যে ১১৯টি আসন পেয়ে এগিয়ে আছে ইমরানের দল। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ১৩৭টি আসন পেতে হবে তার দলকে। নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লিগ বা পিএমএল-এন এগিয়ে আছে ৬১টি আসনে আর বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি, পিপিপি এগিয়ে আছে ৪০টি আসনে। তবে ইমরান খানের দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে তাকে জোট গঠনের পথে হাঁটতে হবে।পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে গত বুধবার ভোটগ্রহণ শেষে চলছে গণনা। বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ফলাফল আসছে। পিটিআই ফলাফলে এগিয়ে থাকায় তার সমর্থকরা ইতোমধ্যেই রাস্তায় নেমে উল্লাস করছেন। নির্বাচনে এখন পর্যন্ত ৪৭ শতাংশ কেন্দ্র থেকে ফল প্রকাশ হয়েছে। তবে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে ভোট গণনা চলছে ধীরগতিতে। এ জন্য নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছে বিরোধী দল। কারণ নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা ছিল রাত দুইটায়, কিন্তু অনেকটা সময় গড়িয়ে গেলেও অর্ধেকের বেশি ভোট গণনা হয়নি। তাই দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন অভিযোগ করেছে, যে প্রক্রিয়ায় গণনা চলছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি একধরনের আঘাত।

ইমরান খানের দলের মুখপাত্র ফাওয়াদ চৌধুরী টুইটারে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তবে জোট গঠন করতে হলে ইমরান খানকে ছোট দল এবং স্বতন্ত্র হিসেবে বিজয়ী প্রার্থীদের সাথে আলোচনায় বসতে হবে। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনার বাবর ইয়াকুব গতকাল সকালে সাংবাদিকদের বলেন, যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে ভোট গণনায় বিলম্ব হচ্ছে। এবার ভোট গ্রহণ হয়েছে ইলেক্ট্রনিক রিপোর্টিং সিস্টেমে। পুরো ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থাটা অচল হয়ে পড়ায় ফলাফল ঘোষণায় দেরি হচ্ছে। আর এখন টালির মাধ্যমে সাধারণ পদ্ধতিতে গণনা চলছে। তিনি আরও বলেন, এখানে ষড়যন্ত্রের কোনো ব্যাপার নেই, এমন কি কোনো চাপের মুখে আমরা এমনটা করছি না। এছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার সরদার মোহাম্মদ রাজা জানিয়েছেন, নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। তবে ঠিক কখন ভোট গণনা শেষ হবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু জানাননি তিনি।

গতকাল সকালে নওয়াজ শরিফের ভাই শেহবাজ শরিফ, যিনি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনি নির্বাচনে অস্বচ্ছতার অভিযোগ এনে বলেন, ভোট গণনার সময় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পর্যবেক্ষকদের গণনাকেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে সেনারা। পিপিপিও একই অভিযোগ করেছে। ভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে পিএমএল-এন। তবে সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এদিকে, নির্বাচনের ফলাফল আসতে শুরু করার পর শেয়ারবাজারের সূচক উঠতে শুরু করেছে। কারণ অনেকেরই ধারণা এবারের জোট সরকার খুব একটা দুর্বল হবে না। পাকিস্তান বেশ কিছুদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকট পার করছে। গত বুধবার নির্বাচন চলাকালীন কোয়েটাতে আত্মঘাতী হামলার দায় স্বীকার করেছে তথাকথিত ইসলামি জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট, আইএস। ওই হামলায় নিহত হয়েছেন ৩১ জন।পাকিস্তানের ইতিহাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বেসামরিক দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে যাচ্ছে। এর কারণে এবারের নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বিশ্ব গণমাধ্যম। এবার ১০ কোটি ৬০ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নির্বাচনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ : ইমরানের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলওয়াল ভুট্টো নির্বাচনে অব্যবস্থাপনা সেই সঙ্গে বড় ধরনের ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। ভোটের ফলাফল খুব ধীরে ধীরে প্রকাশ করায় তারা এমন অভিযোগ তোলেন। নির্বাচনে ভোট গ্রহণ এবং ভোট গণনা নিয়ে শুরু থেকেই এমন নানা বিতর্ক দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের আগে থেকেই নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ- অভিযোগ করেছে যে, পিটিআইকে বিজয়ী করতে আদালতের সহায়তা নিয়ে সেনাবাহিনী কয়েকটি স্থানে তাদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় অভিযান চালিয়েছে।

এদিকে স্বাধীন গণমাধ্যম বলছে, পিটিআইয়ের বাইরে অন্য দলগুলোকে দমন করার প্রচেষ্টাও চালিয়েছে সেনাবাহিনী। যদিও সেনারা এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে মানবাধিকার কমিশনও নির্বাচনের বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন যে, ভোট গণনার সময় তাদের পোলিং এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

কে এই ইমরান খান : এক সময়কার এই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তারকা ১৯৯২ সালে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশের জন্য বিশ্বকাপ জয় করেছিলেন। ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তিনি। প্লেবয় জীবনধারা এবং তিনটি বিবাহের কারণে গণমাধ্যমের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন তিনি। ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলটি চালু করেন কিন্তু দীর্ঘদিন তিনি নেতা হিসেবে পেছনের সারিতে ছিলেন। পাকিস্তানের দুর্নীতি এবং বংশীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন তিনি। অভিযোগ উঠেছে যে, তার দল সামরিক মধ্যস্থতার সুবিধা নিয়েছে। যদিও ইমরান খান এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।

প্রসঙ্গত, পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাও দেশটার কম ক্ষতি করেননি। দুর্নীতির রেকর্ডে নওয়াজ পরিবার বনাম ভুট্টো পরিবারের ফারাক উনিশ-বিশের বেশি না। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা তারা করেছেন দুর্নীতি ও মাফিয়াতন্ত্রের মাধ্যমে রাজনীতির অপরাধীকরণ করে। তারা যখন টাকা বানাতে ব্যস্ত, তখন পাকিস্তান অর্থনৈতিক উদরাময় নিয়ে চীনের বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে গিয়েছে। আর পাকিস্তানের প্রতিটি ব্যর্থতায় তৃপ্তির ঢেকুর তুলেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। আর যতই ভারতের হাতে তারা মার খেয়েছে, ততই ভারতবিরোধিতার পালে বাতাস লাগিয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে জেনারেলদের সম্পদ-শক্তি ও প্রভাব। দিনের শেষে আমেরিকার ‘ডার্লিং’ হলো ভারত, পাকিস্তানের জন্য রইল সমস্যামুখর সীমান্ত।

এদিকে ইমরানের জয়ে জয় হলো তৃতীয় শক্তির। প্রথমত, তিনি দুই দলের বাইরের তৃতীয় শক্তি, দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র হয়ে বসা, তৃতীয় শক্তি সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি এবং তার নিজের ইমেজ ও পন্থারও জোর আছে। তিনি পাকিস্তানকে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের অক্ষ থেকে সরিয়ে চীনের বেল অ্যান্ড ওয়ের মহাসড়কে ওঠাতে চান। তিনি ভারত প্রশ্নে ততটা আপসপন্থি নাও হতে পারেন। তালেবানদের তিনি আপসের ‘সুপথে’ আনার পক্ষপাতি। রাজনৈতিক কৌশল, সততা ও দেশপ্রেম থাকলে হয়তো পরিবর্তন আনা তার পক্ষে সম্ভব। আর তা করতে হলে মুরুব্বি সেনাবাহিনীর সঙ্গেই হবে তার আখেরি খেলা। এর জন্য পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তত একটিকে সঙ্গে নেওয়া তার দরকার হবে। সরকার গঠনে হয়তো তাই তিনি পিপলস পার্টির নেতা বিলাওয়াল ভুট্টোর সাহায্য চাইতে পারেন। ইমরানের একিলিস হিল বা নাজুক গোড়ালি সেনাছাউনি হলেও তার কিছু সবল দিক আছে। তিনি পরিবারতন্ত্রের ভেতর থেকে আসেননি, বরং তার বিরুদ্ধেই ছিলেন। তিনি ভারত ও আমেরিকার থেকে একটু দূরত্বে দাঁড়ানো, আবার ক্রিকেটার ইমেজের কারণে এই দুই দেশেই তার ভক্ত থাকা স্বাভাবিক। তার দুর্নীতির বড় রেকর্ডের সুযোগ হয়নি। তালেবান ও দুর্নীতির রাশ টানার লক্ষণ তার নেতৃত্বে দেখা গেছে। নির্বাচনে কারচুপির পরও এসব কারণে তার একটা সুযোগ ছিল এবং ভোটাররা আত্মবিশ্বাসী নতুন মুখকে সুযোগ দিয়ে থাকেন। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু না থাকলেও ক্যাপ্টেন ইমরানের জন্য অপেক্ষা করছে চ্যালেঞ্জ। একদিকে সেনাবাহিনী, যুদ্ধ, দুর্নীতি, জঙ্গিপনা ও স্বৈরাচার, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে সফল পাকিস্তানের কর্মসূচি।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

এপ্রিল ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« মার্চ    
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০