শুক্রবার ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইং ১৫ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ:
লক্ষ্মীপুরে আগুনে পুড়ে ৯ দোকান ছাই, ৭৫ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে সবার সহযোগিতা চাই নবনির্বাচিত ২৯৭ সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ নির্বাচনে ভোটের বক্স নিয়ে যাবে নদীর দিকে, আশঙ্কা জেএসডি নেতার ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মহিমান্বিত রজনী-শবে বরাত জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে : ফজলুর রহমান লক্ষ্মীপুরে ৬ সিলসহ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার : বিএনপি-জামায়াত প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন যাদের জন্য দেশে আসতে পেরেছেন, তারা জুলাইয়ের অবদান অস্বীকার করছেন : ডা. শফিকুর রহমান লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নিখোঁজের ৭দিন পর কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘চিতা’ গ্রেপ্তার

প্রস্তাবিত ‘সড়ক পরিবহন আইন’ ও বিশ্লেষণ

বিশেষ প্রতিবেদন :


চলতি মাসের ৭ আগষ্ট সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রীসভার বৈঠকে অনুমোদিত হলো, বহুল প্রত্যাশিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর খসড়া প্রস্তাবটি। রাজধানীতে দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর গত ১ আগষ্ট থেকে সপ্তাহব্যাপি মাধ্যমিক লেভেলের শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে দাবির প্রেক্ষিতে আইনটি দেরিতে হলেও মন্ত্রীসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। খসড়া এই আইনটি যাচাই-বাছাই এবং সংশোধন-বিয়োজন শেষে আগামী সংসদ অধিবেশনে পাশ হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল হক।

এই আইনে দুর্ঘটনায় সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছর এবং হত্যা প্রমাণিত হলে ৩০২ ও ৩০৪ ধারায় মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বর্তমান আইনে এই সাজা ৩ বছর আছে। সড়কে নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ঘুষ, দুর্নীতি, বেপরোয়া গাড়ি চালানোসহ সার্বিক পরিস্থিতির কারণে প্রতিনিয়ত সড়কে প্রাণ হারাচ্ছে শিক্ষার্থীসহ দেশের সাধারণ মানুষ।

এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বর্হিপ্রকাশ ঘটে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। এ সময় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা পড়ে সাংবাদিক, পুলিশ, বিচারপতি, মন্ত্রী, এমপি, নেতাসহ প্রভাবশালীদের গাড়ি ও চালকের লাইসেন্স না থাকার বিষয়টি। যাদেরকে এতদিন কেউ ছুয়ে দেখারও সাহস করতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ছিল, যারা আমাদের আইন মানতে বাধ্য করেন আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে। তাদের ব্যবহৃত পরিবহন এবং চালকের লাইসেন্স, ফিটনেস না থাকাটা আরো জঘন্য অপরাধ এবং হাস্যকর।

বিষয়টি পুরো জাতিকে যেমন লজ্জায় ফেলেছে, তেমনি তাদেরও যথেষ্ট বোধগম্য হয়েছে। এখন সবাই মনে করে আসলে ছাত্ররা পুরো জাতিকে এমন নৈরাজ্য আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এর পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারী ডুকে আন্দোলনকে অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে। যার কারণে অহেতুক অনেকগুলো অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম দেয় এবং পুরো দেশে একটি অপপ্রচার বা রিউমার ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি সরকার এবং গোয়েন্দা সংস্থা বা প্রশাসন জানতে পেরে অত্যন্ত ধৈর্য্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি মন্ত্রীসভায় অনুমোদনের পর নানান বিচার বিশ্লেষণ হতে দেখা গেছে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায়। বিশ্লেষণে যেসব বিষয়গুলো উঠে এসেছে তার যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। যেমন, নির্বাচনে সবদল যেভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড চায় অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের জন্য। ঠিক তেমনি একটি আইন প্রণয়নের সময় দেশের সকল নাগরিকের সব অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নানান বিচার বিশ্লেষণ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এখন প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থী সমাজ যদি দেশে লক্ষ বা কোটি হিসাব করে তাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য বা তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য আইনটি পুরোপুরি তাদের দাবি অনুযায়ীই করা হয়। তাহলে পরিবহন শ্রমিক এবং মালিকও লক্ষ, কোটি আছেন। বিশাল এই শ্রমিক-মালিক শ্রেণির স্বার্থ যদি রক্ষা না হয়, তাহলে আইনটি একপক্ষীয় স্বার্থ রক্ষার হিসাবে গণ্য হবে। এতে বৈষম্য সৃষ্টি হবে, যা সংবিধান সম্মত নয়।

অথচ একটি পক্ষ বার বার দাবি করছে কেন মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হলো না? বর্তমান আইনে কী আছে? বর্তমান আইনে ১৯৮৩ইং সনে সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছর রাখা হয়েছে। পরে আইনজীবী এ্যাড. মনজিল মোর্শেদ আইনটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। রিটটি দায়েরের পর ১৯৮৫ইং সনে মহামান্য হাইকোর্ট ৩ বছরের সাজা বাড়িয়ে ৭ বছর করার আদেশ দেন। ওই আদেশ এখনও বলবৎ আছে। প্রস্তাবিত খসড়া আইনে হাইকোর্টের নির্দেশনা মানা হয়নি। বরঞ্চ আরো ২ বছর কমিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে মন্ত্রীসভা। কিন্তু খসড়া ‘সড়ক পরিবহন আইন’টি অনুমোদনের পরদিন ‘প্রথম আলো’ ব্যানার হেডিং করেছে ‘চালকের সাজা বাড়ল’। আসলে বাড়ল নাকী কমল, তারা সেটি বিশ্লেষণ করেছে কীনা জানিনা। এখানে দুটি দিক আছে-একটি হলো এরশাদ সরকারের করা তিরাশি সালের আইন অনুযায়ী ২ বছর বাড়ল, আরেকটি দিক হচ্ছে পঁচাশি সালে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী ২ বছর কমল।

কী আছে প্রস্তাবিত এই আইনে :
গত ৬ আগষ্ট রাতে সাংবাদিক মিথিলা ফারজানার উপস্থাপনায় একাত্তর জার্নালের অনুষ্ঠানে আইনটি নিয়ে নানান ভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে আমন্ত্রিত দুজন অতিথি ছাড়াও লাইভে যুক্ত হন, আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল হক এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক।

উপস্থাপক এবং অতিথিদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী প্রস্তাবিত ‘সড়ক পরিবহন আইন’ নিয়ে যেসব তথ্য জানান তার মধ্যে অনেকগুলো যুক্তিযুক্ত বিষয় উঠে আসে। এসব যুক্তি আমার কাছে সকল নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য বলেই মনে হয়েছে।

আইনমন্ত্রী কেন মৃত্যুদন্ড সরাসরি করা হয়নি তার ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, বেপরোয়া গাড়ি চালালে বা অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর করা হয়েছে। অন্যদিকে তদন্তে যদি প্রমাণ হয় যে, না দুর্ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত সংগঠিত হয়েছে। চালক ইচ্ছা করলে দুর্ঘটনা এড়াতে পারতেন তাহলে সেক্ষেত্রে পেনাল কোডের ৩০২ এবং ৩০৪ ধারা সংযুক্ত করে তদন্তকারী কর্মকর্তা চার্জসীট দিতে পারবেন। একই সাথে ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

আইনমন্ত্রী বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ধরুন একজন কৃষকের একটি গরু বাঁধন ছুটে গিয়ে রাস্তায় দৌড়াচ্ছে। কৃষকও গরুটি ধরার জন্য পিছনে ছুটেছেন। এ সময় একটি চলন্ত যাত্রীবাহী বাস এসে সামনে পড়ল। ঠিক এমন সময় চালক যদি কৃষককে রক্ষা করতে যান তাহলে পুরো গাড়ির ৫০ জন যাত্রী মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর যদি কৃষককে রক্ষা না করেন, তাহলে ৫০ জন যাত্রীর জীবন বাঁচবে। এক্ষেত্রে চালক কোনটি চয়েজ করবেন? নিশ্চই চালক ৫০ জন যাত্রীকে বাঁচানোর চেষ্টাই করবেন। এখন কৃষক হত্যার জন্য চালকের বিরুদ্ধে ৩০২ বা ৩০৪ ধারা প্রযোজ্য হবে কী? মন্ত্রী উল্টো প্রশ্ন করেন।

প্রস্তাবিত এই আইনে আরেকটি সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে, প্রত্যেক চালকের লাইসেন্সে ১২টি পয়েন্ট থাকবে। ১টি অপরাধ করলে ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। এভাবে যদি সে বার বার অপরাধ করতেই থাকে। তাহলে এক এক করে যদি ১২টি পয়েন্টই কাটা যায় তাহলে তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। এই নিয়মটি নতুন আইনে একটি বড় ধরণের ভালো দিক। তাহলে কোনো চালক চাইবে না, তার লাইসেন্সটি বাতিল হোক। এক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সড়কে অপরাধ কমে আসবে এবং দুর্ঘটনা কমবে। তবে প্রস্তাবিত আইনে সর্বনিন্ম সাজার বিষয়টি উল্লেখ নেই, তাই সংশোধনের সময় বা চূড়ান্তভাবে পাশের সময় সর্বনিন্ম সাজা সন্নিবেশ করার দাবি জানানো হয় আলোচনায়।

৭ আগষ্ট মঙ্গলবার রাতে একাত্তর জার্নালের আলোচনায় যুক্ত হন, আইনজীবী ব্যারিষ্টার মনজিল মোর্শেদ। তিনি বলেন, প্রথমে সর্বোচ্চ সাজা ৫ বছরের ধারায় মামলাটি দায়ের হলে পরে তদন্তে মৃত্যুদন্ডের ধারায় চার্জসীট দিলে বিচারামলে অপরাধী খালাস পেয়ে যেতে পারেন। কারণ আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তিতর্কে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে তদন্তকারী অফিসার অন্যের প্ররোচনায় বা সংক্ষুব্ধ হয়ে মৃত্যুদন্ডের ধারাটি সংযুক্ত করেছেন। তাই তিনি এই আইনকে শুভংকরের ফাঁকি বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রস্তাবিত এই আইন সম্পর্কে দীর্ঘ বছর ধরে আন্দোলনকারী ‘নিরাপদ সড়ক চাই” সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, আইনটি তাদের বা শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী করা হয়নি। প্রথমে আইনটির যে নাম রাখা হয়েছে সেটিই যথোপযুক্ত নয় বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, আইনটির নাম রাখা প্রয়োজন ছিল ‘সড়ক পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা আইন’। পাশাপাশি তিনি এও বলেন, লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে চালকের অষ্টম শ্রেণি, আবার হেল্পারের পঞ্চম শ্রেণি পাশ। এটা ঠিক হয়নি। কারণ, একজন চালক সারাজীবন হেল্পার থাকবে না। একটা সময় সেও ড্রাইভার হবে। তাই তিনি এটা সবার জন্য সমান শিক্ষাগত যোগ্যতা রাখার কথা উল্লেখ করেন। তবে অন্য বিশ্লেষকরা বলেছেন, হেল্পার হিসাবে প্রাপ্ত লাইসেন্স ড্রাইভার হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন না। যখন হেল্পার ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ পাবেন, তখন তাকে ড্রাইভার হিসাবে আবার লাইসেন্স নিতে হবে।

প্রস্তাবিত এ আইনে খুঁটিনাটি দুই একটা বিষয়ে বিশ্লেষকদের নানা বিশ্লেষণ থাকলেও আইনটি অনেকটা আধুনিক এবং যুগোপযোগি বলেই তাদের মত প্রকাশ করেছেন। মূল কথা হচ্ছে, সবকিছু আইন প্রণয়নের উপর ছেড়ে দিলে কোনো লাভ হবেনা। কারণ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া আরো কঠোর আইন করলেও আইনটি ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হবে। অন্যদিকে সড়কে বা যানবাহনে চলাচলকারী যাত্রী, তথা জনসাধারণ আইন সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন না হলে এবং আইন মেনে না চললে যত কঠিন আইনই করা হোক বাস্তবে এর কোনো কার্যকারীতা থাকবে বলে আমার মনে হয় না।

# মো. আলী হোসেন, সাংবাদিক ও লেখক, E-mail-ahossain640@gmail.com

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« জানুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮