আকাশবার্তা ডেস্ক :
পবিত্র ঈদুল আজহায় গরুর হাট ও ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট করে বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, ব্যস্ততম মার্কেট ও টার্মিনালগুলোয় তৎপরতা শুরু করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার গরুর হাট ও ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট নিয়ে মাঠে নামছে। র্যাব-পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ডাক্তার, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হচ্ছেন। আবার অনেকের মালামাল খোয়া যাওয়াসহ মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন। ঈদুল আজহা ও পূজাসহ বিশেষ করে ঘরমুখো মানুষ এদের কাছে অসহায়। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ছেন। আর এদের খাওয়ানো নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিষক্রিয়ায় জীবন বিপন্ন হচ্ছে। অজ্ঞান হয়ে গুরুতর আহত অনেকেই দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেয়ার পরও পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছেন না। শুধু যে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে তাই নয়, এ চক্রটি নানা কৌশলে যানবাহনের ভিতরেই চোখ-মুখে বিষাক্ত মলম লাগিয়ে দিচ্ছে। এতে করে অনেকেই স্থায়ীভাবে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঈদ ও জাতীয় শোক দিবস পালনে নিরাপত্তার বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে যেসব সামাজিক অনুষ্ঠান ও কাঙালি ভোজের আয়োজন করা হয়, সেসব অনুষ্ঠান যেন নির্বিঘ্ন ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সেই জন্য জেলা পুলিশ সুপারগণকে সংশ্লিষ্ট থেকে নজরদারি করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। আর কাঙ্গালি ভোজের খাবার সিভিল সার্জন দ্বারা পরীক্ষা করে নেওয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
ঈদ আসার আগেই গত ৮ আগস্ট বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ছয়জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়। এক ঘণ্টার ব্যবধানে ভর্তি হওয়া এসব ব্যক্তি নগরীর গাবতলী, যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান এলাকায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। এদের কাছ থেকে টাকা পয়সাসহ মূল্যবান সামগ্রী খোয়া গেছে।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, অচেতন অবস্থায় ঢামেকে আসা সকলে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি রয়েছে। ঘটনার দিন বুধবার বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে তাদের ভর্তি করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানার সহকারী উপপরিদর্শক জাহাঙ্গীর জানান, যাত্রাবাড়ী থেকে কামাল (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। কামাল জানিয়েছেন, তিনি বাসে ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন। তার বাসা মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকায় বলে জানা গেছে। তার পকেটে ২০০ টাকা ও একটি মোবাইল সেট ছিল, তা পাওয়া যায়নি।
অপরদিকে মোকছুর মিয়া (৬০) নামে এক ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় গুলিস্তানে আরাম পরিবহণের একটি বাস থেকে উদ্ধার করা হয়। ইউসুফ নামে আরেক যাত্রী তাকে বিকাল সোয়া ৩টায় হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করান। মোকছুর কাছ থেকে কী খোয়া গেছে, তা জানা যায়নি। একই সময় গুলিস্তানের আহাদ পুলিশ বক্সের সামনে মেঘনা পরিবহণের একটি বাসে ফরহাদ (৩৫) নামে এক ব্যক্তি অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন।
সংবাদ পেয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই মামুন তাকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। আর যাত্রাবাড়ীর শহিদ ফারুক সড়কে গাবতলী রোডে একটি বাস থেকে অচেতন অবস্থায় ছিদ্দিক আলীকে (৭৫) আরেক যাত্রী আশরাফুজ্জামান বুধবার বিকাল পৌনে ৪টার দিকে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সিদ্দিকের আইডিকার্ড থেকে জানা যায়, তার বাবার নাম মৃত সুন্দর আলী। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে তাদের বাড়ি। আর আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘পরিবারের লোকজনকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলে জানা গেছে।
তাছাড়া একই দিন বিকাল ৪টার দিকে গাবতলী এলাকা থেকে অচেতন অবস্থায় আশরাফ (৪৮) নামে এক চামড়া ব্যাবসায়ীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার স্বজনরা। তার স্ত্রী আয়েশা বেগম ঢামেক হাসপাতালে জানান, আশরাফ সকালে সাভারের হেমায়েতপুরে তাগাদায় গিয়েছিলেন। পরে লোকজনের মাধ্যমে সংবাদ পান, তিনি অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন গাবতলীতে। এরপর সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তবে আশরাফের কাছে কী পরিমাণ টাকা ছিলো তা জানা না গেলেও এক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তিনি আশরাফকে এক লাখ টাকা দিয়েছেন।
তবে অচেতন আশরাফের কাছে কোনো টাকা পাওয়া যায়নি। আবার গুলিস্তানে জিয়াউর জিয়া (৩৮) নামে এক ব্যবসায়ী অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। পথচারীদের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তার বোন আমরিন। তিনি জানান, তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। জিয়ার একটি রিকশার গ্যারেজ আছে। তার কাছে ৫০ হাজার টাকা ছিলো, তা পাওয়া যায়নি।
এসব ঘটনার পর ঢাকা মেডিকেল (ঢামেক) হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মা. বাচ্চু মিয়া এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সকলকেই হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। গত ১৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে পৃথক চারটি ঘটনায় শালা-দুলাভাইসহ পাঁচজন অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। অচেতন অবস্থায় তাঁদের ঢামেকে ভর্তি করা হয়। তারা হলেন শাহ আলম (৩২) ও তার বোনের স্বামী মজনু মিয়া (৪০), সুমন (৩০), শহিদুল হক (৫৫) ও কামাল হোসেন। এদের মধ্যে শাহ আলম ও মজনু মিয়ার কাছ থেকে চার লাখ টাকা ও শহিদুল হকের কাছে থেকে তিন লাখ টাকা খোয়া গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার পর শাহ আলম ও মজনু মিয়ার আত্মীয় মফিজুল ইসলাম ঢামেক হাসপাতালে জানান, ব্যবসায়িক সূত্রে তাদের মধ্যে পরিচয়। ঘটনার দিন সকালে উত্তরার ইসলামী ব্যাংক শাখা থেকে চার লাখ টাকা উঠিয়ে ‘সুপ্রভাত’ বাসে করে যাচ্ছিলেন শাহ আলম ও মজনু মিয়া। পরে গুলিস্তানে এসে ওই বাসে তাদের অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে মফিজুল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ঢামেকে নিয়ে আসেন। সুমন সেনাকল্যাণ ভবনে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি আইন পরীক্ষা দিতে কাকরাইলে ফরম কিনতে গিয়েছিলেন। পরে কাকরাইল মসজিদের সামনে অচেতন অবস্থায় তাঁকে পাওয়া যায়। সংবাদ পেয়ে আনোয়ার তাকে ঢামেকে নিয়ে ভর্তি করেন। আর শহিদুল হক মহাখালীর দাদা মেটাল প্রসেসের বিপণন কর্মকর্তা।
তিনি গুলশানে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড থেকে তিন লাখ টাকা উঠিয়ে মহাখালী অফিসে আসছিলেন শহিদুল। পরে মহাখালী বন অধিদপ্তরের কাছে একটি হোটেলের সামনে তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে তাকে ঢামেকে আনা হয়। তার তিন লাখ টাকা খোয়া গেছে বলে জানান তিনি। অপর আরেক ঘটনায় কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে অচেতন অবস্থায় ঢামেকে নিয়ে আসেন রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল আলী হাসান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি, থাবাপার্টি, টানাপার্টি, হাঁটাপাটিসহ হাজারো রকম প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। প্রতিটি মানুষ পদে পদে বিপদে পড়ছেন।
চাঁদাবাজি, অপরাধ আর প্রতারণার ‘ঈদ ধান্ধা’য় অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। চলতি পথে, মার্কেট-বাজারে অজ্ঞানপার্টির সীমাহীন দৌরাত্ম্য। এসব চক্রের নানা অপরাধ আর অভিনব সব কৌশলের কাছে সাধারণ মানুষ ধরাশায়ী হচ্ছে, সব খুইয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টির সদস্যদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা পুলিশ তৎপর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঢামেকের চিকিৎসকগণ জানিয়েছেন, রাস্তায় চলাচলকারী মানুষ ডাব, পান, বিস্কুট, চা-সিগারেট খেয়ে থাকেন। আর অজ্ঞানপার্টির সদস্য তাদের টার্গেটকৃত ব্যক্তিদের এসব খাদ্যদ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সবকিছুই হাতিয়ে নেয়। এসব অচেতন ব্যক্তিদের পাকস্থলী পরিষ্কার করার পর মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করা হয় চিকিৎসকগণ জানিয়েছেন।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ