টেক বার্তা ডেস্ক :
পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সব বয়সি মানুষের কাছে পরিচিত নাম। ডিজিটালাইজেশনের এই বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটি যেমন একে অপরের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সেতুবন্ধনে ভূমিকা রাখছে তেমনি সম্পর্ক ছেদেও অবদান কম নয়। অর্থাৎ ফেসবুক যেমন আশির্বাদ, তেমনি অভিশাপও। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের জন্যও হুমকি এবং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ফেসবুক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসবুকে ভালো বার্তা প্রচারে ব্যবহারকারীদের যতটা না আকৃষ্ট করে এর চেয়ে বেশি খারাপ ও ভুল তথ্য বেশি প্রচার করে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই অনেকে বিশ্বাস করা শুরু করে। ফলে কোনো কোনো সময় সামাজিক অস্থিরতা এমনকি পুরো দেশেই বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার ঘটনাও ঘটে। তাদের মতে, জনপ্রিয় এই সামাজিক মাধ্যমটি যাতে মানুষ ভালো কাজে ব্যবহার করে এবং সামাজিক অস্থিরতা না ঘটে এমনটা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
মিথ্যা প্রচার বা গুজব, অশালীন কর্মকান্ডে গ্রাম, উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে দেশজুড়ে তোলপাড় করা ঘটনা বহু পুরনো। সম্প্রতি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে গুজব সৃষ্টি করে ঢাকাসহ সারাদেশে কী ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। আগে শুধু অফিস আদালত বা বাসা-বাড়িতে কম্পিউটার বা ডেস্কটপে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট এখন সবার হাতের মুঠোয়। হাতে হাতে স্মার্টফোন। শুধু সমতল নয়, পাহাড় বা দুর্গম এলাকায়ও এখন মোবাইল কোম্পানিগুলোর ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে গেছে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষই স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির রয়েছে নানা ইন্টারনেট প্যাকেজ। আগে শুধু জি-মেইল বা ইয়াহু ব্যবহারের জন্য ইন্টারনেটের প্রচলন থাকলেও এখন ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নারী সদস্য সংগ্রহ করছে। ধর্মভীরু তরুণদের ভেড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। জঙ্গি মতাদর্শ গ্রহণের পর ফেসবুকের মাধ্যমে অপপ্রচারের কৌশল শেখানো হচ্ছে। ফেসবুকে গ্রুপ খুলে অর্থ সংগ্রহ করে। এমনকি কোমলমতি ছেলেমেয়ে বাবা-মার অজান্তে জঙ্গিদের ভুল ব্যাখ্যায় নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে সন্ত্রাসীরা ফেসবুক ব্যবহার করছে। প্রযুক্তিগতভাবে তারা সুসংগঠিত।
এদের মনিটরিং করতে হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের দেশের ভেতরে যে গেটওয়েগুলো আছে, সেই গেটওয়েগুলোতে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার দুটোই ব্যবহার করতে হবে।২০১৬ সালে ফেসবুকে অপপ্রচারে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত হানার প্রতিবাদে নাসিরনগরে হিন্দু সম্প্রদায়ের শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অজ্ঞাত ১ হাজার ২০০ জনকে আসামি করা হয়। ২০১২ সালে ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটেছিল।
২০১৭ সালে ফেসবুকে এক গুজবকে কেন্দ্র করেই সংখ্যালঘু পরিবারের ঘরবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত তিনদিন আগেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাছাই না করেই রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় মৃত্যুর গুজব ফেসবুকে ছড়ানোর অভিযোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে দায়ের করা মামলায় অভিনেত্রী-মডেল কাজী নওশাবা আহমেদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
গত সোমবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক অনির্ধারিত আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গুজব ও অপপ্রচার চালানোর ফলে ফেসবুক এখন একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে এ প্রসঙ্গে গত সোমবার রাজধানীর র্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর গোলটেবিল বৈঠকে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, রাষ্ট্র বাঁচাতে প্রয়োজনে ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। একইসঙ্গে পরিস্থিতি বুঝে ইন্টারনেটও বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেন, ফেসবুকে ছবি এমনভাবে এডিট করে পোস্ট দেয়া হয়ে থাকে সেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীদের বোঝার উপায় নেই কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা। এটি অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা ব্যবহার করছে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ একজন ৮ বছর শিক্ষার্থীর মনে যে আবেগ সেটি ২৮ বছরের একজন শিক্ষার্থীর মাঝে দেখা যাবে না। এজন্য প্রাপ্তবয়স্ক ছাড়া ফেসবুক ব্যবহারে কঠোর নজরদারি করতে হবে। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে আরও খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন তিনি।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে আমাদের গেটওয়ের ভেতরে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার বসিয়ে সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত করে নজরদারি করলে বিষয়টি অনেক বেশি কার্যকর হবে। কিন্তু আমাদের যেসব ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স আছে সেগুলো গেটওয়েগুলোতে নেই। ফলে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম সঠিকভাবে ধরা যাচ্ছে না। দেখা যায়, ফেসবুকে যারা অ্যাকাউন্ট খোলে তাদের মধ্যে অনেকেই ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলে। ফেসবুকে বিপুল ভুয়া আইডি রয়েছে। ফেসবুক আইডির আরেকটি বড় জালিয়াতি হলো বয়স। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স লুকানো হয়। অনুরূপভাবে ভুয়া নাম, ভুয়া ঠিকানা, ভুয়া বয়স এবং ভুয়া পেশা দেওয়া হয়।
জালিয়াতির আরেকটি ক্ষেত্র হলো নিজের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরে ধনী ফেসবুক বন্ধুর সহানূভুতি আদায় করা। ফেসবুকে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক দিক হলো আপনার আইডি হ্যাকড হয়ে যাওয়া। যদি কেউ আপনার আইডি হ্যাক করে তাহলে সে আপনার আইডি থেকে পলিটিশিয়ান, মন্ত্রী, ব্যবসায়ী বা বিশিষ্টজনদের সম্পর্কে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য দেয়। ক্ষেত্র বিশেষে নেতাদের বিকৃত ছবি আপলোড করা হয় অথবা মানহানিকর সংবাদ পরিবেশন করা হয়। তখন যার আইডি থেকে এই ধরনের আপত্তিকর লেখা বা ছবি প্রকাশ করা হয় তাকে কারাবরণ করতে হয় অথবা মামলা মোকদ্দমায় জড়িত হতে হয়। ফেসবুক যে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ লুণ্ঠনের হাতিয়ার তার একটি প্রমাণ নিচের ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।
পুলিশের সাইবার প্রতিরোধ বিভাগের সহকারী কমিশনার ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যাতে গুজব বা মিথ্যাচার ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিনিয়ত ফেসবুক পেইজে সচেতনতামূলক তথ্য পোস্ট করে ‘বুস্ট’ অপশনের মাধ্যমে সহজেই ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া বাবা-মা কিভাবে সন্তানদের সচেতন করবেন সেই বিষয়েও বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।তিনি আরো বলেন, ফেসবুক ব্যবহার করে গুজব ছড়ানোর দায়ে নিয়ম অনুযায়ী আইসিটি মামলা হয়। এই মামলা কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, আইটি কেন্দ্রিক। কিন্তু যখনই একটি লিংকের বিরুদ্ধে খোঁজ খবর নিতে যাই তখনই ব্যক্তি চলে আসে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাজিব আহমেদ বলেন, ফেসবুক বন্ধ কোনো সমাধান নয়। এটি বন্ধ করলে লাখ লাখ ফ্রিল্যান্সারের আয়ের উৎস বন্ধ হবে। সরকার ফেসবুক বন্ধ করলেও কিছু ব্যবহারকারী প্রক্সি দিয়ে ফেসবুকে প্রবেশ করবেন। প্রক্সি ভার্চুয়াল আইটি ব্যবহার করলে মনে হবে ফেসবুক ব্যবহারকারী দেশের বাইরে রয়েছে। প্রক্সি সার্ভিস বন্ধ করলে পেইড সার্ভিসে ফেসবুক ব্যবহার করবে। তবে সেক্ষত্রে ফেসবুক ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার সরাতে ডিজিটাল ফিল্টারিং মেশিন আনতে হবে।
এতে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা সরকার ও রাষ্ট্ররিবোধী কর্মকা-, পোস্ট স্ক্যানিং করে কাটছাঁট যাবে। ফেসবুক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা আমার সংবাদকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমরা পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করছি। কিন্তু এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। তবে দেশের শান্তি বিনষ্ট ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে জনগণ যাতে বিভ্রান্তে না পড়ে সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় ফোন, গণমাধ্যম ও ফেসবুকে বার্তা পাঠায়।
আমাদের উচিত ফেসবুক ভাল কাজে ব্যবহারের মনমানসিকতা তৈরি করতে হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ফেসবুক বন্ধের এক সময় গুঞ্জন উঠলে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান তথ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেছিলেন, সরকার গভীর রাতে ফেসবুক বন্ধের চিন্তা করছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবর সঠিক নয়। কারণ সরকার ফেসবুক বন্ধের পক্ষে নয়।
সেখানে বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ৬ কোটি ৭২ লাখ ৪৫ হাজার। এদের মধ্যে বেশিরভাগই মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এ সংখ্যা ৬ কোটি ৩১ লাখ ২০ হাজার। ইন্টারনেট গ্রাহকের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারকারী আড়াই কোটি।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ