শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

যতদোষ নন্দঘোষ ‘পুলিশের’

মো. আলী হোসেন :


ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকেই পুলিশ বাহিনী সমালোচিত। আমাদের দেশের পুলিশও ঔপনিবেশিক পুলিশের উত্তরসূরি? ইংরেজ শাসক যাদের তৈরি করেছিল আয়ারল্যান্ডের পুলিশের আদলে। ওই সময় থেকেই পুলিশ শাসকদের ঠেঙ্গারে বাহিনীতে পরিণত হয়। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়েছে। স্বাধীন হলো ভারত-পাকিস্তান (১৯৪৭ সাল)। পাকিস্তানীরাও পুলিশকে ঠেঙ্গারে বাহিনী হিসাবেই ব্যবহার করেছে।

এরপর ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ঔপনিবেশের ভূত পুলিশের ঘাড় থেকে নামেনি। মাঝে মাঝে ঘটনার ঘনঘটায় সেই কথা বিশেষভাবে মনে পড়লেও সাধারণভাবে পুলিশ তার অতীত ধারাবাহিকতা মেনেই চলছে। সমাজের দুর্বল অংশের ওপর ক্ষমতার দাপট আগেও দেখিয়েছে, দেশভাগের পরও দেখিয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশেও দেখাচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় পুলিশকে জনগণের ‘সেবক’ বললেও আসলে জনগণের সেবক বা বন্ধুর ইমেজে পুলিশের ভূমিকা সবসময়ই সীমিত ছিল। জনগণের সেবক হতে হলে পুলিশকে জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। (সূত্র : ইতিহাস থেকে)।

*আমাদের সমাজে চিরকালই একজন নন্দঘোষ থাকে। যত দোষ সব তার ঘাড়ে চাপিয়ে অন্যরা দাঁত বের করে হাসে। পুলিশ বেচারাকেই এখন আমাদের রাষ্ট্রে নন্দঘোষের ভূমিকায় অভিনয় করতে বাধ্য করা হচ্ছে।*

পুলিশের কোনো কর্মকর্তা যখন ছুটিতে বাড়ি গিয়ে আমগাছটির মালিকানা নিয়ে মারামারি করেন এবং তাঁর ভাইকে লাঠির বাড়ি দিয়ে মাথা ফাটিয়ে মারেন অথবা গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেন, তখন সেটা স্রেফ খুন। ওই খুনের দায় গোটা পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা থামাতে গিয়ে নিরুপায় হয়ে যখন পুলিশ গুলি ছোড়ে এবং তাতে কেউ মারা যায়, সেটা মার্ডার নয়। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ পুলিশকেই নিন্দা করবে। কিন্তু কোনো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে থানায় আনার পর শারীরিক নির্যাতন করায় যদি তার মৃত্যু হয়, সেটা নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু। তার দায়ে পুলিশকে অভিযুক্ত করতেই হবে। নিহত ব্যক্তি চোর-ডাকাত না হয়ে বিরোধী দলের বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মী হলে অনুমান করা হবে সরকারের প্ররোচনাতেই বা নির্দেশেই ওই হত্যাকান্ড হয়েছে। ওটা বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। ব্যক্তিগত শক্রুতাবশত খুন নয়। ওই খুনের দায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের ওপরে নয়, গোটা পুলিশ বাহিনীর ওপর অর্থাৎ সরকারের ওপরই বর্তায়।

কোনো সম্প্রদায় বা শ্রেণি সম্মিলিতভাবে অপরাধ করে না, অপরাধ করে মানুষ-ব্যক্তি। গত পাঁচ হাজার বছরে পৃথিবীতে যত হত্যাকান্ড ঘটেছে (যুদ্ধবিগ্রহ বাদে), তাতে শুধু দুর্বৃত্তরাই নয়, সব পেশার মানুষই জড়িত ছিল। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-দার্শনিক-সাংবাদিক থেকে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, পুলিশসহ সব পেশার মানুষই রয়েছে। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ যখন তার হেফাজতে থাকা কোনো অভিযুক্ত বা অপরাধীকে সজ্ঞানে ও সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে, সেটাই বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। যদিও ওই অপরাধীর বিচার করে শাস্তি দিলে হয়তো তার মৃত্যুদন্ডই হতো। কিন্তু বিচার না করে হত্যা করলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা জঘন্যতম অপরাধ। তারপর তাকে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার যে নামই দেওয়া হোক না কেন।

গণতান্ত্রিক শাসন বা একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আমাদের দেশে দুটোই দেখেছে জনগণ। গণতন্ত্রকে আমাদের দেশের মানুষ যুতসই বা সঠিক শাসন ব্যবস্থা মনে করেন। কিন্তু উভয়তন্ত্রের শাসন ব্যবস্থাই পুলিশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে শাসকদল। এরজন্য নির্দেশদাতা শাসক শ্রেণি যতটা না সমালোচিত তারচেয়ে বেশি সমালোচিত নির্দেশ পালনকারী পুলিশ সদস্যরা। অবশ্য সবক্ষেত্রে যে শাসকদের নির্দেশেই সব হয় তাও নয়। অর্থের লোভে বা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের আচরণের কারণে জনগণের কাছে পুলিশ নিন্দার পাত্র এই অভিযোগ বরাবরই হয়ে আসছে। তবুও পুলিশ জনগণের বন্ধু, এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ, রাতভর যখন আমরা নাক ডেকে ঘুমাই তখন পুলিশ সদস্যরা আমাদের আরামের ঘুমের জন্য নিজেদের ঘুমকে হারাম করে ঘুরে ঘুরে পাহারা দেন। রাস্তায় বেওয়ারিশ লাশের মালিক দারোগা (অর্থাৎ পুলিশ)। শেষ পর্যন্ত ওই বেওয়ারিশ লাশটা পুলিশের ভ্যানে তুলে নিয়ে দাপনের ব্যবস্থা পুলিশই করে। রাতে ডাকাতি-চুরি যাই হোক, পুলিশের দারস্ত হননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবেনা। প্রতিপক্ষের সাথে জায়গা-জমি নিয়ে বিরোধ, মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা। সেখানেও পুলিশের হস্তক্ষেপেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। তাহলে এত সমালোচনা যাদের বিরুদ্ধে, সেই সভ্য সমাজটি কী পুলিশ ছাড়া কল্পনা করা যায়?

সমাজের কোনো একটি শ্রেণি পেশার মানুষ কেউ কী বলতে পারবেন, যে পুরো একটি শ্রেণির সব মানুষ খারাপ। সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বৈজ্ঞানিক, সিভিল প্রশাসন বা একেবারে দিনমজুর শ্রমিক যে পেশাই হোক। সব মানুষ খারাপ হতে পারেনা। আবার গুটি কয়েকজনের কারণে পুরো একটি পেশা বা বাহিনী অপরাধী সাব্যস্ত হতে পারেনা। একজন ডাক্তারের অপচিকিৎসায় যদি কোনো রোগী মারা যায়, তাই বলে কী সব ডাক্তার অপরাধী হবে। নাকী এরপর আর কেউ চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে যাবেন না?
সকল অপরাধের জন্য প্রতিবাদ অবশ্যই করতে হবে। তাই বলে, প্রতিবাদের ভাষা অশ্লীল হতে পারেনা। বিশেষ করে ছাত্রদের ক্ষেত্রে তো নয়ই। তাহলে আজকে প্লেকার্ড বহনকারী ছাত্ররা যেভাষা ব্যবহার করছে সেটি নিন্দা জানানোর ভাষা আমার নেই।

একটি কথা অবশ্যই সবাইকে স্বীকার করতে হবে, যারা আইন মানার জন্য জনগণকে বাধ্য করেন। তারা নিজেরা কতটুকু আইন মানেন। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ দাবিতে আজকের আন্দোলনের বাস্তবতা হলো, প্রয়োগকারী সংস্থা বা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরা কতটুকু আইন মেনে চলেন? তাদের মধ্যে যদি আইন মানার প্রবনতা দেখা না যায়, তাহলে জনগণকে আইন মানার জন্য তারা বাধ্য করতে পারেন না।

তবে ছাত্রদের এই ন্যায্য দাবির প্রতি পুরো দেশের আপামর জনগণ সমর্থন জানিয়েছে। পরিবহন ব্যবস্থায় সড়কে এমন নৈরাজ্য কাম্য হতে পারেনা। যারা আন্দোলন করছে তারা আমাদেরই সন্তান। যার কারণে সরকার তাদের প্রতি অত্যন্ত নমনীয়তা প্রদর্শণ করছে। মেনে নিয়েছে তাদের ন্যায্য দাবি। তাহলে এরপর আর কীসের আন্দোলন। কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেদের পড়ালেখা রেখে আর কতদিন রাজপথে থাকবে? এমনটাই এখন সবার মনে দানা বাঁধছে।

একটি সু-শৃঙ্খল আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে এর সফলতার মাধ্যমে। ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের ৯ দফা দাবির মধ্যে প্রথম দাবিটি সরকারের পক্ষে মানার বিষয় নয়। এটি বিচার বিভাগের বিষয়। কারো ফাঁসি নিশ্চিত কেবল বিচারের মাধ্যমেই সম্ভব। এখানে সরকারের দাবি মানার কিছু নেই। বাকী ৮টি দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। তাহলে কার স্বার্থে ছাত্ররা এখনো রাজপথে অবস্থান করছে। এসব কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের কারো ক্ষতি হলে এর দায়ভার কে নিবে?

মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক। ই-মেইলahossain640@gmail.com               

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮