আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) জয়ী হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির নির্বাচন কমিশন। তবে জয়ী হলেও ইমরানের দল প্রত্যাশিত আসন অর্জন করতে না পারায় তাদের জোট সরকার গঠন করতে হবে। ক্রিকেট ব্যক্তিত্ব থেকে রাজনীতিতে পা রাখা ইমরান প্রথমবারের মতো দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফল বলছে ইমরানের দল পিটিআই জাতীয় পরিষদে ১১৫টি আসনে জয়ী হয়েছে।
তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য জাতীয় পরিষদের ২৭২টি আসনের মধ্যে ১৩৭টি আসনে জয়ের প্রয়োজন ছিল। ইমরানের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের পিএমএল-এন পার্টি ৬২ আসনে জয়ী হয়েছে। এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলওয়াল ভুট্টোর কেন্দ্রীয় বামপন্থি দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ৪৩টি আসনে জয়ী হয়েছে। কিছু আসনের ভোটের ফলাফল এখনো ঘোষণা হয়নি। ভোটের ফল অনুযায়ী জাতীয় পরিষদ এবং পাঞ্জাবের প্রাদেশিক পরিষদে এগিয়ে আছে ইমরানের দল।
গতকাল শুক্রবার সকালে ২৫১টি আসনের ফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এরপর আরও কয়েকটি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ইমরানের দলের সমর্থকরা এরই মধ্যে আনন্দ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যার দিকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন সাবেক ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া দেশটির হবু প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। গত বৃহস্পতিবার রাতে ‘প্রেসিডেন্ট স্টাইলে’ দেওয়া ভাষণে ইমরান খান নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর করা অভিযোগের তদন্ত করার প্রস্তাব দেন।
এছাড়াও তিনি ভারত এবং আফগানিস্তানের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও পারস্পরিক স্বার্থে একত্রিত হওয়ার কথা বলেন। খেলার মাঠে যেমন চার-ছক্কা মেরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করেছেন তেমনই এবার রাজনীতির মাঠেও সবাইকে পেছনে ফেলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হলেন এই সাবেক তারকা। নতুন পাকিস্তান গড়তে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি পররাষ্ট্র নীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বহির্বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেছেন তিনি। চিরবৈরী প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির ইঙ্গিত দিয়ে ইমরান বলেন, আমাদের সম্পর্কের সংকটগুলোর সমাধান করতে চাই।
এক্ষেত্রে ভারত যদি এক ধাপ এগিয়ে আসে, তাহলে আমরা দুই ধাপ এগিয়ে যাবো।অক্সফোর্ড থেকে পড়াশুনা করা ইমরান খানের ক্যারিয়ার জীবন বেশ সমৃদ্ধ। দুই দশকের বেশি সময় ক্রিকেট দুনিয়ায় সময় কাটিয়েছেন তিনি। তবে তার ব্যক্তি জীবন বিশেষ করে তার বিবাহিত জীবন নিয়ে বেশ জলঘোলা হয়েছে। তিনবার বিয়ে করেছেন এই সাবেক ক্রিকেটার। তবে একটি সংসারও টেকেনি। লন্ডনে প্লেবয় হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন ইমরান। তবে তার দাবি একজন রক্ষণশীল পাকিস্তানি মুসলিম হিসেবে তিনি কখনো কোনো অন্যায় কাজ করেননি, এমনকি তিনি কখনো অ্যালকোহলও পান করেননি।
১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত জেমিমা গোল্ডস্মিথকে প্রথম বিয়ে করেছিলেন সাবেক এই ক্রিকেট তারকা। সে সময় ইমরানের বয়স ছিল ৪৩ এবং জেমিমার বয়স ছিল ২১ বছর। ২০০৪ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ইমরান। সে সময় তিনি বিয়ে করেন টেলিভিশন উপস্থাপক রেহাম খানকে। ১০ মাসের মাথায় সেই সংসারও ভেঙে যায়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বুশরা মানেকা নামে একজন আধ্যাত্মিক নেত্রীকে বিয়ে করেন ইমরান খান। দুই মাসের ব্যবধানে সেই সম্পর্কেও ইতি ঘটান তিনি। ভোটের আগে ইমরানের ব্যক্তি জীবন নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছিল, এসব বিতর্ক হয়তো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। কিন্তু সাধারণ নির্বাচনে তার ব্যক্তি জীবনের সমালোচনা স্পর্শ করতে পারেনি। সব সমালোচনা পেছনে ফেলে নির্বাচনে জয়ের পথেই এগিয়ে গেলেন এই সাবেক ক্রিকেট তারকা।
ইমরান খানের নতুন পাকিস্তানের সঙ্গে কাজের অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র
ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন করার পর তাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ খোঁজার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অগ্রগতির চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে চূড়ান্তভাবে ফল ঘোষণার পাশাপাশি পর্যবেক্ষক মিশনের প্রাথমিক তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় আছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলাফল নিজের পক্ষে আনতে নির্বাচনের কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ সত্ত্বেও এরই মধ্যে রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান ইমরান খান ইসলামাবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে নিজের দলকে বিজয়ী দাবি করেন তিনি। জাতীয় পরিষদের আসন দখলের দিক থেকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের চেয়ে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ইমরান খানের পিটিআই।
এখন তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অপেক্ষা। ফার্স্টপোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ফল অনুযায়ী পিটিআই পেয়েছে ১০৫টি আসন। পিটিআইকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বের সঙ্গে কাজের সুযোগ খুঁজবে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন ও গণমাধ্যমে স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধার যেসব প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। পররাষ্ট্রবিষয়ক হাউস কমিটির সদস্য এলিয়ট অ্যাঙ্গেল পাকিস্তানের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের জনগণের জন্য আরেকটি সুযোগ নষ্ট হলো। তারপরও আমি সাহসের সঙ্গে ভোট দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের জনগণকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। ২০১৩ সালে দেশটিতে প্রথমবারে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের সফলতার কথা উল্লেখ করেন এলিয়ট। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক হাউস কমিটির এ সদস্য বলেন, নির্বাচনের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকার যে অভিযোগ উঠেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের সঙ্গে কাজ করা হবে। তবে গণতন্ত্রের পথে পাকিস্তানের সুযোগ নষ্টের বিষয়টি হতাশাজনক হিসেবেই দেখা হবে।