আকাশবার্তা ডেস্ক :
সারাদেশে বইছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষদিকে অনুষ্ঠিত হতে পারে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদীয় আসন ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোতে চলছে চুলচেড়া বিশ্লেষণ। ক্ষমতাসীন আ.লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে নানা হিসাব-নিকাশ। জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। তবে শরীক দলগুলো আসন ভাগাভাগি নিয়ে হোমওয়ার্ক শুরু করেছে। গত নির্বাচনের প্রাপ্ত আসনগুলো বহালের পাশাপাশি নতুন করে আরও চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলগুলো।
সূত্র মতে, আগামী নির্বাচনে জোটগত অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে আ.লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। নির্বাচনে ১৪ দলের শরিকরা কমপক্ষে ৭০টি আসনে জোটের প্রার্থী দেওয়ার নিশ্চয়তা চায়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শেষে দলের সংখ্যা বাড়তে পারে। আর বিএনপি অংশ নিলে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে গঠন করা হবে মহাজোট। সেক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি এককভাবে আরও অন্তত ৫০টি আসনে ছাড় দিতে হতে পারে আ.লীগকে। সংসদীয় আসন নিয়ে জোট-মহাজোটের ভাগ-বাটোয়ারা শেষ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছু দিন। কিন্তু জোট বা মহাজোটের প্রার্থী রয়েছেন এমন আসনগুলোতেও বইছে নির্বাচনি হাওয়া। একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আসনগুলোতে হার্ডলাইনে উঠে এসেছে আ.লীগের নেতাকর্মীরা।
আগামীতে নিজ দল আ.লীগের সংসদ সদস্য চান তারা। অন্যদিকে, আসনগুলো ধরে রাখতে তৎপর জোটের বর্তমান সংসদ সদস্যরা।তথ্য মতে, জোটের এমপি রয়েছেন এমন আসনগুলোতেও আ.লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। তারা প্রতিনিয়ত সভা-সমাবেশসহ প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। ঢাকা জেলার দোহার উপজেলা ও নবাবগঞ্জ উপজেলার একটি পৌরসভা ও ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ঢাকা-১ আসন। আসনটির বর্তমান সাংসদ সংসদীয় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির অ্যাড. সালমা ইসলাম। গত দশম নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে আসনটিতে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় আ.লীগ। নির্বাচনে আ.লীগের প্রার্থীর অংশগ্রহণ থাকলেও জয়ের চেষ্টা ছিল না বলে গুঞ্জন রয়েছে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপাকে এবার আর ছাড় দিতে চান না নেতাকর্মীরা। আসনটি হতে আ.লীগের হয়ে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মান্নান খান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তারা দুজনেই জোট বা মহাজোট কাউকে আসনটিতে ছাড় দিতে নারাজ।একই অবস্থা ঢাকা-৪, ৬ ও ১৭ আসন জুড়ে। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসন থেকে আ.লীগের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে আসনটি জয়ী হন জাতীয় পার্টির সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা। আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকলে ওই নির্বাচনে আ.লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী বাবলার পক্ষে কাজ করেন। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিতে নারাজ আ.লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এ আ.লীগের ৪ জন সম্ভাব্য হেভিওয়েট প্রাথী সক্রিয়। এরা হলেন- সাবেক এমপি অ্যাড. সানজিদা খানম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব ড. আওলাদ হোসেন, শ্যামপুর থানা আ.লীগের সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দিলীপ রায়। তাদের মধ্যে মনোনয়ন দৌড়ে বিভক্তি থাকলেও সাংসদ হিসেবে আ.লীগের লোক চান সকলেই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন হতে আ.লীগের হয়ে এমপি নির্বাচিত হন অ্যাড. সানজিদা খানম। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন থেকে সরে আসেন শ্যামপুর-কদমতলী থানা আ.লীগের সাবেক এ সাধারণ সম্পাদক।
পরে তাকে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি করা হয়। আগামী নির্বাচনে তিনি আ.লীগের মনোনয়নে আবারো সংসদ সদস্য পদে আসতে চান। অ্যাড. সানজিদা খানম বলেন, আগামীতে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমান সাংসদ এলাকার কাঙ্খিত উন্নয়ন করতে পারেনি। দলের নেতাকর্মীরা আমাকে চান, আশা করি নেত্রী আমাকে মূল্যায়ন করবেন। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন হলেও ঢাকা-১৭ আসনে দলীয় সংসদ সদস্য পায়নি আ.লীগ। জোট-মহাজোটের হিসাব কষে আসনটি দুবারই ছাড় দিয়েছে দলটি। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে সমর্থন দেয় আ.লীগ। ২০১৪ সালো দশম নির্বাচনে আসনটি প্রার্থী দেয়নি দলটি।
ঐ নির্বাচনে এরশাদ ঢাকা-১৭ সহ রংপুরের আরও দুটি আসনে প্রার্থী হন এরশাদ। কিন্তু নানা নাটকীয়তার পর ভোটগ্রহণের আগেই প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন। ঐ নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) প্রেসিডেন্ট এসএম আবুল কালাম আজাদ আ.লীগের সমর্থন নিয়ে জয়লাভ করেন। আসনটি এবার নিজেদের দখলে নিতে চায় আ.লীগ। তাই একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী চায় দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে মহানগরের কয়েকজন নেতা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হতে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এরা হচ্ছেন- ঢাকা মহানগর উত্তর আ.লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমএ কাদের খান, কোষাধ্যক্ষ ওয়াকিল উদ্দিন, বনানী থানা আ.লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব একেএম জসিম উদ্দিন।এছাড়া আ.লীগের সমর্থন নিয়ে আসনটি হতে সাংসদ হতে তৎপরতা চালাচ্ছেন সাবেক বিএনপিনেতা ও মন্ত্রী, বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (বিএনএফ) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা।আ.লীগনেতা এমএ কাদের খান বলেন, দীর্ঘদিন আসনটিতে দলীয় প্রার্থী না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আ.লীগ। তাই এখানকার নেতাকর্মীরা আমাকে আগামীকে নৌকার প্রার্থী হিসেবে চায়। আশা করি নেত্রী মূল্যায়ণ করবেন।২০১৪ সালে দশম জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসনে প্রার্থী দেয়নি আ.লীগ।
ফলে জাতীয় পার্টি থেকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হন কাজী ফিরোজ রশিদ। ঐ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না দেওয়া কারণে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে আ.লীগ। তাই আগামীতে দলীয় প্রার্থী চান নেতাকর্মীরা। এ আসন থেকে আ.লীগের হয়ে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, ওয়ারী থানা আ.লীগের সভাপতি চৌধুরি আশিকুর রহমান লাভলু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আ.লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হেদায়েতুল ইসলাম স্বপন।একই অবস্থা ঢাকা-৮ আসনজুড়ে। আসনটি বর্তমান সাংসদ জোটের শরীক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। আগামীতে আসনটিতে ছাড় দিতে নারাজ আ.লীগের নেতাকর্মীরা।
দলটির একাধিক প্রার্থী দলের হয়ে লড়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।পঞ্চগড়-১ আসনের বর্তমান সংদস্য সদস্য জাসদের (আম্বিয়া-নাজমুল) মো. নাজমুল হক প্রধান। আগামীতে তিনি জোটের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে লড়তে চান। কিন্তু আগামীতে আ.লীগের এমপি চান নেতাকর্মীরা। নৌকা প্রতীকের হয়ে নির্বাচনে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল হক প্রধান, পঞ্চগড় জেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন সাদত সম্রাট।
সাতক্ষীরা-১ আসনের বর্তমান সাংসদ ওয়ার্কাস পার্টির মোস্তফা লুৎফুল্লা। আসনটি তার বিপক্ষে একাট্টা হয়ে উঠেছে আ.লীগ। আগামী নির্বাচনে আ.লীগের মনোনয়ন চান সাবেক সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘদিন জেলা আ.লীগের নেতৃত্বে থাকায় দলকে করেছেন সুসংগঠিত। তার সময়ে আসনটিতে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও জোট রাজনীতির মারপ্যাঁচে মনোনয়ন বঞ্চিত হন তিনি। এছাড়া মনোনয়ন চান জেলা আ.;লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ কামাল শুভ্র, কৃষিবিষয়ক সম্পাদক সরদার মুজিব।
জেলা আ.লীগের সাবেক সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার শেখ মুজিবুর রহমান, বলেন দীর্ঘ ৫৪ বছর রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে জেলা আ.লীগকে প্রায় ১৫ বছর নেতৃত্ব দিয়েছি। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছি। সংসদ সদস্য থাকাকালে আমার নির্বাচনি এলাকায় যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে তা ৪০ বছরেও হয়নি। গত নির্বাচনে জোটকে ছাড় দিয়েছি, এবার দল আমাকে মনোনয়ন দেবে ইনশাল্লাহ। একই অবস্থা ঠাকুরগাঁও-৩, নীলফামারী-৪, কুড়িগ্রাম-৪, বগুড়া-৪, রাজশাহী-২ আসনজুড়ে। আসনগুলোতে নিজ দলীয় সংসদ সদস্য পেতে মুখিয়ে আছে স্থানীয় আ.লীগের নেতাকর্মীরা।
সূত্র : দৈনিক আমার সংবাদ