টেক বার্তা ডেস্ক :
রাজধানীর একটি নামিদামি স্কুলে পড়ে আরিফুল ইসলাম সোহাগ। পড়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে। তার বাবা-মা দুজনই একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। অফিসে যাওয়ার পথে সকাল ৮টায় স্কুলে রেখে যান সন্তানকে। তবে ক্লাস শেষে একা একা বাসায় ফেরে দুপুর ২টায়। বাসায় এসেই সোহাগ হাতে তুলে নেয় স্মার্টফোন। খাওয়া ও পড়ার টেবিল থেকে শুরু করে বিছানা পর্যন্ত বিচরণ তার স্মার্টফোনে। এক মুহূর্তের জন্যও ফোন হাত ছাড়া করে না। এমনকী খেলাধুলা করতে বাসার বাইরে বের হওয়ার মনোযোগও নেই তার। কারণ সোহাগ বাসায় বসে প্রতিনিয়ত ফোনে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ বিভিন্ন রকমের গেমস খেলে। এছাড়াও সে পড়ার চেয়ে ফেসবুক, ইউটিউব ও গেমস খেলায় বেশি সময় ব্যয় করছে। তার খাওয়ার রুচিও কমে গেছে। শুধু আরিফুল নয়, এ রকম লাখ লাখ শিক্ষার্থী ফেসবুকে আসক্ত হওয়ায় সুষ্ঠু চিন্তা করতে পারছে না।
এ ব্যাপারে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফেসবুক হচ্ছে আসক্তি। এটি মাদক নেশার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। প্রতিনিয়ত ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ সময় ফেসবুকে কাটিয়ে দিচ্ছে। ফেসবুক আসক্তি বুঝতে বিশেষজ্ঞদের অনেক সময় লেগে যায়। কারণ শারীরিক জখম হলে দেখা যায় কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ফেসবুক ব্যবহারে মানসিক রোগী হলে তা তাৎক্ষণিক বোঝা যায় না। ফেসবুক নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক সহায়তাও প্রয়োজন। এটি সম্ভব না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
ফেসবুক ব্যবহারে নেতিবাচক মনোভাবের চিত্র তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ সালাম বলেন, মাদক আসক্তি আর স্মার্টফোন আসক্তি একই জিনিস। এটিকে ইন্টারনেট আসক্তি বলা হয়। কোনো আসক্তি থেকেই ফিরে আসা সম্ভব নয়। ফেসবুকে ভালো দিকের চেয়ে খারাপ দিক বেশি। তরুণ-তরুণীরা প্রতিদিন কমপক্ষে ৪-৫ ঘণ্টা ফেসবুক ব্যবহার করছে। এই সময় লেখাপড়া করছে না। লেখাপড়ার পরিবর্তে ফেসবুকে আসক্ত হচ্ছে। জীবন থেকে সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে শারীরিক কোনো উপকারিতা নেই। মোবাইল নিয়েই হাত দিয়ে ফুটবল খেলে। আমরা যেমন ছেলেমেয়েদের মাদকাসক্ত পাই তেমনি এটিও একটি আসক্ত হিসেবে দেখছি।
তিনি বলেন, কোমলমতি ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া না করে ফেসবুক চালাচ্ছে। অসংখ্য ছেলেমেয়ের ফেসবুক ব্যবহারে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। এই রকম মানসিক রোগী অসংখ্য আসছে। বাবা-মার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। এসব ছেলেমেয়েদের মানসিক চিকিৎসা দিতে হবে। এর সঙ্গে কিছু ওষুধ যোগ হতে পারে। ইন্টারনেট আসক্তি নেশার চেয়েও ভয়ঙ্কর। এটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেট আসক্তিতে পড়েছে। এই রোগটাকে এখনো পুরোপুরি ক্লাসিফাইড করা হয়নি। তবে এটাকে ইন্টারনেট এডিকশন ডিসঅর্ডার বলা হচ্ছে। এখন পৃথিবীজুড়ে এটা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা হচ্ছে।
শুধু শিক্ষার্থীরা নন, কর্মজীবী মানুষও অবসর সময়টুকু ফেসবুকে ছবি, লেখা পোস্ট, লাইক ও কমেন্স করে কাটিয়ে দিচ্ছেন। নিজের অজান্তেই তারা সুস্থ চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। এতে একে অপরের সঙ্গে গল্প করার সুযোগ হারিয়ে ফেলছেন। সম্প্রতি ব্রিটিশ লেখক বুকার পুরস্কার বিজয়ী হাওয়ার্ড জ্যাকবসন বলেন, স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং প্রচুর পরিমাণে ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের কারণে নাটকীয়ভাবে তরুণ প্রজন্মের যোগাযোগের পদ্ধতি বদলে যাচ্ছে। আর এসবের কারণে তারা হারাচ্ছে বই পড়ার অভ্যাসও। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুরা অশিক্ষিত হবে।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগের চেয়ে ৪৩ শতাংশ মানুষ বছরে মাত্র একটি বই পাঠ করেন। শুধু তাই নয়, প্রতিদিনই বাড়ছে তরুণদের অনলাইনে কাটানো সময়ের হার। পাঁচ থেকে ১৫ বছর বয়সিরা প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১৫ ঘণ্টা অনলাইনে কাটায়। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে কিশোর বয়সিদের মধ্যে একাকিত্বের মাত্রা সবচেয়ে বেশি এবং ২০০৭ সালে আইফোন বাজারে আসার পর থেকে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটেছে।
২০১৫ সালে একটি সেমিনারে ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি শারীরিক ব্যায়াম করেন কিনা। সেই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন সপ্তাহে ৩ দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করেন এবং তার কুকুরের সঙ্গে দৌড়ান। কিন্তু আমাদের (বাংলাদেশ) তরুণ প্রজন্ম অবসর সময় পেলেই স্মার্টফোন নিয়ে বসে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে, শারীরিক ব্যায়ামে মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। ফেসবুক আইডি খোলার নির্ধারিত বয়স ১৮ বছর। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে ১৩ বছর বয়সে ফেসবুক আইডি খোলা যাবে।
সেক্ষেত্রে বাবা-মার অনুমোদন লাগবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, ১৩ বছরের নিচের বয়সের ছেলেমেয়েরা ফেসবুক ব্যবহার করছে। একজনের কয়েকটি ফেসবুক আইডি আছে। আবার অনেকে ফেসবুক ব্যবহার না করে ব্লগ ও টুইটার ব্যবহার করছে। এই বয়সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি রয়েছে। কারণ ১২-১৩ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা কোনটি প্রতারণা আর কোনটি প্রতারণা নয় সেটি যাচাই-বাছাই করতে পারে না। আবেগের কারণেই তারা খারাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
পুলিশের সাইবার প্রতিরোধ বিভাগের সহকারী কমিশনার ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করতে দেয়া উচিত নয়। কারণ তরুণ বয়সে ফেসবুকে খারাপ-ভালো বোঝার ক্ষমতা ততটা থাকে না। চোখের সামনে সবকিছু রঙিন দেখে। সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হামিদা আলী বলেন, ইন্টারনেট আসক্তি ছেলেমেয়েদের প্রতিনিয়ত বই পড়া থেকে বিমুখ করছে। এটি ব্যাধির মতো হয়েছে।
ওদের কথাবার্তা, ধ্যান-ধারণায়ও পরিবর্তন আসছে। আমি মনে করি স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য ফেসবুক এলাও করা ঠিক না। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তরিকুল হাসান লিংকন মনে করেন, ফেসবুক বন্ধ করার কিছু নেই। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ভোটার আইডি কার্ড দিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে বাবা-মার ভোটার আইডি দিয়ে যেন ছেলেমেয়ে ফেসবুক, ইউটিউব খুলতে না পারে সেদিকে সরকারকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
এছাড়া ফেসবুক আসক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখা সম্ভব হবে না। তিনি মনে করেন, বর্তমানে যেসব শিক্ষার্থীর হাতে স্মার্টফোন রয়েছে তারা প্রত্যেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় বই পড়ার পেছনে ব্যয় না করে ফেসবুকে ব্যয় করছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনি সংকেত।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ