বুধবার ১৮ই মার্চ, ২০২৬ ইং ৪ঠা চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিএনপির আন্দোলনে ঐক্যের আঘাত

আকাশবার্তা ডেস্ক :


তৃণমূলে বার্তা নেই। ২০ দলের সাথে সমন্ধয় নেই। অভিযোগ উঠেছে নির্বাচনের আগে বিএনপির আন্দোলনের প্ল্যানিং জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে ধর্ষণ! এ নিয়ে দলে ও তৃণমূলে চরম ক্ষোভ! এখন বিএনপিতে সিদ্ধান্ত ঐক্যে-জোটে যৌথ কর্মসূচি। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের যেসব নেতার রাজনৈতিক ইতিহাসে আন্দোলনের চরিত্র নেই তারাই হামলা-মামলার কৌশল থেকে বাঁচতে শেষ সময়ে ঐক্যের ঘাড়ে উঠতে তৎপর। ২০ দলকে পাশ কাটিয়ে আসছে কর্মসূচিও। দলে বড় একটি শঙ্কা এ নিয়ে ২০ দলেও ফাটল ধরবে।

এদিকে ঐক্যর নেতৃত্ব মানতে নারাজ দলের নির্যাতিত নেতারা। অন্যদিকে যারা বিএনপির মূল আদর্শে বিশ্বাসী ঐক্য প্রসঙ্গে তাদের বিপদে ফেলতেও ষড়যন্ত্র চলছে দলে। সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিও ঐক্যের কারণে আটকে গেছে। অক্টোবরও চলছে ধোঁয়াশায়। খালেদা জিয়া-তারেক রহমান ঐক্যের পক্ষে কিন্তু একেবারে ঐক্যের ঘাড়ে উঠার পক্ষে নয়। ঐক্যটা আন্দোলনের অংশ। যেমনটা কূটনৈতিক তৎপরতা। জাতীয় ঐক্য ও বিএনপির ব্যানারে কর্মসূচি আসলে কার্যত ভূমিকা নিয়ে মাঠে নামতে নারাজ তৃণমূল। বিএনপির লোকবলের কৃতিত্ব ড.কামাল-বি. চৌধুরীকে দিতে চান না দলের আন্দোলনমুখী নেতারা। বিএনপি হরতাল-অবরোধের মতো নানা কর্মসূচি নিয়ে নেতাকর্মীদের রাজপথ দখলের যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো এখন তা ঐক্যের মাধ্যমে যৌথ কর্মসূচিতে আসবে।

এ নিয়ে আজ রোববার যুক্তফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য। জোটগত অথবা যুগপৎ আন্দোলনে বৃহত্তর ঐক্যের মাধ্যমে কর্মসূচি নিয়ে আসতে চায় দলটি। এ বৈঠকের পর কয়েকদিনের মধ্যেই এ মাসে বিভাগীয় সমাবেশের পর হরতাল-অবরোধের কর্মসূচির ঘোষণা আসবে বলে মত সংশ্লিষ্ট সূত্রের। এদিকে বিএনপির একাধিক সূত্র আমার সংবাদকে নিশ্চিত করেছেন নির্বাচনের আগে ড. কামাল আর দেশের বাইরে যাবেন না। বিএনপির প্রেসক্রিপশনে কাজ করবেন।

তবে জাতীয় ঐক্য ও বিএনপির ব্যানারে যে কর্মসূচি আসছে তা কি ঐক্যের চাওয়া নাকি বিএনপির দাবি এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরাও পরিবর্তনের জন্য বিএনপির সাথে যৌথ কর্মসূচি চেয়েছি আর তাদেরও দাবি ছিলো এক সঙ্গে যৌথ কর্মসূচিতে আসার। এখন সেই সিদ্ধান্তই হয়েছে। আমরাও সেই আলোকে এগিয়ে যাচ্ছি। এটা পরস্পর সিদ্ধান্তের আলোকেই হচ্ছে। আমাদের যে ৫ দফা আর বিএনপির যে ৭ দফা এটি বাস্তবায়নেই কর্মসূচি আসবে।

গত রোববার জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে মিল রেখে আসে বিএনপির সাত দফা। সমাবেশ থেকে ঐক্য প্রসঙ্গে নেতারা বলেন, বিএনপি ঐক্যের জন্য প্রস্তুত। ঐক্যের বাঁধ সরকার ভাঙতে পারবে না। সময় হবে যখন ঐক্যবদ্ধ মানুষের জোয়ার সরকার মোকাবিলা করতে পারবে না। যাদের লোক নেই, জন নেই তারা যদি বিএনপিকে চাপ সৃষ্টি করেন তাহলে জনগণ থুথু ফেলবে। বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় সরকারের অধীনে যারা আন্দোলনে রাজপথে নামবে তাদের সঙ্গেই ঐক্য হবে। ‘রাজপথে যে-ই থাকবে তার সাথেই ঐক্য হবে। রাজপথে যদি শয়তানও থাকে, তার সঙ্গেও ঐক্য হবে। বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। আমরা ঐক্য চাই। কিন্তু এই আন্তরিকতাকে কেউ দুর্বলতা ভাববেন না।’ আবার কেউ কেউ বলেছেন, ‘জাতীয় ঐক্য হবে কি হবে না জানি না। কারণ সরকার ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু বিএনপির সমস্যা নাই। কারণ বিএনপিকে আন্দোলন করতেই হবে।’

এদিকে ঐক্য নিয়ে এখনো রয়েছে ভিন্ন সুর! বৃহত্তর ঐক্যের জন্য জামায়াতে ইসলামী যতটা না, তার চেয়ে বড় ফ্যাক্টর বি. চৌধুরী ও তার ছেলে মাহী বি. চৌধুরী। বাপ-বেটা কোনোভাবেই বিএনপির প্রতি এখনো আস্থা রাখতে পারছেন না। ফলে ঘুরেফিরে তারাই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার বড় বাধা হিসেবে জামায়াতকে সামনে আনছেন। জানা গেছে, ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বি. চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করে বিএনপি। এরপরই নিজেকে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য ২০০২ সালের ৩০ মে মৃত্যুবার্ষিকীর দিন জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিতে যাননি বি. চৌধুরী। বিষয়টি বিএনপি ভালোভাবে নেয়নি।

একপর্যায়ে বি. চৌধুরীকে ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হয়। সেটিকেই ঐক্য প্রক্রিয়ার অন্তরায় মানছেন বি. চৌধুরী ও তার ছেলে। বিএনপির বড় একটি অংশও বি. চৌধুরী ও তার ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। বি. চৌধুরীকে ঐক্যতে রেখে বিএনপির পরিবর্তন আদৌ কি হবে এটিই এখন সিনিয়র নেতাদের কাছে জানতে চাচ্ছে বিএনপির বড় একটি অংশ।শীর্ষ নেতাদের দাবি অনেক সমঝোতায় এখন বিএনপির ঘরেও বি. চৌধুরী এসেছে। সেই আলোকেই এখন বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছে তারা। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের পর ঐক্যবদ্ধ বা যুগপৎ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা।

জানা গেছে, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যে দল ও জোটের সমন্বয় সাধনে শিগগিরই গঠিত হতে যাচ্ছে লিয়াজোঁ কমিটি। বিএনপি ও ঐক্য সূত্রে জানা গেছে, সরকারবিরোধী কর্মসূচির বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের আলোচনার জন্য প্যানেল কমিটি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে এ কমিটি করা হয়। এ প্যানেল কমিটিতে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে আছেন জেএসডি সভাপতি আসম রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ও বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান।

বিএনপির পক্ষে আছেন, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। এদিকে সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে আজ রাতেই যুক্তফ্রন্ট ও বিএনপির প্যানেল আলোচকদের বৈঠক হতে পারে। বৈঠকে ৫ দফা দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে জোটবদ্ধ আন্দোলন, কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। এ মাসেই বিভাগীয় সমাবেশের পর বিএনপির যে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচি আছে তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। যৌথ কর্মসূচি প্রসঙ্গে তৃণমূলে কোনো বার্তা আছে কিনা এ নিয়ে কথা হয় বিএনপির দুটি সাংগঠনিক জেলার সভাপতির সঙ্গে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে তারা বলেন, সেপ্টেম্বর গেল, অক্টোবরও চলে যাচ্ছে কিন্তু কেন্দ্র থেকে এখনো কোনো বার্তা আসছে না আমাদের কাছে। আন্দোলনের প্রস্তুতির ইঙ্গিত, নির্বাচনের ইঙ্গিত কেন্দ্র থেকে কিছুই দেয়া হচ্ছে না। এখন আবার শুনতেছি ঐক্যের ব্যানারে আন্দোলন হবে! সেটি কখন এটিও তারা জানেন না। দলের ব্যানারে আন্দোলন হলে রাস্তায় নামতে প্রস্তুত বলেও জানান তৃণমূলের নেতারা।

তবে ড .কামাল- বি. চৌধুরীর ব্যানারে হুট করে কোনো কর্মসূচি দিলে তৃণমূলের নেতাদের রাস্তায় নামানো সম্ভব নয় বলেও জানান, বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটির সাংগঠনিক সম্পাদক। কেন্দ্রের কিছু নেতা নির্বাচনের আগে মামলা থেকে বাঁচতে এমন কৌশল হতে পারেও মনে করছেন তিনি। তবে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে সেটি বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত বলেও জানান তৃণমূলের এ দুই নেতা।

ঐক্য প্রসঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই স্বৈরাচার সরকারকে বিদায় করতে হবে। সে লক্ষ্যেই বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্য আর কর্মসূচি নিয়ে জোটের শরিক দলের সাথে বিএনপির সমন্বয় আছে কিনা জানতে চাইলে কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক বলেন, একজন রোগী যখন অসুস্থ বা কোনো শিশু যদি অসুস্থ থাকে, মনে করুন নভেম্বর মাসে শীতকাল আসার প্রাক্কালে সর্দিকাশি লেগেছে। তখন সে কিন্তু ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে। তাকে আবার অনেক ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করানো ঠিক নয়। তাকে ফ্যান ছেড়ে খালি গায়ে ঘুমাতে দেয়া ঠিক নয়।

এটাকে আমরা ইংরেজিতে বলি ভালনারেবল। বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোট ভালনারেবল। যেহেতু আমাদের নেতা কারাগারে, আরেক নেতা লন্ডনে। বিএনপির পুনর্গঠন শতভাগ শেষ হয়নি। এখনো চলছে। এ সময়ের মধ্যে কিছু কিছু জিনিস আমাদের নিষ্পত্তি করে রাখা উচিত ছিল। এটা আমার ব্যক্তিগত মত। কিন্তু এটা করা হয়নি। ফলশ্রুতিতে আপনি একটি অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে রেখেছেন। এ সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ঐক্য প্রক্রিয়া।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এবং আমার কল্যাণ পার্টি বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগ শতভাগ সমর্থন করি। আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি কৌশলগত ভুল করেই যাচ্ছে। সে ছোট্ট বা ক্ষুদ্র কৌশলগত ভুল হচ্ছে তাদের শরিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অফিসিয়ালভাবে বলে দেয়া উচিত ছিল যে আপনারা আপনাদের আসন নিয়ে চিন্তা করবেন না। এটা বিএনপির নেতাদের জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন ছিল। ঐক্য নিয়ে কী হচ্ছে এটাও আমাদেরকে বিস্তারিত ব্রিফ করলে ভালো হতো। বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া গঠনে বিএনপির পক্ষে ভূমিকা পালনকারী গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ঐক্যের প্রাপ্তি খুব দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে। এবার ফলপ্রসূ ঐক্যই হচ্ছে।

ড. কামাল চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে ছিলেন তিনিও এসেছেন এবং এসেই কথা দিয়েছেন তিনি আর নির্বাচনের আগে দেশের বাইরে যাবেন না। ড. জাফরুল্লাহ আরও জানান, খুব শিগগিরই বিএনপির সঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা শুরু করবেন। সেই বৈঠকে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনসহ পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে। এরপরই মাঠের কর্মসূচি দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জামায়াতকে বাদ দিয়েই ঐক্য হচ্ছে। এটি তো জামায়াত মেনে নিয়েছে। সুতরাং এখন আর কোনো সমস্যা হবে না।

সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ

     এই বিভাগের আরও সংবাদ

আর্কাইভ

মার্চ ২০২৬
শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
« ফেব্রুয়ারি    
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১