বুধবার ১৮ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সরকারবিরোধী ঘরে ঐক্যের সংসার

আকাশবার্তা ডেস্ক : 


একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরগরম দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। রাষ্ট্র ক্ষমতার স্বাদ নিতে চলছে নানান হিসাব-নিকাশ। চলছে জোট-মহাজোট গঠনের তোড়জোড়। বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে তৃতীয় জোট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছে যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ও প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য। আত্মপ্রকাশের পর থেকেই জাতীয় ঐক্য ক্ষমতাসীন সরকারবিরোধী জোট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাদের কর্মকান্ড ও লক্ষ্যে তা ফুটে উঠেছে।

ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের ৪ শীর্ষনেতা। জোটের শরিক জামায়াত এখনো প্রকাশ্যে না এলেও বাকিদলগুলো ঐক্যের জোটে আসতে শুরু করেছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেনসহ বাম ঘরানার কয়েকটি দলও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় আসতে তৎপর। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে পৃথকভাবে পেরে উঠতে না পেরে, সামষ্টিকভাবে সরকার হটানোই হচ্ছে ‘জাতীয় ঐক্যে’র প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোটের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ইতোমধ্যে বিএনপির সাবেক নেতা নাজমুল হুদার ও তৃণমূল বিএনপি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স, সম্মিলিত ইসলামিক জোট, কৃষক শ্রমিক পার্টি, ইসলামিক ফ্রন্ট ও গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলটি মনে করছে- ‘জাতীয় ঐক্য’ হালে পানি পাবে না। তাদের সরকারবিরোধী চক্রান্ত রুখে দেয়ার সাংগঠনিক ক্ষমতা দলের আছে।

বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত : মির্জা ফখরুল 
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমার সংবাদকে বলেছেন, বৃহত্তর ঐক্য গড়তে প্রয়োজনে বড় ধরনের ছাড় দিতে প্রস্তুত। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সরকারকে চাপে ফেলে সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করতে চায় বিএনপি। তিনি বলেন, দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বিএনপি। দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে দল ও নিজেদের ব্যক্তি-স্বার্থের ঊর্ধ্বে বিএনপি চিন্তা করছে বলেও জানান এই নীতিনির্ধারক। তিনি আশা করেন, খুব শিগগিরই সব চ্যালেঞ্জ ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বৃহত্তর ঐক্য গড়তে সক্ষম হবেন তারা।

ঐক্য ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে ফখরুল বলেন, আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই, এই সরকারের পতন দেখতে চাই, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। এখন ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের মানুষকে নতুন পথ দেখাচ্ছেন। তিনি তার ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতির এই চরম দুর্দিনে মুক্তির একটি পথ দেখিয়ে জনগণকে সামনে নিয়ে আসছেন। এ জন্য ড. কামাল হোসেনকে ধন্যবাদ জানান ফখরুল।

এই সরকারকে যদি আমরা সরিয়ে দিতে না পারি, জনগণের সরকার যদি প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, জনগণের ঐক্যের সরকার যদি প্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, তাহলে এই দেশের স্বাধীনতা থাকবে না। মানুষ তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে যে দাবিগুলো আসছে তার প্রায় সবগুলো বিএনপির দাবির সাথে মিল আছে। তার প্রধান শর্ত হচ্ছে- এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচনকালীন সময়ে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে এবং কোনোমতেই এই নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে না।

কামাল স্বাধীনতার স্বপক্ষে ছিলেন না : আব্দুর রহমান এমপি
জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জাতীয় ঐক্যের নামে মূলত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানকে রক্ষার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এমপি।

গতকাল মঙ্গলবার বিকালে আমার সংবাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। আওয়ামী লীগবিরোধী জাতীয় ঐক্য গড়ার শুরু থেকে গণফোরাম সভাপতি কামাল হোসেন এবং যুক্তফ্রন্টের একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী কোনো দলকে জাতীয় ঐক্যে নেয়া হবে না। আর জামায়াত না ছাড়লে বিএনপির সঙ্গেও ঐক্য হবে না। কিন্তু প্রকাশ্যে দেয়া এমন ঘোষণা ধরে রাখতে পারেনি জাতীয় ঐক্যের এ দুই নেতা।

গত শনিবার মহানগর নাট্যমঞ্চে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশে যোগ দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের ৪ শীর্ষনেতা। অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান। এছাড়া বিএনপির পক্ষে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ডা. জাফরুল্লাহ, বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের আহমদ আবদুল কাদেরও সমাবেশে যোগ দেন।

এদিকে, ২৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশে যুক্তফ্রন্ট ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের আমন্ত্রণ জানানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান এমপি বলেন, তথাকথিত জাতীয় ঐক্যের যে নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, এটি মূলত হলো বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক ধারা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং উন্নয়নের বাংলাদেশের যে খ্যাতি তা নস্যাৎ করার অংশ হিসেবে এটি হয়েছে। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য মূলত হাওয়া ভবনকে পুনরায় পুনরুজ্জীবিত করা, মানিলন্ডারিং হোতা দুর্নীতিবাজ তারেক জিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলা থেকে রক্ষা এবং খালেদা জিয়াকে অর্থ আত্মসাতের মামলা হতে মুক্ত করার চক্রান্তের অংশ হিসেবে কিছু জাতীয় ঐক্যের নামে তথাকথিত কিছু চেনা এক জায়গায় বসেছে।

সুতরাং এটি নিয়ে আমাদের (আওয়ামী লীগ) ভাববার কিছু নেই। জাতীয় ঐক্যের নেতা গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে এ আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ড. কামাল কখনোই স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষ ত্যাগ করেন নাই। সবসময় তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের পক্ষেই ছিলেন। স্বাধীনতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার হয়েছে, সেই বিচার কার্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তথাকথিত জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা হচ্ছে। জাতীয় ঐক্যের হোতাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। এরা জনবিচ্ছিন্ন, জনগণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। সুতরাং এটি নিয়ে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই বলে জানান আব্দুর রহমান এমপি। তিনি আরও বলেন, জাতীয় ঐক্য বা যে জোটই হোক আগামী নির্বাচন আটকানো যাবে না, নির্বাচন যথাসময়ে হবে। সব দলের অংশগ্রহণে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে।

নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে-এমাজউদ্দীন
আগামি সংসদ নির্বাচনে জাতীয় ঐক্য প্রভাব ফেলবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি আমার সংবাদকে বলেন, রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে জাতীয় ঐক্য কার্যত ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, ২০ দলের সাথে সাথে যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম আসায় জাতীয় ঐক্য এখন অনেক শক্তিশালী। নির্বাচনের আগে জোটের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আমাদের পাশের দেশ ভারতে অঞ্চলভিত্তিক পর্যন্ত জোট হয়। যারা এককভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছেন তাদের ওপর একসময় মানুষ ক্ষিপ্ত হয়। আর তাদেরও জবাবদিহি করতে হয়। এ জায়গাগুলো যখন উঠে যায় তখন জোটের প্রয়োজন হয়। তখন জোটশক্তি দুর্বলদের অধিকারগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে। এদেশেও জোটের গুরুত্ব আছে। এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আরও বলেন, এদেশেও জোট এবং ঐক্যশক্তির ইতিহাস আছে। যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে বিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গঠন, মুসলিম লীগের পতন, স্বৈরাচার এরশাদের পতনও ঐক্যশক্তির মাধ্যমে হয়েছে। তাই সাম্প্রতিক দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে আবারো শক্তিশালী জোট গঠন হয়েছে। আগামী নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে জোটশক্তি কার্যত ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য।

স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করবে ক্ষমতায়ন : রুহুল আমিন হাওলাদার
জাতীয় পার্টির মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার এমপি দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে এটি (জোটশক্তি) দৃশ্যমান। সুস্থ নির্বাচনের জন্য শতভাগ প্রভাব ফেলতে জোটের প্রয়োজন দাবি করে একটা স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য গঠন হওয়া ঐক্য কিংবা জোট শতভাগ প্রভাব ফেলবে। নির্বাচন এলেই জোট গঠন হয় এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র। তেমনি এবারো জোট গঠন হয়েছে। জোটের প্রভাব আর গুরুত্বকে ছোট করে দেখার কারণ নেই। জোটের স্থায়িত্বের ওপরই নির্ভর করবে ক্ষমতায়ন।

স্বাধীনতাবিরোধীদের ষড়যন্ত্র রুখতে জোট প্রয়োজন : শিরিন আখতার
জাসদ (ইনু) সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার আমার সংবাদকে বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য নয়, আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই জোট দাবি হবে। বাংলাদেশে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। দলের ঊর্ধ্বে থেকে জাতীয় স্বার্থ আদায়ের জন্য এবং ঐতিহাসিক কর্তব্যসাধনে জোট প্রয়োজন। তাছাড়া স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্র রুখতে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে জীবিত রাখতে জোট অতীতেও ভূমিকা রেখেছে এবারো রাখবে।

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১