আকাশবার্তা ডেস্ক :
সম্প্রতি সময় টিভিতে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদকে নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মন্তব্যকে ‘অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল’ আখ্যায়িত করে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা। এতে বিধি মোতাবেক তদন্ত করে উপরে জাফরুল্লাহসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় শুক্রবার এই জিডি করেন সেনা সদরের মেজর এম রকিবুল আলম। জিডি নম্বর ৪৯৮। গত ৯ অক্টোবরের ঘটনায় থানায় অভিযোগ করতে বিলম্বের কারণ হিসেবে ‘সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও নির্দেশ’ পাওয়ার কথাও জানানো হয়।
২০ অগাস্ট রাতে সময় টিভির আলোচনা অনুষ্ঠান সম্পাদকীয়তে জাফরুল্লাহ চৌধুরী দাবি করেন, সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ যখন ‘চট্টগ্রামের জিওসি’ ছিলেন, সেখান থেকে ‘সমরাস্ত্র ও গোলাবারুদ চুরি’ যাওয়ার ঘটনায় তার ‘কোর্ট মার্শাল’ হয়েছিল। এরপর বিষয়টি নিয়ে সেনা সদরের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। সময় টিভি নিজেদের বক্তব্যসহ সেটি প্রচার করে।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চাকরি জীবনে কখনোই চট্টগ্রামের জিওসি বা কমান্ড্যান্ট ছিলেন না। ওই সময় চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা সেনানিবাসে কোনো সমরাস্ত্র বা গোলাবারুদ চুরি বা হারানোর ঘটনা ঘটেনি। জেনারেল আজিজ আহমেদ চাকরি জীবনে কখনো কোর্ট মার্শালের মুখোমুখি হননি।
জাফরুল্লাহর বক্তব্যকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হিসেবে বর্ণনা করে সেনাসদরের প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, ওই বক্তব্য “সেনাবাহিনী প্রধানসহ সেনাবাহিনীর মত রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে জনসম্মুখে হেয় করার হীন অপচেষ্টা মর্মে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয়।” সেনাসদরের প্রতিবাদের পর গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, টেলিভিশনের আলোচনায় তার বক্তব্যে ভুল ছিল এবং সেজন্য তিনি দুঃখিত।
ভুল সংশোধন করে নিতে গিয়ে বিএনপি সমর্থক পেশাজীবী নেতা হিসেবে পরিচিত জাফরুল্লাহ বলেন, “জেনারেল আজিজ একজন দক্ষ আর্টিলারি সেনা কর্মকর্তা। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি ছিলেন না, কমান্ডেন্টও ছিলেন না। তিনি তার কর্মজীবনের এক সময়ে চট্টগ্রাম সেনাছাউনিতে আর্টিলারী প্রশিক্ষক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল হয়নি, একবার কোর্ট অব ইনকোয়ারি হয়েছিল।”
বক্তব্য প্রত্যাহার করবেন কি না- জানতে চাইলে জাফরুল্লাহ বলেন, “খুব সহজ-সরলভাবে এখানে বলেছি, আমার শব্দচয়নে ভুল ছিল। এই ভুলের জন্য নিশ্চয়ই দুঃখ প্রকাশ করছি।”
সংবাদ সম্মেলনে তার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে আরেকটি প্রতিবাদলিপি সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, টেলিভিশন আলোচনায় জাফরুল্লাহ ২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেডের উৎস হিসেবে ‘সুকৌশলে’ সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার একটি চেষ্টা করেছিলেন, যা ছিল ‘দুরভিসন্ধিমূলক’।
“২১ অগাস্টের গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত মামলার রায় ঘোষণার আগের দিন টেলিভিশন লাইভ টকশোতে এ ধরনের অসত্য বক্তব্য প্রদান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অসত্য বক্তব্যকে সংশোধন করার কোনো চেষ্টা করেননি। “তার সামগ্রিক বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে তিনি সেনাবাহিনীতে কর্মরত সকল পদবীর সমস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টার পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সেনাবাহিনী প্রধানের ভাবমূর্তি এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপপ্রয়াস চালিয়েছেন।”
জিডিতে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যটি ছিল একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন, অসত্য বক্তব্য। কারণ বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চাকরি জীবনে কখনোই চট্টগ্রামে জিওসি বা কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন না। তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত কুমিল্লায় ৩৩ আর্টিলারি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার, ২০১১ সালের জুন থেকে ২০১২ সালের মে পর্যন্ত ঢাকার মিরপুরে ৬ স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার এবং ২০১২ সালের মে থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লায় ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা সেনানিবাসে কোনও সমরাস্ত্র বা গোলাবরুদ চুরি বা হারানোর কোনও ঘটনা ঘটেনি।’
জাফরুল্লাহর বক্তব্যকে বানোয়াট, সৃজিত,উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এ অসত্য উল্লেখ করে জিডিতে এও বলা হয়, এটি সেনাবাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে জনসম্মুখে হেয় করার হীন অপচেষ্টা।
এই বক্তব্য সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিভ্রান্ত এবং তাদের মনোবলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলেও উল্লেখ করা হয় জিডিতে। বলা হয়, ‘এরূপ অপপ্রচার সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর সংহতি ও একতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার নিমিত্তে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদের মনোবলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’
‘এছাড়া এরূপ অপপ্রচার সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর সংহতি ও একতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ডা. জাফরুল্লাহ তার বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ঐক্যকে বিনষ্ট করাসহ সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যমূলক গুজব ছড়িয়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ও নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন বলে প্রতীয়মান।’
জিডিতে সই করা কর্মকর্তা জানান, অনুষ্ঠান চলাকালে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মুখে উপরে উল্লেখিত বক্তব্য শুনে তিনি বেশ অবাক ও হতভম্ভ হয়ে যান এবং তার মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। অনুষ্ঠান শেষে তিনি বিষয়টি নিয়ে আমার কিছু সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের পরদিন সেনাবাহিনীর বাইরে থেকেও অনেকে বিষয়টি জানতে চেয়েছেন জানিয়ে জিডিতে বলা হয়, ‘যারা অনুষ্ঠানটি দেখেছেন তাদের বেশিরভাগ লোকই ডা. জাফরুল্লার বক্তব্যে সেনাবাহিনী সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করেন এবং তাদের সকালের মধ্যে একটি অনিশ্চয়তা কাজ করে।’
জিডিতে বলা হয়, ‘ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি কেন, কি উদ্দেশ্যে এবং কাদের প্ররোচণায় এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক, বানোয়াট ও অসত্য বক্তব্য টকশোতে বলেছেন তা তদন্তের দাবি রাখে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের (মুখপাত্র) উপ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, আদালত ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশকে (দক্ষিণ) বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন হাওলাদার জানান, সেনা সদরে দায়িত্বরত মেজর এম রকিবুল আলম গত শুক্রবার থানায় এসে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে ওই জিডি করেন। সেখানে বলা হয়, “২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ের পূর্ব রাতে হঠাৎ করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে সেনাপ্রধান সম্পর্কে প্রদত্ত বক্তব্যটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিদ্বেষপ্রসূত ও ষড়যন্ত্রমূলক, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি তথা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
ডা. জাফরুল্লার চৌধুরীর মত একজন উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি কেন, কী উদ্দেশ্যে এবং কাদের প্ররোচনায় এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক, বানোয়াট ও অসত্য বক্তব্য টকশোতে বলেছেন, তা তদন্তের দাবি রাখে।”
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ